দুর্গাপুজো – শিল্প – সম্ভাবনা : মায়া আর্ট স্পেসের উদ্যোগে শহরে বর্ণাঢ্য আলোচনা

আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন ইতিহাসবিদ তথা শিল্প-ইতিহাসবেত্তা তপতী গুহঠাকুরতা

ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে উমা আসেন আর চলে যান, এই আসা-যাওয়ার মাঝে ও আগে-পরে কতকিছু থাকে যা সাধারণ দর্শনার্থীদের জানার উপায় থাকে না। আমাদের নাগালের বাইরে থেকে সারা বছর ধরেই বিশেষ কিছু মানুষ নিমগ্ন থাকেন দুর্গাপুজোকে শিল্পে উত্তীর্ণ করার প্রয়াসে। সেই প্রয়াসের নেপথ্য কাহিনিই দুর্গাপুজো পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়ের আবহে প্রতি বছর ডকুমেন্ট করা হয় ‘মায়া আর্ট স্পেস’(Maya Art Space)-এর উদ্যোগে। ২০২০ সালে কোভিডের কারণে অনলাইনে হলেও ২০২১-এর ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল সপ্তম বর্ষের ‘পুজো শিল্প’ আড্ডা এবং এই বছরও তার অন্যথা হয়নি। তবে, ২০২২-এর ‘পুজো শিল্প’ পর্যালোচনা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বিশেষ ছিল কারণ এবছরই ইউনেস্কোর হেরিটেজ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাঙালির দুর্গাপুজো। আর বিশ্বজনীন এই স্বীকৃতিকে মাথায় রেখেই এবারের পুজো শিল্প আড্ডা-আলোচনার পরিবেশ-পরিসর ছিল ভিন্ন।

চার দেওয়ালের মধ্যে না থেকে ‘পুজো শিল্প ২০২২’ (Pujo Shilpo 2022) অনুষ্ঠিত হল মোহরকুঞ্জের মুক্তাঙ্গনে। আলোচনায় আমন্ত্রিত ছিলেন ইতিহাসবিদ তথা শিল্প-ইতিহাসবেত্তা তপতী গুহঠাকুরতা, ব্রিটিশ কাউন্সিল (পূর্ব ও উত্তরপূর্ব ভারতের)-এর অধিকর্তা দেবাঞ্জন চক্রবর্তী, গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট-এর অধ্যক্ষ ছত্রপতি দত্ত, শিল্পী বিমল কুণ্ডু, শিল্পী সুশান্ত পাল, পুজো-সংগঠক শাশ্বত বসু, উৎসব আয়োজক-তত্ত্বাবধায়ক-পরামর্শদাতা ধ্রুবজ্যোতি বসু (শুভ)। সমগ্র আলোচনাটি পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ঋজু বসু। মায়া’র পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের অয়োজক ছিলেন মধুছন্দা সেন।  

পুজোয় কোথায় কী কাজ হচ্ছে তার পুঙ্খনাপুঙ্খ খবর রাখেন গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট-এর অধ্যক্ষ ছত্রপতি দত্ত। আলোচনা পর্ব শুরু হয় তাঁর বক্তব্যের মাধ্যেমেই। আজকের দুর্গাপুজো-শিল্পের চেহারাটা ঠিক কেমন, দুর্গাপুজোয় আর্ট কলেজের শিল্পীদের ভূমিকা এবং পেশা হিসেবে সম্ভাবনার দিকটি নিয়ে তিনি বলেন, “পুজো শিল্প দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, একটা হল Durga Pujo Art এবং Durga Pujo Industries. দুটোই শিল্প এবং বর্তমান সময়ে দুটোরই সমান গুরুত্ব রয়েছে। রয়েছে বলেই হয়তো আমরা এই আলোচনায় যুক্ত হতে পারছি। সুতরাং শিল্প অর্থে শুধু ‘আর্ট’ হিসেবে দেখলে আমরা হয়তো এর একটা মূল জায়গা হারিয়ে ফেলব এবং হয়তো সেই সূত্রেই আর্ট কলেজ দু’ভাবেই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।”

“আমরা যখন ছাত্র, অর্থাৎ আশির দশকে প্রথম আমরা দেখেছি এই ধরণের কাজ শুরু হচ্ছ এবং তখন থেকে শুরু হল শুধু ঠাকুর দেখতে যাওয়া নয়, কিছু পাওয়াও – একটা ‘অ্যামবিয়েন্স’। স্পেস। পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর আর্ট কলেজ আছে, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে পুজো শিল্প এখনও অনেকটাই কলকাতা-কেন্দ্রিক। যেখানে শিল্প একটা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে যুক্ত হচ্ছে, এই ঘটনাটা অনেকাংশেই ঘটছে কিন্তু আর্ট কলেজের ছেলেমেয়েদের হাত ধরে। কিছু নতুন বিষয় তাদের কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যেসব শিল্পীরা অন্য সময় নিজের কোনও একটি কাজ অর্থনৈতিক কারণ বা জায়গার অভাবে করতে পারেন না, তাঁরা পুজোর কাজের মাধ্যমে তা পূরণ করে নিচ্ছেন। একজন শিল্পী তাঁর বিভিন্ন সম্ভাবনাগুলোকে ব্যক্ত করতে পারছে এই পুজো-শিল্পের হাত ধরেই। কিন্তু চারুকলা শিল্প মাধ্যমে এই এত বড়ো স্পেসটা কি কোনওদিন তৈরি হবে না?” এই প্রশ্ন দিয়েই নিজের বক্তব্য শেষ করেন ছত্রপতিবাবু।

পুজো আর্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি –দুটোই। কিন্তু এই যে এত কাজ, এত কিছু এসবই তো বিসর্জন দিয়ে দেওয়ার জন্য, পুজোর এই কাজগুলো, এই যে চলমান ইতিহাস এগুলো কি সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই? বিসর্জন হওয়ার পরেও পুজো কি একটা গবেষণা বা চর্চার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, কীভাবে আকাডেমিক দুনিয়ায় পুজো নিয়ে গবেষণা আগ্রহ বাড়াতে পারে? তপতী গুহঠাকুরতা বলেন, “আমি যখন এই বিষয়ে গবেষণা শুরু করি, আমার কাছেও এটা একটা বড়ো প্রশ্ন ছিল। আমি বহু বছর ধরে শুধুমাত্র দর্শক হিসেবেই পুজো উপভোগ করেছি। বিগত দু’দশক ধরে একটা নতুন ভূমিকায় পুজো শিল্পের সঙ্গে জড়িত হই। প্রথম কথা আমি বর্তমানের ইতিহাস লিখিনি, গবেষণা করতে গিয়ে বুঝলাম যে দশ বছর বা কুড়ি বছর ধরেও যদি গবেষণা করতে হয়, সেটাই প্রয়োজন। আমি শহরকে বুঝতে চেয়েছিলাম পুজোর মাধ্যমে। আমি আর্ট-হিস্ট্রির লোক তাই পুজো-শিল্প আমাকে আকর্ষণ করেছিল কিন্তু ‘পুজো-শিল্প’-এর চেহারাটা আসলে কেমন, সেটা আগে বুঝতে পারিনি। ২০০২-০৩-এ যখন প্রথম এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হই, বুঝতে পারি পুজোর অন্যান্য অনেক দিকের সঙ্গে একটা নতুন ধারা উঠে এসছে। একটা জনউৎসবকে কেন্দ্র করে যে ধরনের শিল্পক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, সেটাকে আমি একধরনের ‘শিল্প-আন্দোলন’-ই বলবো। দুর্গাপুজো করা একটা নতুন জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যে এত সংখ্যক নবীন-প্রবীণ শিল্পীরা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, চারু এবং কারু শিল্পের মেলবন্ধন কীভাবে হচ্ছে, এটা আমার গবেষণা শুরুর বিষয় ছিল এবং হ্যাঁ, দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে শিক্ষামূলক বিভিন্ন গবেষণার ক্ষেত্র বাড়ছে।”

দুর্গাপুজো বিশ্বজনীন তকমা পেলেও আদৌ কি তা আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছাতে পেরেছে? বাইরে থেকে শুধুমাত্র দুর্গাপুজো দেখতে কতজন মানুষ পশ্চিমবঙ্গে আসেন? পুজোকে কেন্দ্র করে রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন কি আদৌ সম্ভব? কীভাবে পশ্চিমবঙ্গের সব পুজোকে এক ছাতার নীচে এনে ডকুমেন্টেশন করা যায়? এই প্রশ্নগুলির বিশ্লেষণ এবং দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে কীভাবে আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করা যায়—দুর্গাপুজোর আন্তর্জাতিকরণ নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ন কিছু বক্তব্য রাখেন পশ্চিমবঙ্গের ব্রিটিশ কাউন্সিল (পূর্ব ও উত্তরপূর্ব ভারতের)-এর অধিকর্তা দেবাঞ্জন চক্রবর্তী, পুজো-সংগঠক শাশ্বত বসু, উৎসব আয়োজক-তত্ত্বাবধায়ক-পরামর্শদাতা ধ্রুবজ্যোতি বসু (শুভ)। এছাড়াও দুর্গাপুজোয় শিল্পী ও তাদের শিল্পকর্ম বিষয়ে বক্তব্য রাখেন শিল্পী বিমল কুণ্ডু ও সুশান্ত পাল।

প্রারম্ভিক শীতের সন্ধ্যায় এই পর্যালোচনা ‘দুর্গাপুজো – শিল্প – সম্ভাবনা’ (Durga Puja Art Possibilities)-র দিকটি নতুন করে উস্কে দিল, একথা অনস্বীকার্য।  

Post Tags
Developed by DXDasia