
নারায়ণ দেবনাথের ভেতরে আজীবন বাস করেছে এক কিশোর-বালক
হাওড়ার শিবপুরে সরু গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে যে বাড়িটিতে পৌঁছেছিলাম, তাকে পীঠস্থান বলা চলে। অথচ কোনোদিক থেকেই অসামান্যতার কোনও লক্ষণ চোখে পড়েনি। উঠোন, তা ঘিরে সারি সারি ঘর, বাড়ির গেটে আমাদের স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে থাকা নেড়িকুকুর, সবই সাদামাটা, সাধারণ। ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় নেই, এই বাড়িতেই জন্ম নিয়েছে বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টের মতো বাংলা সাহিত্যের অমর চরিত্র, এই বাড়িতেই ছিলেন নারায়ণ দেবনাথ।
কিংবদন্তি শব্দটা হয়তো একটু সহজেই ব্যবহার করি আমরা, কিন্তু নারায়ণ দেবনাথের ক্ষেত্রে যে এই শব্দ একশো ভাগ প্রযোজ্য, তা নিয়ে আশা করি দ্বিমত পোষণ করবেন না কেউই। হ্যাঁ, তাঁর সৃষ্টিকে ‘সাহিত্য’ আখ্যা দেওয়ায় হয়তো কিছু ভুরু কুঁচকে যাবে, যে নাক উঁচু মনোভাবের ফলেই তাঁর প্রাপ্য থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত হয়ে এসেছেন নারায়ণ দেবনাথ। বাংলায় গ্রাফিক কথাশিল্পের পথপ্রদর্শক, এমন এক ধারা যার সঙ্গে আজও ভালোভাবে পরিচিত নন বাংলার পাঠককুল। অথচ সেই ধারার অগ্রগণ্য শিল্পীর ভাগ্যে অবহেলাই জুটেছে এযাবৎকাল। সে কথায় পরে আসছি।
৯৭ বছরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন নারায়ণ দেবনাথ। তাঁর ভেতরে যে কিশোর বয়স্ক বালক চিরকাল বাস করে এসেছে, তাকে মাঝে মাঝে দেখা যেত বটে, বিশেষ করে কোনও অনুরাগীর সঙ্গে কথা বলার সময়, বা কাজের প্রশংসা শুনলে, তবে বয়স এবং রোগব্যাধি কেড়ে নিয়েছিল প্রাণশক্তির অনেকটাই। কানে কম শুনতেন, চেনা মুখ চিনতেও সময় নিতেন যথেষ্ট। আমাদের দেখে হেসে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ‘হ্যান্ডশেক’-এর ভঙ্গিতে, কিন্তু বিছানা থেকে উঠতে পারতেন না, কথাও ফুটত না বিশেষ।
সহজ-সরল উদার মনের মানুষ বরাবরই, করোনাকালের আগে পর্যন্ত খবর না দিয়েই বাড়িতে চলে আসতেন ভক্তরা, তিনি ফেরাতেন না কাউকেই। অন্য যে কোনও অনুরাগীর মতো আমারও মনে পড়ে যাচ্ছিল স্কুলের বোর্ডিংয়ের রান্নাঘর থেকে কেল্টুদার মিষ্টি চুরি করে খাওয়ার গল্প। বা বাঁটুলের একসঙ্গে একশোটা মিষ্টি খাওয়ার কাহিনি। এসব মনে পড়া কিছু আশ্চর্য নয়, কারণ জীবনের সাধারণতম ঘটনা থেকেই চিরকাল অনুপ্রেরণা পেয়েছেন নারায়ণ দেবনাথ। এমনকি বাঁটুলের পোষা কুকুর ভেদোকে পর্যন্ত তৈরি করেন নিজের কুকুরের আদলে।
তাঁর সৃষ্ট চরিত্র যতই বাঙালি জীবনে প্রবাদপ্রতিম হয়ে গিয়ে থাক না কেন, তিনি নিজেকে প্রচারের আলোয় আনেননি কখনোই। এবং বাংলা সাহিত্য ও শিল্পে অননুকরণীয় অবদান সত্ত্বেও এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই যে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য খ্যাতি এবং অর্থ থেকে বঞ্চিত করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। স্বক্ষেত্রে একমেবাদ্বিতীয়ম্ হিসেবে সম্মান করা তো দূরের কথা, বছরের পর বছর তাঁর প্রাপ্য টাকা দেননি একাধিক প্রকাশক, অথবা সময়ের অনেক পরে দিয়েছেন। তিনি কিন্তু রয়ে গেছেন সেই সহজ সরল উদার মানুষটিই। কপিরাইট নিয়ে আইনি মামলায় জড়াতে বাধ্য হয়েছেন জীবনের এই পর্যায়ে এসে। ওদিকে স্রেফ তাঁর বই বিক্রির টাকাতেই ফুলেফেঁপে উঠেছে একাধিক প্রকাশনা সংস্থা, অথচ তিনি সেই মুনাফার মুখ দেখেননি।
কিছু বছর আগে বদলেছেন প্রকাশক, যাত্রা শুরু হয়েছিল নতুন করে। আনন্দের কথা হল, তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি একটুও। ভাবলে অবাকই লাগে, আপাতদৃষ্টিতে মামুলি প্লট এবং চরিত্রায়ণ সত্ত্বেও এত বছর এই জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। উদাহরণ হিসেবে দেখুন, হাঁদা-ভোঁদা সিরিজ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে, দুটি বিচ্ছু বাঙালি ছেলের গল্প বৈ তো নয়। অথচ প্রথম আবির্ভাবেই হৈচৈ ফেলে দেওয়া এই সিরিজের ভিত্তিতেই ১৯৬৫ সালে বাঁটুল দি গ্রেট-এর পরিকল্পনা করেন নারায়ণ দেবনাথ। বাঁটুল, বাঙালির ঘরোয়া সুপারহিরো, অতিমানবিক গায়ের জোরের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে যার অতি মানবিক মন।
অন্যদিকে নন্টে-ফন্টের প্রথম দর্শন ১৯৬৯ সালে, এবং গোড়ায় হাঁদা-ভোঁদার আদলে শুরু করলেও কেল্টুদা, সুপারিন্টেনডেন্ট স্যার এবং বোর্ডিং স্কুলের প্রেক্ষাপটের ফলে অভিনবত্ব লাভ করে এই সিরিজ।
অতীব জনপ্রিয় এই চরিত্রগুলি বাদেও কিন্তু আরও অনেক চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে কৃতিত্বের দাবি রাখেন নারায়ণ দেবনাথ। ব্যক্তিগত পছন্দের কথা জিজ্ঞেস করলে বলব ১৯৮৩-র ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’-র কথা। এ যুগে যাঁরা মার্কিন সিটকম ‘রিক অ্যান্ড মর্টি’ (২০১৩) দেখেছেন, তাঁরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন খাঁদু এবং তার দাদুর কাণ্ডকারখানা। এছাড়াও বাচ্চাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন বাহাদুর বেড়াল (১৯৮২), যা কতকটা ‘কর্কি দ্য ক্যাট’ দ্বারা অনুপ্রাণিত, পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিসিয়ান (১৯৬৯), শুটকি আর মুটকি (১৯৬৪), এবং পেটুক মাস্টার বটুকলাল (১৯৮৪)। তবে এখানেই থেমে থাকেননি, গোয়েন্দা কৌশিক রায় (১৯৭৬)-এর মতো চরিত্রকে নিয়ে সিরিয়াস গ্রাফিক ডিটেকটিভ উপন্যাসও লিখেছেন নারায়ণ দেবনাথ।
তথাকথিত সমঝদাররা যতই নাক সিঁটকোন, হাঁদা-ভোঁদা বা নন্টে-ফন্টের হাস্যরসের মধ্যে কিন্তু স্থূলতা নেই কোথাও। বরং রয়েছে রোজকার জীবন থেকে হাস্যরস তুলে আনার উপকরণ, যে জীবন সত্তর বা আশির দশকের কলকাতায় বেড়ে ওঠা প্রজন্মের অতি পরিচিত। নারায়ণ দেবনাথের হাস্যরস বরাবরই সামাজিক চেতনার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। যেমন ধরুন, হাঁদা-ভোঁদার একটি গল্পে ভূত সেজে আসল ভূতকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়ে ভোঁদা বলছে, “ভূতেরও তাহলে ভূতের ভয় আছে, কী বলিস হাঁদা?” এ হলো যাকে বলা যায় ‘টিপিক্যাল দেবনাথ’।
তবে পরিবর্তন কি আর আসেনি? পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে একই ধাঁচে রয়ে গেছে চরিত্রগুলি? অবশ্যই নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা ১৯৮০-র দশকে কেল্টুদাকে দেখেছি ‘ডিস্কো দিওয়ানে’ গানের সঙ্গে নাচতে, আবার সেই একই চরিত্র নব্বইয়ের দশকে নাচছে ‘ছাঁইয়া ছাঁইয়া’ গানের তালে। ওদিকে ২০১০-পরবর্তী সময়ে হাঁদা-ভোঁদার হাতে চলে এসেছে মোবাইল ফোন এবং তস্য ক্যামেরা। বদলেছে চরিত্রদের মুখের ভাষাও। প্রথমদিকের হাঁদা-ভোঁদা বা নন্টে-ফন্টে সিরিজে ছিল ‘কর্ণাকর্ষণ’-এর মতো শব্দের ব্যবহার। পরের দিকের ভাষায় দেখি বাংলা, ইংরেজি এবং হিন্দির সংমিশ্রণ, যেমনটা আমাদের চারপাশে হয়ে থাকে।
বিভিন্ন চরিত্রের সামাজিক অবস্থান বোঝাতেও সুকৌশলে ভাষার ব্যবহার করেছেন শিল্পী। তাঁর বিভিন্ন গল্পে বারবার ফিরে এসেছেন বোর্ডিং স্কুলের রান্নার ঠাকুর, ভূত তাড়ানোর ওঝা, ভণ্ড সাধু, চোর-ডাকাত, পুলিশ, এবং গ্রামবাংলার মানুষ। এঁদের মুখে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা বসিয়ে সরাসরি কিছু না বলেও এঁদের সামাজিক অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
টেলিভিশন এবং ভ্যাকুয়াম ক্লিনার-এর আবির্ভাব ঘটেছে হাঁদা-ভোঁদার গল্পে, ঘটেছে বাইসাইকেল এবং ডাংগুলি যুগের অবসান। আশির দশকের শেষের দিকে একটি গল্পে এসেছে টিভির অ্যান্টেনা নিয়ে সমস্যা, যা বুঝিয়ে দিয়েছে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরে ঘরে টিভির উপস্থিতির কথা। এছাড়াও নানা সময় নারায়ণ দেবনাথ তাঁর গল্পে নিয়ে এসেছেন রোলার স্কেট, ইয়ো-ইয়ো, খেলনা বন্দুক, স্ট্যাম্প অ্যালবাম, চিজ, রাস্পবেরি, স্ট্রবেরি, চকোলেট, এবং বাবলগাম-এর মতো পশ্চিমী উপাদান, যখন যেমন এই সব বস্তুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছে বাঙালি শিশুসমাজ।
আরও পড়ুন: শঙ্খ ঘোষের কণ্ঠে পাঁচটি কবিতা
সবচেয়ে বড়ো কথা হল, তাঁর উদ্দেশ্য কখনোই শুধুমাত্র বিনোদন ছিল না। বারবার তাঁর গল্পে এবং আঁকায় উঠে এসেছে সমসাময়িক ঘটনা, তা সে রাজনৈতিক হোক অথবা সামাজিক। ষাটের দশকের শেষে এবং সত্তরের শুরুতে বাঁটুলের গল্পে আমরা পাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। এই সিরিজেই দুই গুন্ডা ভজা-গজার হাতে দেখি বোমা-পিস্তল, যা কিনা অবধারিত ভাবে মনে করিয়ে দেয় সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের কথা, যদিও এই তত্ত্ব কোনোদিনই স্বীকার করেননি নারায়ণ দেবনাথ নিজে।
আমেরিকা, ইউরোপ, জাপানের বড়ো বড়ো শহরে বড়ো বড়ো বইয়ের দোকানে চড়া দামে বিক্রি হয় কমিকসের বই, প্রভূত খ্যাতি এবং সম্মান লাভ করেন কমিকস শিল্পীরা। বাংলার একান্ত আপন নারায়ণ দেবনাথের সেই সৌভাগ্য হয়নি প্রায় কোনোদিনই। থেকে গেছেন বাংলার কমিকস জগতের ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হয়ে। যেখানে বিদেশে কমিকসের মূল স্রষ্টার নির্দেশে কাজ করে আস্ত আস্ত টিম, সেখানে একা হাতে আঁকা-লেখা সবই করে গেছেন বরাবর।
কোনও একজন শিল্পীর আঁকা কমিক স্ট্রিপ-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলা কমিকস হল হাঁদা-ভোঁদা সিরিজ, অথচ এই রেকর্ডের কথা কজন জানেন? এবছর পদ্মশ্রী সম্মান পেয়েছেন তিনি, এই খবর পাওয়ার পর তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, “শেষ পর্যন্ত দিল আমাকে?” গোছের প্রশ্ন। এই কথাগুলির আড়ালে যে কত বছরের অভিমান জমা হয়ে আছে, তার হিসেব কে রাখবে? এমন এক কিংবদন্তীর অভিমান, যিনি সম্ভবত তাঁর সমকক্ষদের কাছ থেকেও প্রকৃত সমাদর পাননি। অন্তত ২০১৩ সালের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারের আগে তো নয়ই।
তাঁর কাজের ঘরে এখনও দাঁড়িয়ে তাঁর আঁকার টেবিল, তার ওপরে আগের মতোই রাখা আছে তুলি-কলম, সামনে শূন্য চেয়ার। ঘরময় ছড়ানো রয়েছে অসংখ্য পুরস্কার, উপহার। কিন্তু সবই কেমন যেন ফিকে ঠেকে। কারণ আসল জায়গায় ফাঁকিটা থেকেই গেছে। বাংলা প্রকাশনার জগতের অপেশাদারিত্ব, দুর্নীতি, চূড়ান্ত অযোগ্য প্রকাশক ও সম্পাদকের অপদার্থতার ফলে হারিয়ে যাওয়া নারায়ণ দেবনাথের বহু অমূল্য ওরিজিনাল আঁকা, এসব কি ভুলে যাওয়া যায়? তাঁর মূল সাদাকালো ছবির ওপর রঙিন কলম চালিয়ে যে কোনোভাবেই সেগুলিকে উন্নত করতে পারেননি আজকের প্রকাশককুল, তাও আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমাদের নাগালের মধ্যেই এমন একজন সুপারহিরো ছিলেন, অথচ আমাদের নজর শুধুই মার্ভেল, ডিসি কমিকসের ওপর। নারায়ণ দেবনাথ প্রকৃতপক্ষেই বাংলার সুপারহিরো। বয়সজনিত কারণে বহুদিন লড়াই করে চলে গেলেন অকস্মাৎ। বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্য তাঁকে মনে রাখবে নিশ্চিত।
