
মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম আদি ঘোড়া তাপস বাপি দাসকে নিয়ে স্মৃতিচারণ
“অন্যের কথা থাক, শুধু আমাদের কথা বলি
কতিপয় শীর্ণ তেজি যুবক,
আমরা মহীনের ঘোড়াগুলি”
এ শহরের ঘোড়ারা ক্রমশ দলছুট হচ্ছে। একরোখা তেজি সেই অশ্বারোহীরা একদিন হঠাৎ বজ্র বিদ্যুতের মতো আছড়ে পড়েছিল বঙ্গ সংস্কৃতিতে। তারা চেয়েছিল পালাবদল — সংস্কৃতির, বেঁচে থাকারও। একলা একা নয়, বরং দলবদ্ধ ভাবে জীবনকে উদযাপন। তখন যারা ঘোড়াদের ‘পাগলের প্রলাপ’ বলেছিল, পরবর্তীকালে তারাই ঘরে ঘরে বসত করিয়েছে তাদের। ভালোবেসে ফেলেছে। প্রেমে পড়েছে। বহুবার বিচ্ছেদ৷ তবুও বেলাগাম সেই ঘোড়াদের সঙ্গে ছুটেছে অনন্ত গতিতে। বাংলা মৌলিক গানের দিকপাল গৌতম চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়, তাপস বাপি দাস, রঞ্জন ঘোষাল, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুনেন্দু দাসেরা বাংলা গানে গতি দিলেন। একে একে দেউটি নিভেছে। শহর হারিয়েছে মহীনের ঘোড়াগুলির অন্যতম আদি ঘোড়া তাপস বাপি দাস-কেও৷
মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি বই প্রকাশ আড্ডা, তাপস বাপি দাসের সঙ্গে হিরণ মিত্র
মহীনের ঘোড়াগুলি তাদের ইশতেহারে জানিয়েছিল, “হার্মোনাইজেশনে ভরিয়ে তুলতে চাই আমাদের গান। গানের কথায় আনতে চাই স্নায়ুতন্ত্রী নির্ভর প্রাত্যহিকী। সাধারণ অর্থে অনভ্যস্ত কানে যতদিন পর্যন্ত না মহীনের ঘোড়াগুলির গান আপনাদের প্রিয় হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত বেঁধে যাব গান।” — তারা কথা রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গিয়েছে আস্ত একটি দল। তবুও তারা হারিয়ে যায়নি। মহীনের লেগাসি আজীবন বয়ে নিয়ে গিয়েছেন তাপস বাপি। তৈরি করেছেন মহীন এখন ও বন্ধুরা। তৈরি হয়েছে নতুন গান। মহীনের পুরোনো গানগুলিও নতুন ভাবে নতুন প্রজন্মের চাহিদায় সেজে উঠেছে। কালের যাত্রার ধ্বনি দিকে দিকে বেজে গেছে, তবুও মহীন আদি ও অন্তহীন।
এপার বাংলায় সত্তরের দশকে যে ফোক-রক ব্যান্ড বাংলা গানের দুনিয়ায় রেনেসাঁ এনে আলোড়ন ফেলেছিল তার নাম মহীনের ঘোড়াগুলি। এ প্রজন্ম আজও ভালোবেসে গেয়ে ওঠে, ‘ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে’ অথবা ‘তাকে যত তাড়াই দূরে দূরে’। যুগোত্তীর্ণ সমস্ত গান আপামর বাঙালি শুনেছেন অথচ অনেকেই হয়তো জানেননি এই গানগুলির রচয়িতা তাপস বাপি দাস। মহীনের ঘোড়াগুলির সহ প্রতিষ্ঠাতা। বছর ৬৮-তেও চিরসবুজ দামাল ছিলেন তিনি। তাপস বাপি ছোটোবেলায় বাবা-মার হাত ধরে নকশাল যুগের আগেই বাংলাদেশ থেকে এদেশে চলে আসেন। জীবন এগোতে থাকে কৈশোরের দিকে। প্রথম প্রেম, প্রথম চাকরি। টালমাটাল এক সময় হঠাৎ মণিদার (গৌতম চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে সাক্ষাৎ। তাপস বাপি দাস জীবনের শেষ দিন অবধি বলে গিয়েছেন, মহীনের ঘোড়াগুলি শুধু একটা গানের দল নয় এটা একটা দর্শন, একটা শক্তি।
মহীনের ঘোড়াগুলি ছিল একটা কমিউনিটি, যারা তথাকথিত অনিয়মকে নিয়ম বলে বিশ্বাস করত। কোনটা নিয়ম আর কোনটা অনিয়ম, সেটা কে ঠিক করে দেবে? বাপিদা সদাচঞ্চল, সদা হাস্যময়, হঠাৎ নড়বড়ে, হঠাৎ সোজা মেরুদণ্ড। মেরুন সন্ধ্যালোকে বসে বাপিদার নৌকা চলেছে শাদা কাশফুলের গভীরে। মেজর-মাইনর স্কেলকে মিলিয়ে দিয়ে বাংলা গানে নিয়ে এসেছেন যত ছন্নছাড়া। বাংলায় যেমন শচীন কত্তা, অখিল বন্ধু ঘোষ, সুপ্রভা সরকারদের প্রতিদিন শুনতেন তাপস বাপি; তেমনই আরেক কানে প্রতিদিন বাজত বব ডিলান, সাইমন অ্যান্ড গারফাঙ্কেল, জিম রিভস, এভারলি ব্রাদার্স, সিসিআর, কিংস্টনট্রিয়ো। ‘মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি’ (তাপস বাপি দাসের আত্মজীবনী মূলক বই) বইয়ে তাপস বাপি নিজেই লিখেছেন, “আমার জীবনে শোনা প্রথম ইংরেজি গান— ‘I hear the sound of distant drums’। গানটা জিম রিভস-এর গম্ভীর গলায় গাওয়া। তারপর শুনলাম প্যাট বুন আরও অনেক। ভীষণ এঞ্জয় করলাম। মনে হল আমাদের বাংলার হেমন্ত মুখার্জি, দ্বিজেন ব্যানার্জি। এঁদের গলায় এইসব গান বসিয়ে দিলে তো একইরকম লাগবে। ভাষাটা আলাদা।”

তাপস বাপির সঙ্গে গৌতম চট্টোপাধ্যায়
তাপস বাপিরা আসলে বহমান সেই নদী। যে নদীবক্ষে বয়ে যায় কত সুর আর কত গান। বাংলা মৌলিক গানকে উথাল-পাতাল করে ঝড়ের গতিতে ধেয়ে আসা দামাল সেই অশ্বারোহীদের একজন তাপস বাপি প্রয়াত হলেন। রেখে গেলেন দিন বদলের গান৷ যে গান গাওয়া হবে প্রতিটি বিপ্লবের ঘনঘোর রাতে। যে গানে গলা মেলাবে সদ্য প্রেমে পড়া যুগল। বাপিদা, আপনাকে ভালোবাসি…
“ভালোবাসি পিকাসো, বুনুয়েল, দান্তে
বিট্ল্স্, ডিলান আর বেঠোফেন শুনতে ।
রবিশংকর আর আলি আকবর শুনে
ভালোবাসি ভোরে কুয়াশায় ঘরে ফিরতে।
তবুও কিছুই যেন ভালো যে লাগে না কেন
উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে যেন,
কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।”
