
মায়া আর্ট স্পেস-এর ৯তম ‘পুজো শিল্প’
প্রথমে দুর্গাপুজোর উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র মাতৃশক্তির আরাধনা। কিন্তু, ক্রমে তা শিল্প এবং শিল্প থেকে একাধিক সম্ভাবনার রাস্তা খুলে দিয়েছে। দুর্গাপুজো আসা-যাওয়ার মাঝে ও আগে-পরে কতকিছু থাকে যা সাধারণ দর্শনার্থীদের জানার উপায় থাকে না। ইউনেস্কোর হেরিটেজ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাঙালির দুর্গাপুজো, এর নেপথ্যে রয়েছেন বিশেষ কিছু মানুষ, যাঁরা আমাদের নাগালের বাইরে থেকে সারা বছর ধরেই নিমগ্ন থাকেন দুর্গাপুজোকে শিল্পে উত্তীর্ণ করার প্রয়াসে। সেই প্রয়াসের নেপথ্য কাহিনিই দুর্গাপুজো পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়ের আবহে প্রতি বছর ডকুমেন্ট করা হয় ‘মায়া আর্ট স্পেস’ (Maya Art Space)-এর উদ্যোগে। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি। চার দেওয়ালের মধ্যে না থেকে, গতবছরের মতো এবারও মোহরকুঞ্জের মুক্তাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হল ৯তম ‘পুজো শিল্প ২০২৩’ (Pujo Shilpo 2023)।
এ বছর আড্ডায় আমন্ত্রিত ছিলেন শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত, শিল্পী সুশান্ত পাল, শিল্পী ভবতোষ সুতার, শিল্পী অনির্বাণ দাস, শিল্পী ও পুজো-বিচারক সমীন্দ্রনাথ মজুমদার, পুজো সংগঠক প্রতীক চৌধুরী ও অরিজিৎ মৈত্র, সাংবাদিক ও পুজো-গবেষক সুদেষ্ণা ব্যানার্জী, পুজো-দর্শক শ্রীময়ী গুহ রায়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন উৎসব-পরামর্শদাতা ধ্রুবজ্যোতি বসু (শুভ)। মায়া’র পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের অয়োজক ছিলেন মধুছন্দা সেন। দুর্গাপুজোকে ঘিরে শিল্প, হেরিটেজ স্বীকৃতি সবই হল, এবার? দুর্গাপুজোর পরবর্তী পদক্ষেপ বা এখনও কী কী সম্ভাবনা রয়েছে? মায়া’র ‘পুজো শিল্প ২০২৩’ আড্ডার ভাবনা ছিল এটাই।

দুর্গাপুজো শিল্প কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না কখনই। এটা সমবেত একটা প্রয়াস। শিল্পী, সংগঠক, স্পনসর, রাজ্য সরকার, মিডিয়া, জনসাধারণ – সারা বিশ্বে দুর্গাপুজোকে শিল্পে উত্তরণের নেপথ্যে রয়েছে মূলত এই ক’টি স্তম্ভ। একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করেই সঞ্চালক এদিন আড্ডা’র সূত্রপাত করেন।
দুর্গাপুজো শিল্প কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না কখনই। এটা সমবেত একটা প্রয়াস। শিল্পী, সংগঠক, স্পনসর, রাজ্য সরকার, মিডিয়া, জনসাধারণ – সারা বিশ্বে দুর্গাপুজোকে শিল্পে উত্তরণের নেপথ্যে রয়েছে মূলত এই ক’টি স্তম্ভ। একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করেই সঞ্চালক এদিন আড্ডা’র সূত্রপাত করেন। তাঁর কথায়, পশ্চিমবঙ্গের জিডিপি এই মুহূর্তে ১৭.১৩ ট্রিলিয়ন রুপিস। তার মধ্যে শুধুমাত্র দুর্গাপুজোর ভাগ হচ্ছে প্রায় ৮০০০০কোটি টাকা, শতাংশের হিসেবে যা ৪.6%। ধ্রুবজ্যোতি’র কথায়, আগামী দশ বছরে যদি হিসেবটা ১০-১২ শতাংশে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটাই হবে দুর্গাপুজোর সব থেকে বড়ো সাফল্য।
এত গেল বাণিজ্যিক দিক। দুর্গাপুজোর পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে শিল্পীরা কী ভাবছেন? শুরু থেকে ঠাকুরপুকুর স্টেট ব্যাঙ্ক পার্ক সার্বজনীন সৃজনে তিনি জনপ্রিয়, আর এ বছর পূর্বাচল শক্তি সংঘের ‘সর্বজনের দুর্গাপুজো’ ছিল জনসাধারণ থেকে বিচারক সবার কাছেই ‘সেরার সেরা’। তিনি শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত। তাঁর কথায়, শহরে দুর্গাপুজো মানেই সেই সনাতন দিন্দা, ভবতোষ সুতার, সুশান্ত পাল, প্রদীপ দাস… এই কয়েকটা নামের বাইরে এখনো বেরোতে পারিনি আমরা অথচ, রাজ্যে ৪টে সরকারি আর্ট কলেজ আছে। এত ছেলেমেয়েরা সেখান থেকে পাশ করে বেরোচ্ছেন। তাঁরা কেন সুযোগ পাবেন না? এই বিষয়টা নিয়েও আগামী দিনে ভাবতে হবে।
শিল্পী ভবতোষ সুতারের বক্তব্যে উঠে আসে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। এই যে মাসের পর মাস খেটে দুর্গাপুজোকে শিল্পে পরিণত করা হয়, তা কতজন ধীরে-সুস্থে উপভোগ করতে পারেন? দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে মণ্ডপে মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকরা মুহূর্মুহূ বাঁশি বাজাতে থাকেন, যা একটা সময় শব্দ দূষণের পর্যায়ে পৌঁছায় তো বটেই পুজোর আবহকেও নষ্ট করে। পুজোর ‘থিম সং’ বা আবহ সংগীত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। বারংবার বাঁশি বাজানোর ফলে মানুষের মনসংযোগে ব্যঘাত ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে আবহ সংগীতশিল্পীদের কাজের প্রতিও অসম্মান প্রদর্শন করা হয়। ভবতোষের কথায়, এমনটা হোক তিনি চান না কিন্তু এর বিকল্প ব্যবস্থাও কিছু করা যায়নি। তিনি ব্যক্তিগত ভাবে ভিড় অপছন্দ করেন বলেই শহর থেকে বেরিয়ে পুজোর কাজ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। এছাড়াও, পুজো মণ্ডপের আশেপাশে যথেষ্ট সংখ্যায় টয়লেটের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর করা পুজোয় নিজ উদ্যোগে এই ব্যবস্থা করেছেন বলেও জানান তিনি।
এরকমই আরও কিছু মূল্যবান আলোচনা উঠে আসে শিল্পী সুশান্ত পাল, শিল্পী অনির্বাণ দাস, শিল্পী ও পুজো-বিচারক সমীন্দ্রনাথ মজুমদার, পুজো সংগঠক প্রতীক চৌধুরী ও অরিজিৎ মৈত্র, সাংবাদিক ও পুজো-গবেষক সুদেষ্ণা ব্যানার্জী, পুজো-দর্শক শ্রীময়ী গুহ রায়ের বক্তব্যে। সব মিলিয়ে প্রারম্ভিক শীতের সন্ধ্যায় এই পর্যালোচনা ‘দুর্গাপুজো শিল্প – পরবর্তী পদক্ষেপ’ (Durga Pujo Art – What Next)-র দিকটি নতুন করে নতুন নতুন সম্ভাবনার পথ প্রশস্ত করলো, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
