ব্যতিক্রমী চেহারা-চরিত্র-স্বাদ যুক্ত মুর্শিদাবাদের প্রসিদ্ধ ‘ঝুড়ি দই’

স্বাদ ও গুণগত মানের দিক থেকে এই দইকে অনেকেই ‘শ্রেষ্ঠ’ মনে করেন

বাঙালির বড়ো প্রিয় মাছে আর ভাতে/ ভালো হয় শেষে যদি দই পড়ে পাতে/ একবার রসনায় যে পেয়েছে তার/ আর কিছু মুখে নাহি ভালো লাগে তাঁর/ যে কখনো এইসব করেনি গ্রহণ/ বৃথাই জীবন তার, বৃথাই যাপন।।

বাংলাদেশের কবি, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার বজলুল করিম বাহারের এই ছড়া বঙ্গজীবনে ঠিক কতটা বাস্তব, তা অন্তত বাঙালিদের আলাদা করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাঙালি সমাজে দুগ্ধজাত নানা ধরনের খাবারের মধ্যে গুণেমানে দই অন্যতম প্রধান খাদ্য হিসেবে আজও বিবেচনা করা হয়। এলাহি ভোজন সেরে এখনও বাঙালির মনটা ‘দই দই’ করে ওঠে। কারো মন ভেজে ধবধবে স্নিগ্ধ টক-এ, আবার কারো কাছে দই মানেই গাঢ় ঘিয়ে রঙা ‘মিষ্টি দই’। এই বঙ্গদেশে অঞ্চলভেদে দইয়ের চেহারা-চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন। স্বাদে-মানে ও অনন্যতায় ‘বগুড়ার দই’–এর খ্যাতি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে একথা যেমন ঠিক, অনেকেই জানেন না, ব্যতিক্রমী ঘরানার মুর্শিদাবাদের প্রসিদ্ধ ‘ঝুড়ি দই’-এর কথা।

মাটির ভাঁড় বা হাঁড়ি নয়, এখানে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো ঝুড়িতেই পাতা হয় দই। কিন্তু ঝুড়িতে তো ফাঁক থাকে, তাতে দই পাতা সম্ভব? মুর্শিদাবাদ দৌলতাবাদের হরিশপুর অঞ্চল, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমের সীমান্তের কাছে রঘুনাথগঞ্জের ঝুড়ি দই বাংলায় প্রসিদ্ধ। স্বাদ ও গুণগত মানের দিক থেকে এই দইকে অনেকেই ‘শ্রেষ্ঠ’ মনে করেন। এই দইয়ের বৈশিষ্ট্য হল, বাঁশের কঞ্চির ছোটো ঝুড়ির গায়ে দইয়ের শক্ত সাজা বা ক্ষীরের প্রলেপ মাখিয়ে দিয়ে ছিদ্রগুলি বন্ধ করে সেই ঝুড়িতে পাতা হয় দই। এই দইয়ের উপরে পুরু ঘিয়ে রঙের আস্তরণ থাকে, তা সরিয়ে ফেললেই মিলবে সাদা রঙের দই। স্বাদে অম্লমধুর। খেতে অতুলনীয়। আর এই ব্যতিক্রমী স্বাদের জন্যই মানুষের মুখে ফেরে মুর্শিদাবাদের ঝুড়ি দই।

হরিশপুরের দই ব্যবসায়ী গৌতম ঘোষ বংশ পরম্পরায় দই বিক্রি করে আসছেন, তাঁর বাবা দই বানিয়ে সোনার মেডেল পেয়েছিলেন। “আমাদের প্রায় দুশো বছরের ব্যবসা। ১৯৫৩-৫৪ সালে বিধানচন্দ্র রায় যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, দই খেয়ে আমার বাবাকে পুরস্কৃত করেছিলেন। ঝুড়ি দই ছাড়া টক দই, মিষ্টি দই, অন্যান্য চাঁচি, পনীর, ঘি এসবও পাওয়া যায়। চাহিদাও বেশ ভালো।” বলেন গৌতমবাবু।

ইতিহাস বলছে, একসময় এখানে ক্ষীরের দই পাতা হতো। একটু মোটা হওয়ায় এই দই ঝুড়িতে বা ঝুড়ির পাত্রে রাখলেও তা বেরিয়ে আসত না। এমনকি, দই তৈরি এমনভাবে করা হতো, যাতে ঘনত্ব বাড়ানো যায়। কারিগররা এই দইয়ের রেসিপি ফাঁস করেন না। তবে বিগত কয়েক বছরে দইয়ের দাম কেজি প্রতি অনেকটাই বেড়েছে। রঘুনাথগঞ্জের দই ব্যবসায়ী সুবীর ঘোষ বলেন, ‘‘দুধের দাম তো একটা বড়ো কারণ। তার পাশাপাশি চিনি ও আনুষঙ্গিক জিনিসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ঝুড়ি দইয়ের দামের উপর।’’

বর্তমানে কলকাতায় বিভিন্ন ছোটো-বড়ো মিষ্টি ব্যবসায়ীরা ঝুড়ি দই বিক্রি করছেন। খেতে মন্দ নয়। তবে, দুধের স্বাদ ঘোলে মিটবে কী করে? যাঁরা এখনও এ স্বাদের ভাগ পাননি, মুর্শিদাবাদ গেলে চেখে দেখতে ভুলবেন না যেন!  

তথ্যসূত্রঃ

আনন্দবাজার পত্রিকা

বর্তমান

Imagin CTV

প্রথম আলো

Developed by DXDasia