
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ১২
হাসিমুখো বিক্রমের সে কী উৎসাহ! কিছুটা ভয়ও। কিছুক্ষণ পরেই তিনি এ ঘর-ও ঘর ঘুরছেন। দেওয়ালের দিকে তাকাচ্ছেন। আসলে ওই যে পাঁচ মিনিট। কিন্তু ঘড়ি কোথায়? সময়টা বুঝবেন কীভাবে? তারপর শুরু হল সারা ঘরময় ঘড়ি খোঁজা। সেই কাণ্ড দেখে সবার কী হাসি! বন্ধুমহলের প্রত্যেকেই কেউ কোনোদিন বিক্রমকে ঘড়ি পরতে দেখেননি। আসলে সময়ের কাছে জীবনকে সঁপে দেওয়া বিক্রমের ছিল না পসন্দ। কিন্তু কী আশ্চর্য! সময়কে তুড়ি মেরে কাউকে কষ্ট না দিয়ে অসময়ে চলে গেলেন তিনি। বিক্রমের যে আসলে কী রোগ ছিল, তা কোনও ডাক্তারই ধরতে পারেননি সে সময়। হাজার চেষ্টা করেও তাঁকে আর বাঁচানো যায়নি।
(গত পর্বের পর)
মোহন সিং খাঙ্গুরা অথবা মোহন সিং। আমরা কমবেশি অনেকেই তাঁকে মোহন সিং হিসেবেই চিনি। এক্ষেত্রে আশ্চর্যরকমভাবে ‘খাঙ্গুরা’ বাদ গেছে অজান্তেই। বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিক্ষক ছিলেন তিনি। নিজেও একজন উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী। কিন্তু বাঙালি শ্রোতাদের কাছে মোহন সিং একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হয়েই রয়ে গেলেন। লুধিয়ানার ভূমিপুত্রের ‘খাঙ্গুরা’ পদবি শ্রোতাদের কাছে ধর্তব্য নয় বহুদিনই। তাঁর গায়কি, তাঁর নিজস্বতা, তাঁর উদাত্ত গলার উচ্চারণ ও তন্ময়তায় মোহন সিংয়ের রবীন্দ্রসংগীতে বাঙালি শ্রোতা অন্তত ২৫-২৬ বছর ধরে মুগ্ধ।
রবীন্দ্রনাথের গানের প্রসঙ্গ যখন এলই, মোহন সিং-এর কণ্ঠে তখন অনায়াসে চলে আসবে 'কে দিল আবার আঘাত আমার দুয়ারে/ এ নিশীথকালে কে আসি দাঁড়ালে, খুঁজিতে আসিলে কাহারে' — রবীন্দ্রনাথ কাহারবা তালে এবং কেদারা রাগে এই গানটি লিখেছিলেন আনুমানিক ১৮৯৫ সালে। বহুশ্রুত এই গানের গভীরতা লেখার আলোচ্য বিষয় নয়। মোহন সিং-এর আগেও এই আচ্ছন্ন করা গান আমরা শুনে থাকব দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, পৃথ্বীশ দাশগুপ্ত, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পীর কণ্ঠে। কিন্তু প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, মোহন সিং-এর গায়কিতে এই গান অন্য মেজাজে উত্তীর্ণ হয়েছে।
কিন্তু বাঙালি শ্রোতাদের কাছে মোহন সিং আর উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পী রইলেন না, সম্পূর্ণভাবে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হয়ে গেলেন। কিন্তু কেন? মোহন সিং এ প্রসঙ্গে নিজেই বলছেন, আসলে তাঁর সাবজেক্টটাই বাঙালি শ্রোতারা পাল্টে দিয়েছেন। অথচ তিনি ক্লাসিক্যাল গান, খেয়াল গান, ধ্রুপদ গান। গত দু-তিন বছরের মধ্যে তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের বেশ কয়েকটি ভালো অনুষ্ঠানও করেছেন। রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারে (গোলপার্ক, কলকাতা) উচ্চাঙ্গ সংগীতের অনুষ্ঠান করেছেন। উত্তর কলকাতায় স্বামী বিবেকানন্দের নিজের বাড়িতে অনুষ্ঠান করেছেন। সেখানে হয়েছে এক মজার অথচ রোমহষর্ক বিষয়। স্বামীজির দাদুর খাটে মোহন সিংকে বসতে দেওয়া হয়েছিল। সে এক আশ্চর্য অনুভূতি তাঁর। অদ্ভুত একটা ভাব যেন তৈরি হয়ে উঠল। সেদিন খুব আনন্দ পেয়েছিলেন গেয়ে। গাইলেন খেয়াল, ধ্রুপদ।
মোহন সিং-এর মতে, বাঙালি শ্রোতারা ছাপ মারতেই বেশি ভালোবাসেন। ছাপ না মারলে যেন তাঁদের মনের আশ মেটে না। এটা সমস্ত শিল্প মাধ্যমের ক্ষেত্রেই সত্যি। বাউল যেমন, তেমনি খেয়ালিয়া যে, সে খেয়ালিয়া। তেমনি রবীন্দ্রসংগীতকেও তাঁরা একটা ধারায় বেঁধে ফেলেছেন। মোহন হয়ে গেলেন রবীন্দ্রসংগীত গাইয়ে। শাস্ত্রীয় সংগীতের গাইয়েটা তাঁদের কাছে চাপা পড়ে গেল।
আরও একটা বিষয় হল, শাস্ত্রীয় সংগীতের চেয়ে রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান অনেক বেশি হয়। যার জন্য শ্রোতারা মোহন সিংকে বেশি রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে দেখেছেন। মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন রাবীন্দ্রিক।
কিন্তু এসব বললে কী করে হবে! মোহন সিং কি রাবীন্দ্রিক নন? অবশ্যই রাবীন্দ্রিক। রাবীন্দ্রিক তিনি প্রথম থেকেই। রবীন্দ্রনাথের গান তাঁকে বোধ দিয়েছিল। জীবনের শুরুর পর্যায়ে শান্তিদেব ঘোষের মতো মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। তবে এ-ও ঠিক, প্রথম থেকেই মোহন খেয়াল গান, ধ্রুপদ গান। তিনি রবীন্দ্রসংগীত কখনও কাউকে শেখান না। তবু শ্রোতারা তাঁকে শুধুমাত্র রবীন্দ্রসংগীতের গাইয়ের ছাপই দিয়ে দিয়েছেন।
(চলবে…)
*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
