৩৭তম জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ : অখণ্ড বাংলায় যার বীজ বপন হয়েছিল

রক্ত-সংকট দূর করার ব্রত নিয়েই প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপিত হল এবছর

৯ নভেম্বর রাজ্যজুড়ে পালিত হল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের ৩৭তম জন্মবর্ষ। বিজ্ঞান নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছরই এই দিনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি। এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করতে ‘প্রাণের রক্তদান’ শীর্ষক একটি কর্মসূচির আয়োজন করে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ।

বর্ষশেষের পথে, কিন্তু অতিমারী শেষ হয়েও শেষ হয়নি। তাই, শেষ মুহূর্তের কোনওরকম স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত শিথিলতাকে প্রশয় না দিয়ে, প্রাণের ছন্দ খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যেই মূলত এদিন কলকাতার এ জে সি বোস রোডে, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য দপ্তরে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। রক্তদান করেন ৩৭জন বিজ্ঞান কর্মী। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দত্ত, সভাপতি কলকাতা জেলা এবং রাজ্য সহ সভাপতি। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক প্রদীপ মহাপাত্র-সাধারণ সম্পাদক, অধ্যাপক সত্যজিৎ চক্রবর্তী-কার্যকরী সভাপতি, অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তী, তপন সাহা, উৎপল দত্ত, অধ্যাপক অরুণাভ মিশ্র, তপন গিরি, সঞ্জয় ঘোষ, তনুশ্রী চক্রবর্তী, তাপস সাহা, দেবব্রত মন্ডল, সুরজিত সাহা, অজিত মিত্র, অচ্যুত চক্রবর্তী।  

“বিজ্ঞান মঞ্চের প্রতি জন্মদিনেই রাজ্য জুড়ে নানা সচেতনতামূলক কাজকর্ম করা হয়ে থাকে। সকলেই জানেন, কোভিডের সময় রক্ত সংকট দূর করার সাথে সাথে মানুষের পাশে থেকে কীভাবে সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছিল বিজ্ঞান মঞ্চ।  ৩৭তম জন্মদিনে আমরা ‘প্রাণের রক্তদান’ নামে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেছিলাম। তার আগে আমাদের পতাকা উত্তোলন হয়। রাজ্যের অন্যত্রও রক্তদান শিবির, বৃক্ষরোপণ, আলোচনা সভা ইত্যাদি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা দিবস পালিত হয়েছে।” পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের (কলকাতা) সদস্য তথা কোষাধ্যক্ষ দেবব্রত মণ্ডল একথা জানান বঙ্গদর্শন-কে।

বর্তমানে গ্রামীণ এলাকায় বিজ্ঞান বা বিজ্ঞান মঞ নিয়ে আদৌ কি কোনও সচেতনতা তৈরি হয়েছে? দেবব্রতবাবু বলেন, “শহর বা শহরতলির মানুষ এ নিয়ে যতটা সচেতন, স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় ততটাও সচেতনতা তৈরি হয়নি। তবে, তৈরি যে একেবারে হয়নি তা নয়, এখন সাপে কামড়ালে মন্ত্র-তন্ত্রের বদলে গ্রামের মানুষ হাসপাতালে যায়। পুকুর বোজানো বা ডাইনি অপবাদের মতো কুসংস্কারমনস্কতাও এখন আর সেভাবে নেই। দেখুন, এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আমরা ধৈর্যের সঙ্গে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করে মানুষের মননে বিজ্ঞান-সচেতনতা তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। সারা বছর সেরকমই কর্মসূ্চির মধ্যে দিয়ে যাই আমরা। ধীরে ধীরে হলেও পরিবর্তন তো আসছে।”

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ২৯ নভেম্বর, ১৯৮৬ সালে। যদিও স্বাধীনতার অনেক আগে, অখণ্ড বাংলায় এর বীজ বপন হয়েছিল। ৩০ এবং ৪০-এর দশক, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মশাল জ্বলতে শুরু করেছে তখন। সেই সময় অর্থাৎ ঔপনিবেশিক সময়েও এদেশে বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু হয়েছিল। সেই কারণে সেসময় বিজ্ঞান গবেষণার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের পেয়েছি আমরা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কলকাতা, বোম্বে এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা কেন্দ্র যেমন, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স, এশিয়াটিক সোসাইটি আমাদের দেশে জন্মে নিয়েছিল। জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সিভি রমন, রামানুজন, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কেএস কৃষ্ণান, এইচজে ভব প্রমুখ বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। বহু প্রাচীন কুসংস্কার, গোঁড়ামি, অস্পষ্টতার বিরুদ্ধে লড়াই করে, দেশের মানুষকে আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তাধারায় আবদ্ধ করার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে বিজ্ঞান একটা বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল। এদেশে বিজ্ঞান আন্দোলনের একটা নতুন ধারা শুরু হয়েছিল বলা যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ বর্তমানে আমাদের দেশের বৃহত্তম পিপলস্ সায়েন্স মুভমেন্ট (PSM) সংগঠনগুলির মধ্যে একটি। এর সদস্য সংখ্যা ইতিমধ্যে ৩ লাখ ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ পশ্চিমবঙ্গের ২২টি জেলায় তার ইউনিট পেয়েছে। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে নিম্নস্তরের ইউনিটের মাধ্যমে কাজ করছে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। রাজ্য জুড়ে অসংখ্য ইউনিটের সাহায্যে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ হাজার হাজার বিজ্ঞান কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখছে যারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক, শিক্ষক, ডাক্তার, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা এই রাজ্যে শক্তিশালী পিপলস্ সায়েন্স মুভমেন্ট-এর বিকাশের জন্য পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ-এর আহ্বানে এগিয়ে এসেছেন।

ছবিসূত্রঃ পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ কলকাতা

Developed by DXDasia