শান্তিনিকেতনের জ্যোৎস্না রাতে সেদিন মোহনের মুখোমুখি রামকিঙ্কর বেইজ এবং ঋত্বিক ঘটক

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ৫

“যোশীদাকে মোহন বললেন, আপনি বাগেশ্রীর একটা নতুন বন্দিশ তৈরি করুন।
– ঠিক হ্যায়। কাল এসো। আমি বন্দিশ তৈরি করে রাখব। 
এমনই একজন উদার মানুষ ছিলেন ধ্রুবতারা যোশী। কনস্টিপেশেনের রোগী ছিলেন। একদিন সকালে অনেকক্ষণ পর বেরোলেন বাথরুম থেকে। মোহন জিজ্ঞাসা করলেন, কী গো যোশীদা, হল?
– নারে হল না, শুধুই বাঁশি শুনলাম। 
এমনই রসিক মানুষ ছিলেন ধ্রুবতারা যোশী। গুরু-শিষ্যের সম্পর্কও ছিল দেখার মতো।”

(গত পর্বের পর)

মোহন সিং খাঙ্গুরার শান্তিনিকেতনে যাওয়ার ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে অনায়াসে চলে আসবেন বলরাজ সাহানি। পাঠভবনের ছাত্র পড়ানোর কারণে বলরাজ সাহানি কিছুদিন বিশ্বভারতীতে ছিলেন। মোহনের পিসতুতো দাদা হরওয়ান্ত সিং সেখু ছিলেন বলরাজের বন্ধু। একই গ্রামে জন্ম এবং বিদেশেও তাঁরা একইসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। ফলে, বলরাজের সঙ্গে মোহন সিংদের বাড়ির একধরনের চেনাশোনা ছিল। সেই সূত্রে শান্তিনিকেতনের কথাও শুনেছিলেন মোহন। কিন্তু, শান্তিনিকেতনে যোগাযোগের প্রধান উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁর ছোড়দা। তিনি ছিলেন পুলিশ অফিসার। তাঁর এক চেনা এনসিসির সুবেদার সেই সময় শান্তিনিকেতনে ছিলেন। ছোড়দা তাঁকে ফোন করে জানান যে মোহন গান শিখতে চান, কিন্তু পোলিওর কারণে তিনি কোনো উস্তাদের বাড়িতে থেকে তালিম নিতে বা তাঁর সেবাযত্ন করতে অক্ষম। এতএব, এমন কোনো ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন, যেখানে মোহন সিং পড়তে যেতে পারেন। সুবেদার ছোড়দার কাছে শান্তিনিকেতনের ভীষণ প্রশংসা করলেন। বললেন, দারুণ জায়গা, বড়ো বড়ো উস্তাদ আছেন গান শেখাবার, কত গুণীজনদের আনাগোনা। এটা শুনেই মোহন সেই সময়ে সংগীত ভবনের প্রিন্সিপাল শান্তিদা-কে চিঠি লেখা মনঃস্থির করেন। সেই চিঠির কথা উল্লেখ করা আছে প্রথম পর্বেই।

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। এক্সক্লুসিভ বঙ্গদর্শনে।

ঋত্বিক ঘটক মুচকি হাসলেন

রনধীর রায় অর্থাৎ টুকু ছিলেন মোহন সিং-এর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। শান্তিনিকেতনের রাস্তাঘাট, গাছপালা, জন্তু-জানোয়ার আর বিশ্ব থেকে আসা মানুষকে তখন আবিষ্কার করতে শুরু করছেন মোহন, টুকুর হাত ধরে। যদিও মোহন আর টুকুর বন্ধুত্ব শান্তিনিকেতনের গণ্ডীতেই কেবল সীমাবদ্ধ ছিল না। তা ছিল বিস্তৃত মাঠ পার করে এক অসীম আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া। এই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না। টুকু মোহনকে একটিবারের জন্যও বুঝতে দেননি, তাঁর পোলিও। তিনি তো অন্য সকল মানুষের মতো উড়ে যেতে পারেন না। বরং টুকু মোহনকে শেখাচ্ছেন, সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উড়ে যাওয়া জীবনের একমাত্র সম্বল। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে আর কীই বা আছে উড়ে যাওয়া ছাড়া! আর আছে গান, সুর, প্রেম, বাংলা ভাষা, উস্তাদ আর রবীন্দ্রনাথ।

টুকুর সঙ্গে এক জোৎস্না রাতে ক্যানালের ধারে বসে আছেন মোহন সিং। হঠাৎ দেখলেন, সোনাঝুরির শালবনের ভিতর থেকে দু’জন মানুষ হেঁটে আসছেন তাঁদের দিকে। কিন্তু এই গভীর রাতের মৃদু আলোয় ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না তাঁদের মুখ। কারা তাঁরা? সামনে আসতেই দেখা গেল, তাঁদের একজন রামকিকঙ্কর বেইজ আর অন্যজন ঋত্বিক ঘটক। রামকিঙ্কর বেইজ মোহনের দিকে ইঙ্গিত করে ঋত্বিক ঘটককে বললেন, “এই ছেলেটা দারুণ গান গায় জানো! আমি ওর রেওয়াজ শুনতে সকালে সংগীত ভবনে যাই।” ঋত্বিক ঘটক সেদিন মুচকি হেসেছিলেন শুধু। এই মুচকি হাসার সাক্ষী ছিল জ্যোৎস্না মাখা চাঁদ আর রবীন্দ্রনাথ। ঋত্বিক আর মোহনের ভিতর হয়তো তখন একটাই গান অনুরণিত হচ্ছে – “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে/ বসন্তের এই মাতাল সমীরণে”।

রামকিঙ্কর বেইজ একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। একবার ঠিক করলেন গাছ লাগাবেন, তবে তার আগে মোহনকে গুরু নানকের একটা ভজন গাইতে হবে। এহেন জরুরি তলবে মোহনকে ক্যান্টিন থেকে ছুটে আসতে হল। আরো কত মজার সব স্মৃতি ‘কিঙ্করদা’র সঙ্গে।

(চলবে…)

*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত।

Developed by DXDasia