টানাপোড়েন : বয়নশিল্প বিষয়ক একমাত্র পত্রিকা

ফুলিয়ার তন্তুবায় মুখপত্র

নেকেই ‘টানাপোড়েন’ বলতে বোঝেন সম্পর্কের জটিলতা অথবা অন্যান্য সংকট। আসল অর্থ অনেকেই জানেন না। তাঁতে কাপড় বোনার সময় লম্বালম্বিভাবে যে সুতো সাজানো থাকে, তাকে বলে ‘টানা’। আর প্রস্থ বা আড়ের সুতোকে বলে ‘পোড়েন’। টানা দেওয়া সুতোগুলো খুব টান টান অবস্থায় থাকে। পোড়েনের সুতোগুলো টানার সুতোগুলোর ওপর-নিচ দিয়ে পাটি বোনার মতো করে বিশেষ কৌশলে আনা হয়। এই পদ্ধতির ভাবই মানুষ নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে টানাপোড়েন শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেছিল।

তাঁত নিয়ে আমরা কতটুকুই বা জানি? দেশভাগের ৭৬ বছর পরেও দুই বাংলাকে জুড়ে রাখা টাঙ্গাইল-তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য সম্বন্ধে কেই বা জানতে চায়! কী পরছি, সুতি নাকি ক্ষতিকর পলিয়েস্টার, নিজেদের অধিকার বুঝে নিতেই আমাদের অনীহা। তাঁতিরা হ্যান্ডলুমের শৈল্পিক বুনন ছেড়ে কীসের মোহে বেছে নিচ্ছে পাওয়ারলুমের চালু সস্তা তাঁত, জানার প্রয়োজন মনে করি না আমরা। তবে, আমাদের প্রয়োজন পড়ুক বা না পড়ুক, বিগত কয়েক দশক ধরে নদিয়া-র ফুলিয়া থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে বাংলার তাঁতশিল্প নিয়ে আসল কথাগুলো। খানিক নিভৃতেই প্রকাশিত হয়ে চলেছে বয়নশিল্পের ওপর বাংলার একমাত্র পত্রিকা ‘টানাপোড়েন’।

পত্রিকাটি শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৮ – দীর্ঘ ১৮ বছর চলার পর বন্ধ হয়ে যায় টানাপোড়েন পত্রিকা। ফুলিয়ায় প্রথম সমবায় সমিতি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৭৪-এ, পরে ১৯৭৭-এ সমবায় হয়। ফুলিয়ায় মোট তিনটে প্রধান সমবায় ছিল, তার মধ্যে প্রথমটির ম্যানেজার ছিলেন হরিপদ বসাক। হরিপদবাবু এবং ওই সমবায়েরই কর্মী, হরিপদবাবুর মামা বলরাম বসাক (চাকরি করতেন তন্তুশ্রী-তে), এই দু’জনই শুরু করেছিলেন পত্রিকাটি। এঁরাই প্রথম তাঁত বিষয়ে লেখালিখির জন্য সমিতির অনুষ্ঠানে একটি দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেই সময় প্রখ্যাত লেখক, চিত্রগ্রাহক এবং বিশ্বভ্রামণিক অমরেন্দ্র চক্রবর্তী’র যাতায়াত ছিল ফুলিয়ায়। ফুলিয়ায় এলেই তিনি ঢুঁ দিতেন সমবায়ে, তাঁতিদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। হরিপদ বসাক ও বলরাম বসাকের উদ্যোগে দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার পর অমরেন্দ্র চক্রবর্তীই উপদেশ দেন, মাসে একটা করে পত্রিকা বের করলে কেমন হয়? সকলে সম্মতি জানানোর পর তিনিই পত্রিকার নামকরণ করেন—টানাপোড়েন। প্রতি মাসে প্রকাশ হতে শুরু করে বাংলার একমাত্র সমবায় তন্তুবায় মুখপত্র। হরিপদ বসাক ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক এবং বলরাম বসাক সহ-সম্পাদক। প্রথম বছরে ১২টা সংখ্যাই প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর লোকবল ইত্যাদির অভাবে পত্রিকা প্রকাশে অনিয়ম দেখা যায়। এভাবে প্রথমে মাসিক, তারপর যথাক্রমে ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাষিক, বার্ষিক হয়ে বন্ধ হয়ে যায় টানাপোড়েন প্রকাশ। দীর্ঘ ২২ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালে নব পর্যায়ে শুরু হয় ‘টানাপোড়েন’।

২০২১ সালে প্রকাশিত টানাপোড়েন-এর প্রথম দুটি সংখ্যা

কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান, ধারাবাহিক রচনা –যা যা প্রকাশ হতো, সবই ‘তাঁত’ সংক্রান্ত। বাংলাদেশ থেকে একজন গান লিখে পাঠাতেন। তাঁর মনে হয়েছিল, মাঝি মাল্লার গান থাকতে পারে, ছাদ পেটানোর গান থাকতে পারে তাঁতিদের গান থাকবে না কেন! তাঁর লেখা প্রায় ১৫-১৬টা তাঁতি-গান বিভিন্ন সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল।

পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেলেও পরবর্তী কালে তাঁত গবেষকরা এই পত্রিকার উপর আলোকপাত করেন। তাঁত গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ নথি হয়ে ওঠে টানাপোড়েন। “যখন তাঁত নিয়ে লেখাপড়া শুরু করি, আমার মনে হয়েছিল এই পত্রিকা বিশেষ করে ফুলিয়া এবং টাঙ্গাইল শাড়ি সম্পর্কিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। পরে মনে হলো, পত্রিকাটা নতুন করে বের করলে কেমন হয়! সেইমতো হরিপদবাবুদের সঙ্গে আলোচনা করি। ওঁরা বলেন, নতুন করে শুরু করাই যায় তবে, আমাদের দ্বারা এত খাটাখাটনি আর সম্ভব নয়, পারলে তুমিই সম্পাদনা করো, আমরা তো আছিই। ওঁদেরকে উপদেষ্টার আসনে বসিয়ে, ২০২১ সালে সম্পাদক হিসেবে নতুন করে শুরু করি ‘টানাপোড়েন’ তন্তুবায় মুখপত্র। প্রথম বর্ষ থেকেই শুরু করি। ২০২১-এর এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে, মোট দুটো সংখ্যা বের হয়। ২২-এ একটা বেরিয়েছিল এবং ২৩-এর ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা। সংখ্যা প্রকাশের অনুষ্ঠানে জীবনকৃতী সম্মাননা প্রদান করা হয় হরিপদ বসাককে।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন টানাপোড়েন তন্তুবায় মুখপত্র-এর বর্তমান সম্পাদক নিলয় কুমার বসাক।

টানাপোড়েন-এর তৃতীয় বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যার প্রকাশ অনুষ্ঠানে (একদম বাঁদিকে নিলয় কুমার বসাক তাঁর পাশে হরিপদ বসাক ও অন্যান্যরা)

‘টানাপোড়েন’ একসময় সারা পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল। হ্যান্ডলুমের সরকারি অধিকর্তা থেকে শুরু করে ইউনাইটেট ব্যাংক সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আধিকারিকরাও একসময় এই পত্রিকায় লিখেছেন। এছাড়া সেসময়ের টানাপোড়েন-এ লিখতেন মূলত আঞ্চলিক কবি-লেখকরাই। তবে কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান, ধারাবাহিক রচনা –যা যা প্রকাশ হতো, সবই ‘তাঁত’ সংক্রান্ত। বাংলাদেশ থেকে একজন গান লিখে পাঠাতেন। তাঁর মনে হয়েছিল, মাঝি মাল্লার গান থাকতে পারে, ছাদ পেটানোর গান থাকতে পারে তাঁতিদের গান থাকবে না কেন! তাঁর লেখা প্রায় ১৫-১৬টা তাঁতি-গান বিভিন্ন সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল।

টানাপোড়েন-এর যেকোনও সংখ্যার সূচিপত্র দেখেই অনুমান করা সম্ভব এই পত্রিকা কেন গুরুত্বপূর্ন। তাঁতের সমসাময়িক পরিস্থিতি, তাঁতের যাবিতীয় খুঁটিনাটি নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরেছে এই পত্রিকা। এমনকি প্রাক্তন সম্পাদক হরিপদ বসাক মানুষকে সত্যি কথা জানানোর উদ্দেশ্যে সেসময় ‘মনোহর বসাক’ ছদ্মনামে লিখেছেন বহুদিন। যার বেশ কিছু নমুনা নব পর্যায়ের টানাপোড়েন-এ ‘মনোহর উবাচ’ শীর্ষক বিভাগে পড়ার সুযোগ রয়েছে। পুরোনো সংখ্যাগুলোর একেবারে শেষে থাকতো ‘সুতার বাজার দর’ এবং চোখে পড়বে সেসময়ের তাঁত-টাঙ্গাইলের কিছু বিজ্ঞাপন। সেসময়ের টাঙ্গাইল শাড়ি বিক্রেতা বাদল চন্দ্র বসাক যেমন রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছিলেন বিজ্ঞাপনের জন্য—“আগে ওকে বারবার দেখেছি/ লাল রঙ্গের শাড়িতে–/ দালিম ফুলের মত রাঙা;/ আজ পরেছে রেশমের কাপড়,/ আঁচল তুলেছে মাথায়…”

১৯৯১ সালে প্রকাশিত দুটি সংখ্যা

একদিক থেকে টানাপোড়েন-কে বয়নশিল্পের ইস্তেহার বলা যেতে পারে, বলা যেতে পারে তাঁতশিল্পের একমাত্র অভিজ্ঞান। যখন থেকে শুরু হয়েছে তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত, পত্রিকাটির খোঁজে গবেষক, পড়ুয়ারা পোঁছে গেছেন ফুলিয়ার তাঁত সমবায়ে। খোঁজ পড়েছে টানাপোড়েনের, হরিপদ বসাকের। এভাবেই তো একদিন তাঁতের টানে টানাপোড়েন-এর হদিশ পেয়েছিলেন পত্রিকার বর্তমান সম্পাদকও। তিনি নিজস্ব ভাবনার সঙ্গে পুরোনো পত্রিকার নির্যাস মিলিয়েই ফিরিয়ে এনেছেন বয়নশিল্পের একমাত্র পত্রিকাটি। সম্পাদনার সময় কোন কোন বিষয়গুলো মাথায় রেখেছিলেন? “আমার মূল উদ্দেশ্য হলো তাঁতশিল্প সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যগুলো ধরে রাখা। ২২ বছর বন্ধ ছিল পত্রিকাটি। এই ২২ বছরের কোনও ডকুমেন্টেশন আমাদের কাছে নেই। আমরা চাই যে তাঁত নিয়ে জানতে ইচ্ছুক, সে উপকৃত হোক। আমরা চাই না আগামী প্রজন্ম তাঁত সম্পর্কে কোনও ভ্রান্তি নিয়ে বড়ো হোক। তাই পুরোনো সংখ্যা যতগুলো পেয়েছি সরক্ষণ করছি,নতুন ভাবে পত্রিকাটি গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছি। তাঁত শিল্পের সঙ্গে যাঁরা সরাসরি যুক্ত চেষ্টা করছি তাঁদের জীবনের গল্প তুলে ধরার। যেমন যেসব তাঁতিরা ওপার বাংলা থেকে এখানে এসে সবকিছু নতুন করে শুরু করেছিলেন, তাঁদের জীবনের যে টানাপোড়েন, সেসব গল্প বা স্মৃতিকথার তুলে ধরা।” বলেন নিলয় কুমার বসাক।

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে টানাপোড়েন-এর তৃতীয় বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা। তাতে তাঁতশিল্পের ইতিবৃত্ত নিয়ে যেমন বিস্তারিত আলোচনা আছে, এই সময়ের কণ্ঠস্বর হয়ে উপস্থিতি আছে ‘প্রবন্ধ’, ‘বিশেষ রচনা’, ‘প্রতিবেদন’, ‘সাক্ষাৎকার’, ‘পুস্তক সমালোচনা’, ‘সংবাদ সাময়িকী’, ‘ই-পত্র পরিক্রমা’, ‘ফেসবুকের পাতা’ শীর্ষক বিভাগগুলো। উল্টেপাল্টে দেখছিলাম নিলয় কুমার বসাকের পাঠানো টানাপোড়েন-এর ১৯৯১ সালের দুটি সংখ্যা। টানাপোড়েন তন্তুবায় মুখপত্র, দশম বর্ষের (১৩৯৮) সমবায় সপ্তাহ সংখ্যায় রামচন্দ্র ধাড়া নামে এক ব্যক্তি ‘সমবায়’ নামে একটি ছড়া লিখেছিলেন, যার শেষ স্তবক-

খেলায় যারা দক্ষ হাতে
নানা রঙের টানা পোড়েন
তাদের জীবন বর্নবিহীন
ছেঁড়া সুতো কে বা জোড়ে?

সহজ এই ছড়ার মধ্যে যেমন অন্তর্নিহিত আছে বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য, ‘টানাপোড়েন’ যেন সেই কথাই বলে চলেছে—বাংলার তাঁত ও তাঁতিজীবনের সত্য তুলে ধরা এক নিভৃত আন্দোলনের নাম ‘টানাপোড়েন’।

কৃতজ্ঞতা: নিলয় কুমার বসাক

টানাপোড়েন প্রাপ্তস্থান: লালন (কলেজ স্ট্রিট), ধ্যানবিন্দু (কলেজ স্ট্রিট) বিনিময়ঃ ২৫০/- টাকা। যোগাযোগ ইমেল:  nilaykrbasak@gmail.com। দূরভাষ: ৯৫৬৪৬৫৫৩৫৫/৯৪৭৫৩৪৪০১৫

Developed by DXDasia