যেন সকাল হলেই সূর্যের আলোর দিকে চেয়ে আবার উঠে দাঁড়াবেন হাসান আজিজুল হক…

প্রয়াত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক

ছোটোবেলায় পড়া বাংলার সাহিত্যিকের দল একে একে ফুরিয়ে আসছেন। সমস্ত পিছুটান ভুলে সুদূর এক চরাচরের উদ্দেশ্যে তাঁদের সেই নির্নিমেষ যাত্রা — সেটাও হয়তো শিকড়ের প্রতি, ভাষার প্রতি ভালোবাসা। যা আজীবন তাঁদের বাঁচিয়ে রাখবে। জানান দেবে, তাঁরা অমর। কারণ সৃষ্টিকর্তার মরণ নেই। এই সারিবদ্ধ চিলের একজন ছিলেন হাসান আজিজুল হক। যিনি প্রধানত গল্পকার এবং যাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘আগুনপাখি’।

হাসান আজিজুল হক আক্ষরিক অর্থেই দুই বাংলার। বাংলাদেশে জীবনের বেশিরভাগ সময়টা যাপন করলেও তাঁর জন্ম এপার বাংলায়, বর্ধমান জেলার যবগ্রামে। ছয়ের দশকে বাংলা সাহিত্যে পা রেখেই তিনি নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। সোচ্চার কণ্ঠে বলতে পেরেছিলেন, প্রতিবাদের ভাষার ভিতর কত সুর। জীবনসংগ্রামে লিপ্ত মানুষের কথকতাই ছিল তাঁর গল্প-উপন্যাসের প্রধানতম অনুষঙ্গ। তার শক্তিশালী নিদর্শন পাই ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসে। যেখানে কেন্দ্রীয় এক মহিলা চরিত্রকে দিয়ে তিনি বলান, “একই দ্যাশ, একইরকম মানুষ, একইরকম কথা, শুধু ধম্মো আলেদা, সেই লেগে একটি দ্যাশ একটানা যেতে যেতে একটো জায়গা থেকে আলেদা আর একটো দ্যাশ হয়ে গেল, ই কি কুনোদিন হয়? এক লাগোয়া মাটি, ইদিকে একটি আমগাছ, একটি তালগাছ, উদিকেও তেমন একটি আমগাছ, একটি তালগাছ! তারা দুটো আলেদা দ্যাশের হয়ে গেল?”

আজিজুল হকের কাছেও দুই দেশ আসলে একটাই আত্মা। আজীবন তাই-ই বিশ্বাস করে গিয়েছেন এবং দৃপ্ত কণ্ঠে তা ঘোষণাও করেছেন বারবার। ১৯৭০ সালে আজিজুল হক পান একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে এবং ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। ২০০৮ সালে কলকাতা থেকে পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার। সার্বজৈবনিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে একটি বেসরকারি ব্যাংকের পক্ষ থেকে সাহিত্যরত্ন উপাধিও দেওয়া হয়।

একটা সময় বাংলাদেশে ছোটোগল্পের রাজপুত্র বলে পরিচিতি ছিল তাঁর। মূলত রাঢ়বঙ্গের রূপকার এই কথাসাহিত্যিক সুঠাম গদ্য এবং মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে গেঁথে গেঁথে থেকেছেন পাঠকের হৃদয়ে। একের পর এক লিখেছেন মননশীল ছোটোগল্প। সেই কারণেই হয়তো অসংখ্য সাক্ষাৎকার ও আলাপচারিতায় বারবার তাঁকে শুনতে হয়েছে, তিনি উপন্যাস লিখছেন না কেন? পাঠকসমাজের উৎসুক প্রতীক্ষার অবসান হয়েছিল ২০০৬ সালে। লেখালেখির প্রায় সাড়ে পাঁচ দশকের পর হাসান আজিজুল হকের কড়া জবাব ‘আগুনপাখি’। আত্মকথন নির্ভর এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। দেশভাগ চলছে। অথচ উপন্যাসের মেয়েটি কিছুতেই ভিটে ছাড়বে না। সবাই একে একে চলে যাচ্ছে। আর উপন্যাসের মেয়েটিকে দিয়ে সাহিত্যিক লিখিয়ে নিচ্ছেন, “আমি কি ঠিক করলম? আমি কি ঠিক বোঝলম? সোয়ামির কথা শোনলম না, ছেলের কথা শোনলম না, মেয়ের কথা শোনলম না। ই সবই কি বিত্তি-বাইরে হয়ে গেল না? মানুষ কিছুর লেগে কি ছাড়লম? অনেক ভাবলম। শ্যাষে একটি কথা মনে হলো, আমি আমাকে পাবার লেগেই এত কিছু ছেড়েছি। …আমি আর আমার সোয়ামি তো একটি মানুষ লয়, আলেদা মানুষ। খুবই আপন মানুষ, জানের মানুষ, কিন্তুক আলেদা মানুষ।”

উপন্যাসের শেষে চরিত্রের দৃপ্ত কণ্ঠে শোনা যায়, “সকাল হোক, সূর্যের আলোর দিকে চেয়ে আবার উঠে দাঁড়াবো আমি। একা।” — এটাই তো সাহিত্যিকের নিজের কথন। সূর্যের পথ ধরে আলোর দিকে আজিজুল সাহেব হেঁটে যাবেন। পিছনে পড়ে থাকবে লক্ষ লক্ষ পাঠক।

দেশভাগ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, সর্বোপরি সামগ্রিক ভেদজ্ঞানের বিরুদ্ধে হাসান আজিজুল হক চরিত্রদের দাঁড় করিয়েছেন। যাদের জীবনে সূর্য ওঠে তার তেজ নিয়ে। বাংলা সাহিত্যের ফিনিক্সকে আমাদের প্রণাম।

Developed by DXDasia