
আগামী রবিবার পারলে ব্যতিক্রমীদের কথা ভাবুন, সবাইকে সম গুরুত্ব দিন
আমার মা যখন অন্তঃসত্ত্বা, বাবা চাইতো একটা মেয়ে হোক। নিজে মুখে সেভাবে বলতো না কারণ, বাবা সতর্ক থাকতো মেয়ে না হলে মায়ের উপর তার এই চাওয়ার কী প্রভাব পড়বে, সেকথা ভেবে। পাড়ায় কারো বাড়িতে ছোট্ট মেয়ে থাকলে তাকে নিজে হাতে সাজিয়ে গুজিয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়াতো। হাসপাতালে মা যখন প্রথমবার আমাকে বাবার কোলে তুলে দিচ্ছিল, বাবা নাকি ভয় পেয়েছিল, ‘হাত থেকে যদি পড়ে যায়!’ চাকরিসূত্রে প্রতিদিন মফস্সল থেকে কলকাতা, সারাদিনের পাঁচ-ছ’ ঘণ্টা যাতায়াতেই বেরিয়ে যেত। রাতে বাড়ি ফিরে অল্প বিশ্রাম, তারপর সদ্য আঁতুড় পেরনো মেয়ের সঙ্গে সময় কাটানো। আমার জন্মের পর বেশ কিছুদিন এটাই ছিল বাবার রুটিন। সময় কীভাবে রাত থেকে ভোর অবধি গড়িয়ে যাচ্ছে, সে খেয়াল হওয়ার আগেই বাবাকে বেরিয়ে যেতে হতো ভোর ৪টের প্রথম বাসটা ধরতে। আর আমি নাকি সারারাত নাইট বাল্বের দিকে তাকিয়ে খেলতাম, বাবা পাশে বসে ঘুমের আরাম ভুলে থাকতো দিনের পর দিন। মা রাত জাগতে পারতো না।
যাঁরা এই ঘটনা শুনে ভাবছেন আমি যথাযথ একজন বাবা পেয়েছি, তাঁরা ঠিকই ভাবছেন। আমি বলতেই পারি পিতৃস্নেহ কাকে বলে, অভূতপূর্ব ভাবে তা জানার সুযোগ পেয়েছি। আমি এও বিশ্বাস করি, আমার মতো অনেকেই আছেন এবং একজন ‘আদর্শবান’ বাবা বলতে আমরা যা বুঝি, তার প্রচুর উদাহরণও আমি পেশ করতে পারি। তবে, আমি বলতে পারি নব্বইয়ের দশকের কথা, যখন ‘বাবা দিবস’ উদযাপনের কোনও ধারণা আমাদের ছিল না। যদিও অনেকদিন আগেই সোনোরা স্মার্ট ডড নামে এক মহিলা ১৯১০ সালের জুনের তৃতীয় রোববার তাঁর বাবা, আমেরিকার গণযুদ্ধের যোদ্ধা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্টের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দিনটা প্রবর্তন করেন। সমাজের কাছে এগুলো আসলে খুবই প্রত্যাশিত এবং স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফাদার্স ডে’ প্রবর্তনের এই ইতিহাসটাই কি শেষ কথা? এটাই কি ‘ফাদার্স ডে’ পালনের একমাত্র গল্প হয়ে উঠতে পারে? নিয়মের বাইরে ব্যতিক্রমী অস্বিত্বগুলোর তাহলে কী হবে, যা বারবার অস্বীকার করা হয়, ‘অপ্রত্যাশিত’, ‘অস্বাভাবিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়?
‘লিঙ্গ’-র সঙ্গে বাবা হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই, পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে বাবা হওয়ার কোনও যুক্তি নেই, এমনকী বাবা হতে গেলে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ গোত্রের হওয়ারও দরকার পড়ে না
যাঁরা সাড়ম্বরে ‘বাবা দিবস’ পালন করছেন, ভুলে যাবেন না যে, ‘লিঙ্গ’-র সঙ্গে বাবা হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই, পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে বাবা হওয়ার কোনও যুক্তি নেই, এমনকী বাবা হতে গেলে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ গোত্রের হওয়ারও দরকার পড়ে না। আমরা দশকের পর দশক যুদ্ধে ইন্ধন দিতে পারি, শুধু মেনে নিতে অসুবিধা হয় একজন মহিলা, একজন রূপান্তরকামী, একজন অবিবাহিত পুরুষ, একজন হিজড়ে, একটা মাছও ‘বাবার মতো বাবা’ হতে পারে। ‘ফাইন্ডিং নিমো’ নামে যে অ্যানিমেশন ছবিটি ২০০৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল, সেটার কথাই ভাবুন না। বাবা ও ছেলে মাছের গল্প। শিশু মাছ নিমোকে উদ্ধারের জন্য তার বাবা মার্লিন মহাসাগর পাড়ি দেয় এবং সব বিপদ আপদ কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত ছেলেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। অসাধারণ চিত্রনাট্যের এ ছবিটি বাবা-সন্তানের মধ্যকার নির্ভরতা ও ভালোবাসার সম্পর্কের এক অনবদ্য চিত্ররূপ।
প্রথাগত ধারণার বাইরে বেরতে অসুবিধা হলে মুক্তচিন্তা, ভালোবাসা, স্নেহ, সাহিত্য, সিনেমা, শিল্প, বিজ্ঞান -যা কিছুর শরণাপন্ন হতে পারেন। কিন্তু, নিজের অপারগতা অন্যের উপর চাপিয়ে দেবেন না। মর্যাদা দেওয়ার বদলে খামখা কে বাবা হওয়ার যোগ্য আর কে নয়, খাপ পঞ্চায়েত খুলে, ভুল বিচার করে নিজেকে এবং অপরকে অন্ধকারে ঠেলে দেবেন না। আর একটা বিষয়, বাবা মানেই তাকে সব পরীক্ষায় ১০০ পেতে হবে, এই ধারণাও ত্যাগ করুন। ব্যতিক্রমের কথা ভাবুন, কথায় কথায় নম্বর কাটবেন না। যাঁরা ‘যথাযথ’ বাবা হয়েও সমাজের নিথর ভাবনার শিকার হয়েছেন, আমি চাই ‘ফাদার্স ডে’-তে তাঁরা ‘সুপারহিরো’ হয়ে উঠুন। আপনি কি এরকম কাউকে চেনেন?
