মিউজিক থেরাপিস্ট : যেখানে ডাক্তাররা গান ভালোবেসে গান

ব্যান্ডের নাম ‘মিউজিক থেরাপিস্ট’, দলের সকলেই পেশাদার ডাক্তার

তাঁরা ডাক্তার হিসেবেই পরিচিত। তাঁদের কেউ গুপী গাইনের মতো গায়ক হতে চেয়েছিলেন। কেউ বা বাঘা বাইনের মতো বাজনদার। সুযোগ পেলে ভূতের রাজার কাছে বরও হয়তো চাইতেন। আপাতত সেরকম কোনো সুযোগের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই গড়ে তুলেছেন গানের দল। এ কালের ভাষায় যাকে বলে ব্যান্ড। নাম দিয়েছেন ‘মিউজিক থেরাপিস্ট’। দলের ছয় জনের মধ্যে পাঁচজনই পেশাদার ডাক্তার।

কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা শাখায় অতিব্যস্ত থাকা মানুষগুলি সংগীত ও সুরমূর্ছনার টানে একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছেন। প্রত্যেকের বাড়িতেই ছিল গানের পরিবেশ। সেই থেকেই তাঁরা সংগীতে আকৃষ্ট। কলেজজীবন থেকেই এঁরা ডাক্তারিচর্চার সঙ্গে সংগীতকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।

ডাক্তারি করতে করতে হঠাৎ গানের দল গড়ার প্রয়োজন হল কেন? মিউজিক থেরাপিস্ট দলের বেসগিটার বাদক ও গায়ক তথা কলকাতার একটি প্রথম সারির বেসরকারি হাসপাতালের গ্যাস্ট্রএন্টারলজিস্ট, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুপ্রিয় ঘটক বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “ব্যান্ডের শুরুটা খুব আকস্মিকভাবেই হয়েছিল। একটা ডক্টরস ডে-র অনুষ্ঠানে স্টেজে গান গাইতে উঠেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে আমরা কয়েকজন ছিলাম। তারপর থেকেই শুরু হল দল তৈরির ভাবনা।”

গানের দল তৈরির ঘটনাটা বেশ মজার ছলেই ঘটেছিল। এমনটাই বললেন কলকাতার আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালের এনেস্থেশিয়া বিভাগের ডাঃ তন্ময় রায়। তিনি বলেন, “দুটো অপারেশনের মাঝখানে আমি চায়ের ব্রেক নিয়েছিলাম। সালটা ২০১৭। তখন হঠাৎ ডাঃ ঘটক এসে বলেন, আমরা একটা ব্যান্ড তৈরি করছি, তুমি আমাদের সঙ্গে যুক্ত হবে? এক মুহূর্ত সময় নিইনি ‘হ্যাঁ’ বলতে। তৎক্ষণাৎ রাজি ছিলাম।” এনেস্থেশিয়া বিভাগের এই ডাক্তার ‘মিউজিক থেরাপিস্ট’ দলে কিবোর্ড বাজান এবং গান করেন। স্কুলজীবনেও তিনি ব্যান্ড তৈরি করে গানবাজনা করতেন।

‘মিউজিক থেরাপিস্ট’ দলটা একটা জিয়নকাঠি। এমনটাই মনে করেন ব্যান্ডের গায়ক ডাঃ সুমন মিত্র। ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের ব্যস্ত ডাক্তার তিনি। তাঁর মতে, “ডাক্তারের জীবনটাও খুব সাধারণ মানুষের মতো। তাঁদেরও কিছু সূক্ষ্ম অনুভূতি, ভালোবাসা রয়েছে। পড়াশোনার চাপে, ডাক্তারির চাপে কোথাও যেন আমাদের মিউজিক নামের প্যাশনটা হারিয়ে যেতে বসেছিল। এই ব্যান্ড আবার সেই প্যাশনটা ফিরিয়ে এনেছে এক ছাদের তলায়।

আজকাল এনজিওপ্লাস্টি, এনজিওগ্রাফির নাম শুনলে অনেকে ভয় পেয়ে যান। কিন্তু জানেন কি যিনি এইসব জটিল অস্ত্রোপচার করেন, তিনি একজন দক্ষ বাদক? পেশায় ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজিস্ট ডাঃ অভীক ভট্টাচার্য এই দলের বাদ্যযন্ত্র বাদক। ড্রাম, কাহন ইত্যাদি বাজিয়ে তিনি সংগীতের প্রাণে তাল, ছন্দ যোগ করেন। যাকে বলে পারকাশনিস্ট। নার্সারি স্কুল থেকে তবলা শেখার সেই যে শুরু করেছিলেন, সেটা কিন্তু এখনও বয়ে নিয়ে চলেছেন। এমনকি বাঁকুড়ায় যখন পড়তে গিয়েছিলেন, তখনই একটি অন্ধ স্কুলে তবলা শেখাতেন। তারপর ডাক্তারির জগতে পা রেখেও বাদ্যযন্ত্রের প্রতি অমোঘ টান অস্বীকার করতে পারেননি। তিনি বলেন, “আমাদের প্রত্যেক ডাক্তারকে ১২ ঘণ্টার ডিউটি করতে হয়। তার মধ্যে অপারেশনও থাকে। গানের সুর, ছন্দ, তাল আমাদের স্ট্রেস থেকে মুক্তি দিতে খুব সাহায্য করে। আমি দিনে আধঘণ্টাও যদি ড্রাম বা কাহন বাজাই, তাহলে অনেকটা আরাম পাই।”

মিউজিক থেরাপিস্ট প্রথম অনুষ্ঠান করে ২০১৮ সালের পুজোর সময়। ততদিনে দলের অনেকেই আবার নতুন করে সংগীতচর্চা শুরু করেছেন। ডাঃ সুপ্রিয় ঘটক, ডাঃ অভীক ভট্টাচার্যরা আবার নতুন করে বাদ্যযন্ত্র শেখা শুরু করলেন। পাশাপাশি রীতিমতো সংগীতচর্চায় যুক্ত ছিলেন ডাঃ তন্ময় রায়, ডাঃ পার্থরঞ্জন দাস।

এই পাঁচ জন ডাক্তারকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন কৃষ্ণেন্দু দত্ত। তিনি পেশায় একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক। মিউজিক থেরাপিস্টের এই সদস্য ডাক্তার নন। তবে সংগীতের সঙ্গে সংসার পেতেছেন ২০ বছরের বেশি সময় ধরে। সেই সূত্রেই ডাঃ সুপ্রিয় ঘটকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। 

দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হতে চলল ব্যান্ডের বয়স। নিজেদের গান তৈরির পাশাপাশি আধুনিক বাংলা গানও গেয়েছেন বিস্তর। পাশাপাশি গান গেয়েছেন বিভিন্ন ভাষায়। ইংরেজি, হিন্দির সঙ্গে স্পেনীয়, ইতালীয় ভাষাতেও চলেছে সংগীত চর্চা। লিভার ট্রান্সপ্লান্ট-এর মতো জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করলেও ডাঃ সুপ্রিয় ঘটকের মনে সুর তোলে লালনের গান। মঞ্চে তিনি বাউল গাইতেই বেশি ভালোবাসেন। সংগীতের প্রথাগত শিক্ষা না পেলেও তিনি নিজের মতো করে শেখার চেষ্টা চালিয়েছেন। আবার রেট্রো হিন্দি বা আধুনিক বাংলা গানে সাবলীল ডাঃ সুমন মিত্র মনে করেন, দৈনন্দিন জীবনে গানই তাঁকে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।

প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কি রোগীদের মধ্যেও তাঁরা সুরের রামধনু ছড়িয়ে দিচ্ছেন? ডাঃ সুপ্রিয় ঘটক বলেন, “গানের সূত্রেই এখনও কিছু পুরোনো রোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক রয়ে গিয়েছে। বহু বছর পরেও সেই যোগাযোগ আছে।” ডাঃ তন্ময় রায়ের মতে, “সংগীত মানুষের মনের ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারে। তাই রোগীদের সঙ্গেও সুর, সংগীত নিয়ে আলোচনা করি।”

আর করোনার সময় তো ডাঃ সুমন মিত্রকে গানই স্বস্তি দিয়েছিল। অগুনতি রোগী, পিপিই কিট আর মৃত্যুভয় যে চেনা পৃথিবীকে প্রতি মুহূর্তে অচেনা করেছিল, সংগীত সেই চেনা পৃথিবীর শেষতম প্রতিনিধি ছিল। তাই সংগীত তাঁর আশ্রয়। সে আশ্রয় তো আমাদেরও। তাই ডাক্তার রোগীর সমীকরণ পাল্টে যায় গানের মাধ্যমে। ডাঃ সুমন মিত্র বলেন, “আমাকে আমার অনেক রোগীর সঙ্গে গান গাইতেও দেখা গেছে। এমনকি চেম্বারে বসেও তাঁদের সঙ্গে গান গেয়েছি। এখন ৮০ শতাংশ রোগীই জানেন যে আমি গান গাই। তাই, যখন শুনি পেশেন্ট গানের জগতের। তখন বলি, আগে দু’কলি গান শোনান দেখি, তারপর রোগের কথা শুনব। গান মনের মেলবন্ধন ঘটাতে সাহায্য করে তো বটেই!”

 

করোনার বিভীষিকা এখনও আমাদের মনে দাগ রেখে গেছে। লকডাউন পরিস্থিতির অশান্তি কাটাতে মিউজিক থেরাপিস্টের সদস্যরা তৈরি করেছিলেন করোনা সংগীত। এখন বছরে ১২-১৩টা অনুষ্ঠান করেন তাঁরা। লক্ষ্য বা উপলক্ষ কেবল ভালোবেসে গান করা। গানের ব্যাপারেও এই ডাক্তাররা অবশ্য সিরিয়াস। নিজেদের গান মানোত্তীর্ণ করতে তাঁরা তৎপর। তাই নিয়মিত ডাঃ অভীক ভট্টাচার্যের ক্লিনিকে মহড়ায় হাজির হন সকলে। রোগীদের নজরে পড়ে, বাদ্যযন্ত্র হাতে পেশাদার ডাক্তাররা জড়ো হয়েছেন। এই সিরিয়াস চিকিৎসকরা সুরের পিয়াসী, গান ভালোবেসে গান।

Developed by DXDasia