
মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি – পর্ব ৪
গত পর্বে
দিন যায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের থাবার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। হাড় ভাঙা বুলেটের শব্দ জ্যোৎস্নার আলোকে ব্ল্যাক আউট করতে পারে না। পারে না বেয়নেট কাশফুলের এপাশ ওপাশ সোহাগ বন্ধ করতে।
কিন্তু তারা অনেক কিছু করতে পারে। তারা ওয়ারেন্ট বার করতে পারে, পারে বডি ওয়ারেন্ট বার করতে৷ করলোও। মণিদার নামে বডি ওয়ারেন্ট বেরলো। কো-ইন্সিডেন্স, কাকতালীয় কোন বিশেষণে বোঝাব জানি না, সত্যি বলছি মাইরি। স্বপ্নাদের বাড়ির সামনে দেখা হল আমার মণিদার সঙ্গে। ও গলিতে মধ্যগগনেও সূর্যের আলো ঢোকে না, যেখানে মণিদার সঙ্গে আমার দেখা হল বেলা ৩টের সময়। ঠিক পাঁচ মিনিটের বাক্যালাপে স্থির হল যে, তক্ষুনি মণিদা আর আমি সুন্দরবন যাব প্রায় লুকিয়ে। আমরা পৌঁছালাম গোসাবা। অন দ্য ওয়ে শুনলাম ওর নামে বডি ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে। ও গা ঢাকা দিতে চায়, কিন্তু দলের কারো সঙ্গে নয়— এ কথাটা তখন বুঝিনি। অনেক অনেক পরে আলিপুর জেলে দেখা করার সময় অর্থটা জেনেছিলাম।
পর্ব ৪
নামেই গোসাবা। আমরা যে অঞ্চলটায় পৌঁছালাম সেটা গোসাবার একেবারে প্রান্তিক জায়গা। একদম নদীর ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে চার-পাঁচটা মাটির বাড়ি বা ঘর। ধু-ধু ফাঁকা মাঠ। একের পর এক প্রায় গোটা পঁচিশেক জাল মাটিতে ছড়ানো আছে। ঘাটে দুই-তিনটে নৌকা বাঁধা। আমাদের যে লোকটা ওই ঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দিল, সে আমাদের দু-তিন জনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। নদীর পাশ ঘেঁষে একদিকটায় ভর্তি কাশ ফুল, ফুলের বাগান, জঙ্গল। জ্যোৎস্না রাত ছিল।
আরও পড়ুন: “প্রেমে ফিদা হলাম বিটলস শুনে”
খোকাদা আমাদের একটা বাড়ির উঠোনে নিয়ে গিয়ে বসালো। সেখানে একটা খাটিয়া। খোকাদার কথা অনুযায়ী একটু পরেই খাবার (ডিনার) দিয়ে যাবে। একটা মাদুর দিল শোবার জন্য। ও ঘরে চলে গেল। খোকাদা আর তার দলবল ভোর ৩টের সময় বেরিয়ে পড়বে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে। আমাদের নৈশভোজ এল। কী খাবার? দু-বাটি (বড়ো) জলে গোলা আটা আর আমরা শহুরে শিক্ষিত বাবু অতিথি, তাই সঙ্গে দুটো কাঁচালঙ্কা। আমরা খেলাম। আজও ভুলিনি। আজও অবাক হই। সবচেয়ে অবাক হই আমাদের শহর থেকে আন্দাজ দু-আড়াইশো কিলোমিটার দূরে মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে। হয়তো স্বপ্নও দ্যাখে। রাতে মণিদার পেট ব্যথা শুরু হল। লুজ মোশন। পাচ-ছ’বার মাঠে গেল। কিন্তু পেটের ব্যথাটা কমছিল না।

সকাল হতেই আমরা রওনা হলাম। ওই একইভাবে কলকাতা ফিরলাম। নৌকায় মনটা তোলপাড় করছিল – আমি তো বাড়ি ফিরেই আমার ভালোলাগার খাবার খাব, সিসিআর কিংবা বিটলস্ শুনব, কবিতা লিখব, পড়ব ‘ফার ফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউড’ অথবা ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’। ফেরার সময় মণিদা যখন একটু সুস্থ বোধ করছিল, বললাম দ্যাখো, মানুষের এত কষ্ট, এত লড়াই করে বেঁচে থাকা এসবের যেমন আমি প্রত্যক্ষদর্শী, ঠিক তেমনই নদীর ধারে জ্যোৎস্নার নীল আলোয় কাশফুলের লুটোপুটি, একে অন্যের গায়ে গা লাগিয়ে আদর করার এমন দৃশ্যও তো ভুলব না হয়তো কোনোদিন। “বাড়ি গিয়ে পদ্য লিখে ফ্যাল” – আপাতভাবে মনে হতে পারে ব্যঙ্গ করে বললো, কিন্তু আমি জানি মণিদা ওটা মন থেকেই বলেছিল। মণিদার পাল্স খুব ভালোভাবেই জানতাম। (১৯৭৫ সালের শেষের দিকে মণিদাকে ‘ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে’ গানের সম্পূর্ণ কথাগুলো দেখিয়েছিলাম)। ফিরে এসে আমি চলে গেলাম আমার বাড়িতে। মণিদা গেল পর্ণশ্রী, রতিদা-দের ঠেকে। সে জায়গাটাও গোপন ডেরা।

এরপর বেশ অনেকদিন মণিদার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়নি, তবে খবর পেতাম। যেদিন মধ্যরাতে মণিদা (সঙ্গে আরও তিনজন) বুড়ো পাঁচতলার টেরাস ঠেকে ঝাঁপ দিয়েছিল বাগানের গাছের কোপে, অ্যারেস্টেড হল তার আগের দিন সন্ধেবেলায়। প্রদীপদা (চক্রবর্তী) আমায় বলেছিল রাতে ওরা কোথায় থাকবে। এরপর কিছুদিন কেউ কোনও খবর পায়নি ঠিক কোথায় কোন জেলে ও আছে। একদিন মাসিমাকে (মণিদার মা) একা পেয়ে বিনয়ের সুরে জানতে চাই ওর খবর। তারপর দেখা করতে যাই নির্দিষ্ট দিনে। বেশ কয়েকবার দেখা হবার পর একদিন বলল, “একটা গান ভেবেছি। ‘কথা দিয়া বন্ধু ফিরা না আইলা…’”। অনেক পরে ১৯৭৫ সালে যখন ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ তৈরি হয়, তখন (এখনও) গানটা আমরা গাইতাম।
(চলবে…)
