কেন্দ্রীয় সমীক্ষার রিপোর্টে উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে বাংলার মুসলিম ছাত্রীরা

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যে উচ্চশিক্ষায় মুসলিম পড়ুয়া বেড়েছে প্রায় ৩০০০ জন

যে কোনও দেশের কাছে, যে কোনও সমাজের কাছে শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থা হলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “Education is the most powerful weapon which you can use to change the World.” এই কথাটি থেকেই সমাজে শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। শিক্ষা মানুষ গড়ে, সমাজ গড়ে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন দিশায় এগোবে, তা ঠিক করে দেয় শিক্ষা। শিক্ষার অনেকগুলি মাধ্যম আছে। তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এর মাধ্যমে শিক্ষা ছড়িয়ে যায় মানুষের ঘরে ঘরে। একসঙ্গে অনেক মানুষকে আনা যায় শিক্ষার প্রাঙ্গণে। প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এগিয়ে আসার সু্যোগ পায়। ভারতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবিকা অর্জনের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড। তাছাড়া, এই দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প জড়িয়ে আছে। যেমন, শিশুদের জন্য মিড ডে মিল। তার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়ে উঠেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, উচ্চশিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার সুযোগের প্রশ্ন। আর থাকে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। ফলে শুধুমাত্র প্রাথমিক শিক্ষাই নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। উচ্চশিক্ষার এই ক্ষেত্রের মূল্যায়ন করতে, কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রকের অধীনস্থ উচ্চশিক্ষা বিভাগ (Department of Higher Education) প্রতিবছর একটি বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। নাম অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হাইয়ার এডুকেশন (All India Survey on Higher Education- AISHE)। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, অন্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম মেয়েরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে রয়েছেন।

ভারতের উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত রিপোর্টটি যেহেতু সর্বভারতীয়, তাই মূল্যায়নের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি সব অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানকেই। মাপকাঠি হিসেবে বিবেচ্য হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি কলেজ ও ইউনিভার্সিটি, সেখানকার পরিকাঠামো, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত, ছাত্রীদের সংখ্যা, পিছিয়ে পড়া শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের যোগদানের হার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের যোগদানের হার ইত্যাদি। সেখানেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ছাত্রীদের অগ্রসর হওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী এই পরিসংখ্যান, সারা দেশের নিরিখে খানিকটা ব্যতিক্রমীও বটে। সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে, সারা দেশে যেখানে উচ্চশিক্ষায় মুসলিম পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে এক লক্ষের বেশি, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম পড়ুয়ার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩০০০ জন।

সারা দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির নিরিখে এই পরিসংখ্যান খানিকটা আশার সঞ্চার করে। সব দেশেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরা সাধারণত আর্থিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন। শিক্ষাক্ষেত্রে এবং সামাজিক-আর্থিক ক্ষেত্রগুলিতে তাঁদের যোগদানের পরিমাণ সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষদের থেকে সার্বিকভাবে কম থাকে। সম্প্রতি ভারতের নতুন শিক্ষানীতি NEP-2020 নিয়ে শিক্ষামহলে বিতর্কও কম হচ্ছে না। কিছুদিন আগেই আমরা পেরিয়ে এসেছি কোভিডকাল। তার প্রভাবে বেড়েছে স্কুলছুটের পরিমাণ, বন্ধ হয়ে গেছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সমাজ পরিচিত হয়েছে ডিজিটাল ডিভাইডের বিভীষিকার সঙ্গে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অনলাইন শিক্ষার চল বেড়েছে, যেখানে পড়তে গেলে অনেক অর্থব্যয় করতে হয়। তার উপর মেয়েদের ঘিরে থাকে অগুনতি সামাজিক ট্যাবু। ফলে তাঁদের ক্ষেত্রে লড়াইয়ের পথ হয়ে ওঠে আরও দুর্গম। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি যে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও সংখ্যালঘু ও অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে সার্বিকভাবে প্রবেশ করেনি শিক্ষার আলো। অনেকক্ষেত্রেই অভিভাবকেরা নিতান্ত কম বয়সেই নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। সংসারের চাপে মেয়েদের স্বপ্নগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। সংখ্যালঘু সমাজের অনেক পরিবারেই আজও প্রচলিত সামাজিক পর্দাপ্রথা, যার শিকার হন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েরাই। সেখানে উচ্চশিক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মেয়েদের যোগদান-এর হারে বৃদ্ধি স্বভাবতই প্রশংসার দাবি রাখে। এর অর্থ, তাঁরাও ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহস পাচ্ছেন। সবার সঙ্গে সামাজিকভাবে যুক্ত হয়ে লড়াই করে বুঝে নিচ্ছেন নিজেদের অধিকার। সারা দেশে বিভিন্ন অনগ্রসর শ্রেণির পড়ুয়াদের মধ্যেও বেড়েছে উচ্চশিক্ষায় যোগদানের প্রবণতা। সারা দেশ জুড়ে আজও যখন মাঝেমধ্যেই উঠে আসে জাতিগত ছুঁৎমার্গ আর তথাকথিত ‘নিচু জাত’-এর মানুষকে নিপীড়নের ভয়াবহ ঘটনা, তখন এমন পরিসংখ্যান কম বড়ো কথা নয়। প্রান্তিক মানুষগুলির অনেকেই এখনও দৈনন্দিন সাধারণ সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেকেই শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশের সুযোগই পান না। অনেককেই শিশুশ্রমিক হিসাবে কাজ করতে হয় রোজকার জীবন চালাতে, উচ্চশিক্ষা তো দূরস্থান। সেখান থেকে উঠে এসে উচ্চশিক্ষায় নিজেদের ছাপ রাখছেন তাঁরা। সংখ্যালঘু এবং অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের মুখোমুখি হতে হয় অনেক সামাজিক লাঞ্ছনার। মেয়েদের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা, বিশেষত সংখ্যালঘু মেয়েরা আর্থিক স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার অধিকার পান না। সেখানে এইসব পরিসংখ্যান তাঁদের লড়াই আর সাফল্যের প্রতিচ্ছবি বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। প্রসঙ্গত, কেরল, তেলেঙ্গানা, কেরল বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় যোগদানের প্রবণতা বেড়েছে, কমেছে উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক বিভিন্ন রাজ্যে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পরিমাণ ছিলো ১.৮৯ কোটি। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে হয়েছে ২.০১ কোটি। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৪.২% শতাংশ হলো বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। সারা দেশে বিজ্ঞান ক্ষেত্রে ভর্তির হারেও এগিয়ে মেয়েরা। এই পরিসংখ্যান বহুদিন ধরে চলা একটি মিথকেও ভেঙে দিয়েছে। যে মিথ বলত, মেয়েরা বিজ্ঞান বোঝে না। মুসলিম সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পরিমাণ ৪.৬% এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে তা ২%।

কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রকের অধীনস্থ উচ্চশিক্ষা বিভাগ (Department of Higher Education) প্রতিবছর একটি বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। নাম অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হাইয়ার এডুকেশন (All India Survey on Higher Education- AISHE)। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের রিপোর্টটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, অন্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম মেয়েরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে রয়েছেন।

শিক্ষাবিদদের মতে, ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং বৃত্তি এই বদলের অন্যতম কারণ। মাদ্রাসাগুলিও পরিকাঠামোগত ভাবে উন্নত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান ও কলাবিভাগগুলিতে বুনিয়াদি শিক্ষায় জোর দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, ম্যানেজিং কমিটিতে রাখা হচ্ছে মায়েদেরও। এই উন্নতিতে ভূমিকা রয়েছে আল আমিন মিশনের মতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিরও। তবে এখনও খামতি আছে অনেকটাই। এখনও শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়া যায়নি সব ঘরে। পরিকাঠামোগত উন্নতি, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতে বৃদ্ধি করা, উন্নতির অবকাশ রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। 

সার্বিকভাবেও রাজ্যে উচ্চশিক্ষায় ছেলেদের থেকে মেয়েদের যোগদানের হার বেশি। যা সমাজবদলের চিহ্ন হিসাবেই দেখছেন সমাজতত্ত্ববিদেরা। তাঁদের মতে, সারা দেশেই, স্কুল ও কলেজস্তরের পরীক্ষার মেধাতালিকায় উপস্থিতি বাড়ছে মেয়েদের। আর্থিক ও সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে তাঁদের যোগদানের পরিমাণ বাড়ছে। প্রতি বছর রাজ্য ও জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পরীক্ষাতেও ভালো ফল করছেন তাঁরা। এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে, সমাজের মত পাল্টাচ্ছে। মেয়েরা হয়ে উঠছেন সাহসী আর স্বাবলম্বী।  

তথ্যসূত্রঃ AISHE Report 2020-21

Developed by DXDasia