রোববার হলেই পাখি দেখতে বেরনো শুভঙ্কর পাত্র ও তাঁর টিম সানডে ওয়াচ-এর

হাওড়ার বিশিষ্ট পাখি-বিশেষজ্ঞ শুভঙ্কর পাত্র, যাঁর পাবলিক গ্রুপ ‘সানডে ওয়াচ’

শ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার প্রকৃতিপ্রেমীদের দীর্ঘ এক ইতিহাস রয়েছে। কবি নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “আমি হব সকালবেলার পাখি/ সবার আগে কুসুম বাগে/ উঠব আমি ডাকি।” – যাঁদের প্রতি সকালে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে, তাঁদের বেশ ভাগ্যবান মনে হত। যদিও শহরে এখন ব্যস্ততা বেড়েছে। গ্রামবাংলার চিত্রও পাল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। পাখিদের আস্তানা খুঁজে পাওয়া প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে। তবুও একদল মানুষ, যাঁরা বাঁচেন পাখি দেখার নেশায়। তাঁদের বলতে ইচ্ছা করে, ভরপুর প্রেমিক। প্রেম না থাকলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলন কি সম্ভব!

শুভঙ্কর পাত্র

হাওড়া জেলার বালি শহরের বিশিষ্ট পাখি-বিশেষজ্ঞদের একজন হলেন শুভঙ্কর পাত্র। যাঁর পাবলিক গ্রুপ ‘সানডে ওয়াচ’ অর্থাৎ রোববারে দেখা। প্রতি রোববার একদল প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ কলকাতা তথা কলকাতা সংলগ্ন নানান অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান শুধুমাত্র পাখিদের ক্যামেরাবন্দি করবেন বলে। এই দলটি ফিল্ডে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নোট সংগ্রহ করেন এবং গভীর পর্যবেক্ষণে মত্ত থাকেন। একেই তাঁরা ‘সানডে ওয়াচ’ বলছেন। দলটি পরিচালনা করেন শুভঙ্কর পাত্র, যিনি তাঁর সমস্ত জীবনটাই উৎসর্গ করেছেন প্রকৃতিতে। মানুষকে তিনি শেখাতে চেষ্টা করেন, প্রকৃতিকে একটুও বিরক্ত না করে কীভাবে তার কাছাকাছি যেতে হয়। কিন্তু নিজে একজন পাখি-বিশারদ হয়ে পাখিদের ছবি তোলেন না কেন? উত্তরে শুভঙ্করবাবু জানান, “ছবি তুলতে গেলে অনেককিছুই দেখা হয় না। অনেক পাখি, প্রজাপতি, ফড়িং, গাছপালা নজর এড়িয়ে যায়। তাছাড়া পাখিদের ছবি তুলতে ভালো ক্যামেরাও লাগে এবং সেটা অনেক অর্থের ব্যাপার।”

ফটকা

‘সানডে ওয়াচ’ আক্ষরিক অর্থেই প্রকৃতিপ্রেমীদের নিজস্ব একটি ফোরাম। ফেসবুকে এই গ্রুপের বর্তমান সদস্য সংখ্যা কুড়ি হাজার ছাড়িয়েছে। শুভঙ্করবাবুর আশঙ্কা, নগরায়নের জন্য শহর থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে সবুজ আবরণ, যা পাখিদের জন্য আতঙ্কের। “গত পঁচিশ বছরে কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৩৫০টি পাখির প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তার মধ্যে রাজারহাট এলাকাতেই প্রায় ২০০টি প্রজাতি রয়েছে।” জানাচ্ছেন মিস্টার পাত্র।

এখানেই শেষ নয়। রাজারহাটের বার্ডিং সাইটে এমনকিছু প্রজাতির প্রজনন হয়েছে, যা দুষ্প্রাপ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের পাখি ইতিহাসের রেকর্ডে প্রথম। শুভঙ্কর পাত্র বলছেন, কিছু বছর আগে রাজারহাটে Desert Wheatear পাখির সন্ধান মিলেছিল, যা রাজ্যে প্রথম। সাম্প্রতিককালে চড়াই পাখির মতো দেখতে খুব বিরল একটি প্রজাতির পাখি দেখা গিয়েছিল, যার নাম Isabelline wheatear।

বেনেবউ

“পাখি সব করে রব রাতি পোহাইলো” – ছোটোবেলায় পড়া কবিতার সেই লাইনগুলো মনে পড়ে? কলকাতা কর্পোরেট শহর হলেও, এখনও দক্ষিণ কলকাতা কিংবা সল্টলেকের মানুষদের ঘুম ভাঙে পাখিদের ডাকে। কোকিল, দোয়েল বা চড়াই-এর কিচিরমিচির সুন্দর করে তোলে প্রত্যেকটা সকাল। যেমন, দোয়েল বিভিন্ন সুরে গান গায়, যে কারণে ডঃ সেলিনারি দোয়েলকে বাংলার নাইটিংগেল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কাঠঠোকরা

আসলে পাখি দেখার নেশা ফুরোবার নয়। কলকাতা ছাড়াও বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ভৌগলিকভাবে এমন জায়গায় অবস্থান করছে, যা পাখিদের জন্য আরাম-নিরাপদ দুটোই। পাখি বিশারদরা তাই কলকাতা-সহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি জায়গাকে ‘বার্ডিং হটস্পট’ বলে উল্লেখ করেন। যেখানে পাখিরা এসে খানিক নিজেদের মতো নিরিবিলি খুঁজে পায়।পৃথিবীর বিরল প্রজাতির পাখিদের অন্যতম আস্তানা হয়ে যায় বাংলার কিছু সবুজাংশ। জীবনানন্দ দাশ যেমন তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, “সব পাখি ঘরে আসে”… পাখিদের উড়তে দিন, ঘরে ফিরতে দিন। ওরা শান্তিতে থাকলে প্রকৃতি সজীব থাকবে, হাসতে থাকবে।

নীলকণ্ঠ

______________

শুভঙ্কর পাত্রের ফেসবুক লিংক: https://www.facebook.com/shubhankar.patra.735 | সানডে ওয়াচ ফেসবুক গ্রুপ লিংক: https://www.facebook.com/groups/sundaywatch.org

ব্যহহৃত পাখির ছবি: প্রদ্যুৎ চৌধুরী

Developed by DXDasia