‘আত্মহত্যা করেছেন’-এর বদলে কি ‘আত্মহত্যায় মৃত্যু ঘটেছে’ বলা যায়? প্রশ্ন তুলছে অঞ্জলি

আত্মহত্যা প্রতিরোধে দু-দিন ব্যাপী অঞ্জলির প্রয়াস

“দেশসুদ্ধ লোক চটে উঠল। বলতে লাগলো, “মেয়েদের কাপড়ে আগুন লাগিয়ে মরা একটা ফ্যাশন হয়েছে” – সামাজিক লাঞ্ছনার যূপকাষ্ঠের বলি একটি মেয়ে যখন মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে আত্মহননকেই একমাত্র পথ হিসাবে খুঁজে পেয়ে সেই পথই বেছে নেয়, তখনও সমাজের মানুষ কীভাবে সেই মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করে সেটাই রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছিলেন তাঁর ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পের মৃণালের কলমে। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদা; ইন্টারনেটের দৌলতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এখন এক পাড়ার বাসিন্দা। এই এগিয়ে চলার যুগে পৌঁছেও যখন এই ধরনের খবর আমরা মাঝেমধ্যেই পাই তখন কি একবারও ভেবে দেখি কেন একটি মানুষ এই চরমতম সর্বনাশা সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হয়েছিলেন? তার এই মৃত্যু কি ব্যক্তিগত পরাজয়ের ফল? নাকি, সমাজের অব্যবস্থার পঙ্ক তার জীবনের পথকে এতটাই পিচ্ছিল করে তুলেছিল যে জীবনের দিকে আর ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি সে অর্জন করতে পারেনি। এক একটি আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ কী কী? কীভাবেই বা সেই কারণের পঙ্কিলতা পরিষ্কার করে একজনকে জীবনের পথে ফেরানো যায় তার দিশা খুঁজতেই মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার সংগঠন অঞ্জলি-র ব্যবস্থাপনায় ৩ এবং ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ইএম বাইপাস সংলগ্ন ভিভান্তায় এক আলোচনা চক্রের আয়োজন করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য আত্মহত্যা প্রতিরোধ (National Conference on Suicide Prevention)।

অঞ্জলির প্রতিষ্ঠাতা রত্নাবলী রায় বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলোচনায় জানাচ্ছেন, “আত্মহত্যার পিছনের বিভিন্ন ধরনের সামাজিক শোষণ, পীড়ন এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থাকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করে তার নিরাময়ের ব্যবস্থা না করা হলে আত্মহত্যা কমবে না।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর প্রায় ৭,২০,০০০ জনের বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে প্রাণ হারান‌। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এখনও সেভাবে কোনো আলাপচারিতা হয় না। এখনও ধরে নেওয়া হয় হয়তো বা কোনো ব্যক্তিগত অপরাগতা বা অবসাদের কারণে একটি মানুষ চরম পথটি বেছে নিলেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে বিশ্বে আত্মহত্যার প্রায় ৭৩ শতাংশ ঘটে স্বল্প আয় এবং দারিদ্র্যতার কারণে। তাহলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে কি এই সর্বনাশের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় না? আরও একটি প্রশ্ন, একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষ কি এত পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা করে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন? অঞ্জলির প্রতিষ্ঠাতা রত্নাবলী রায় বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলোচনায় জানাচ্ছেন, “আত্মহত্যার পিছনের বিভিন্ন ধরনের সামাজিক শোষণ, পীড়ন এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থাকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করে তার নিরাময়ের ব্যবস্থা না করা হলে আত্মহত্যা কমবে না।” তিনি আরও জানালেন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্বাস্থ্য সংকটের সময় আত্মহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পায়। আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে উঠছে আরও একটি প্রশ্ন। দেশে আত্মহত্যার হিসাব এবং খতিয়ান রাখে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো। কিন্তু বিগত সাত বছর ধরে মানসিক স্বাস্থ্য শুশ্রূষা আইন অনুসারে আত্মহত্যার ঘটনা অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয় না। এই প্রসঙ্গে রত্নাবলী রায় প্রশ্ন করেন, “তাহলে আত্মহত্যায় মৃত্যুর খতিয়ান কেন রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরে রাখা হবে না? কারণ এটি জনস্বাস্থ্যের বিষয়।”

শুধু দারিদ্র্য নয়, পড়াশোনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রত্যাশা, সম্পর্কে ব্যর্থতা, গার্হস্থ্য হিংসাও মানুষকে এই পথে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু এই অন্ধকার থেকে মুক্তির উপায় কী? রত্নাবলী জানান, অঞ্জলির পক্ষ থেকে সকলের কাছে সুলভে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস করা হয়। সামাজিক সুরক্ষার একটা বলয় তৈরির চেষ্টা করা হয়, কিন্তু এই ধরনের কাজের জন্য অনেকের যৌথ‌ প্রয়াস কাম্য। রত্নাবলীর মতে, “এই ক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও এখনও ফাঁক রয়ে গেছে। যেমন, ‘আত্মহত্যা করেছেন’, এই শব্দবন্ধের ব্যবহারে কোথাও যেন সেই ব্যক্তিটিকেই নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়, তাই ‘আত্মহত্যায় মৃত্যু ঘটেছে’ বলা বাঞ্ছনীয়।‌ আবার বিভিন্ন ডিজিটাল মিডিয়ায় ফাঁসির দড়ির ছবি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়, কিন্তু ওই ধরনের ছবি অনেকের মনে অনেক ধরনের কুপ্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই ধরনের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আরও কিছুটা চিন্তা ভাবনা করা জরুরি।” পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে সকলেরই একটু সহমর্মিতার প্রয়োজন। এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ মানুষকে এই মরণফাঁদ থেকে রক্ষা করতে পারে, তার উদাহরণ তামিলনাড়ু, ব্রাজিল, শ্রীলঙ্কা। 

আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে আশার আলো এই যে ২০২০ সালের সাপেক্ষে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে আত্মহত্যা প্রায় দুই শতাংশ কমেছে, তবে যথাযথ গবেষণার অভাবে কী কী কারণে এই আশার আলো ফুটে উঠছে তা স্পষ্ট নয়। রত্নাবলী জানান, এই দু-দিন ব্যাপী আলোচনা চক্রে তাঁদের লক্ষ্য থাকবে সরকার, সুশীল সমাজ সকলকে পাশে নিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা শূন্য করা। এই আলোচনা চক্রের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে আলোর দিশা দেখানো, তাই দেশের সেরা বিশেষজ্ঞরা এখানে অংশগ্রহণ করে আলাপচারিতার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করবেন। অনেক ছাত্রছাত্রীরাও যোগ দেবেন এই আলাপচারিতার অনুষ্ঠানে।

২০৩৫ সালের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা শূন্য করতে মানসিক স্বাস্থ্য অধিকার সংগঠন অঞ্জলির ব্যবস্থাপনায় দুইদিনের আলোচনা চক্র কলকাতায়।

মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনে তৈরি হয় সমাজ, বেঁধে বেঁধে থাকার এই দুনিয়ায় শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, আত্মার সম্পর্কের বন্ধনে গড়ে ওঠে আত্মীয়তা। তাই আমরা কেউই সমাজ বিচ্ছিন্ন নই, আর সে কারণেই একজন যখন আত্মহননের রাস্তায় এগিয়ে যায় তখন তার সেই সিদ্ধান্তের দায় শুধু তার একার নয়, বরং সমাজের সকলের। সেই দায় স্বীকার করতে হবে সকলকেই। আর অঙ্গীকার করতে হবে একে অপরের পাশে থেকে সমাজে সামাজিক সুরক্ষার জাল বিস্তৃত করে ইতিবাচকতার আলো জ্বালানোর। ভালোবাসার মাস ফেব্রুয়ারিতে সেই ভালোবাসার প্রদীপই জ্বালাবে অঞ্জলি।

Developed by DXDasia