অনেকেই জানেন না বাংলার ঐতিহ্যবাহী তিনটি শাড়ির ‘জিআই’ ট্যাগ রয়েছে

বাঙালির প্রতীকী পোশাক হিসেবে আগাগোড়া 'শাড়ি'ই প্রাধান্য পেয়ে এসেছে

কিছুদিন আগে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সঞ্চালিত বাংলা টেলিভিশনের জনপ্রিয় একটি গেম শো-তে আমন্ত্রিত ছিলেন পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত ফুলিয়ার তাঁতশিল্পী বীরেন বসাক। তাঁর কাছে প্রশ্ন আসে, ‘এখনও পর্যন্ত বাংলার মোট কটি শাড়ি জিআই ট্যাগ পেয়েছে?’। তিনি উত্তর দেন- ‘চারটি’। সঠিক উত্তর- তিনটি। শুধু বীরেনবাবু নয়, অনেকেই জানেন না এই প্রশ্নের উত্তর।

রসগোল্লার (Rasogolla)  জিআই ট্যাগ পাওয়ার ব্যাপারটা সাধারণ মানুষের চর্চার নাগালে এলেও বাংলার ‘শাড়ি’র জিআই ট্যাগ পাওয়ার বিষয়টা বেশিরভাগেরই জ্ঞাতব্যের বাইরে রয়ে গেছে। অথচ, আপামর বাঙালি জাতির প্রতীকী পোশাক হিসেবে আগাগোড়া শাড়িই প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। এমনকি অনেকেই জানেন না, ‘জিআই ট্যাগ’ (GI) বিষয়টা কী!বাংলার তাঁতের (Bengal Handloom) সঙ্গে জুড়ে আছে তাঁতশিল্পীদের অক্লান্ত শ্রম – বিশেষ ইতিহাস। এই রাজ্যের কিছু কিছু অঞ্চলের তাঁতশিল্পের বিশেষ ঐতিহ্যও আছে। আর এই বিষয়টাকেই স্বীকৃতি দিয়ে টেক্সটাইল মন্ত্রক পণ্য আইন, ১৯৯৯ সালের ভৌগলিক পরিচয় বা জিওগ্রাফিকাল আইডেন্টিফিকেশন (GI) এর অধীনে তাঁতের পণ্যগুলির নিবন্ধনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এর মধ্যে সারা দেশের যে কটি ঐতিহ্যবাহী শাড়ি জায়গা পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী বাংলার তিনটি শাড়ি – বিষ্ণুপুরের ‘বালুচরী’ (Baluchari), ধনিয়াখালির ‘ধনেখালি’ (Dhanekhali),  শান্তিপুরের ‘শান্তিপুরী’ (Shantipuri)।

ভৌগলিক পরিচয় বা Geographical Indication (GI) গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই রাজ্য-সহ সারা দেশেই এমন বহু পণ্য রয়েছে, যেগুলি একটি বিশেষ অঞ্চলেই তৈরি হয়। সেখানকার পণ্য হিসেবে সেটি সর্বত্র বিখ্যাত বা জনপ্রিয়। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে সীতাভোগ, মিহিদানা কলকাতা-সহ অন্য জাযগায় তৈরি হলেও, বর্ধমানই তার জন্মস্থল বলে ইতিহাস রয়েছে। সেখানের কারিগরদের হাতের কৌশল ও সেখানকার গোবিন্দভোগ চালের গুণে সীতাভোগ, মিহিদানা আজও প্রসিদ্ধ। দার্জিলিঙের সুগন্ধি চা শুধুমাত্র সেখানকার চা-বাগানগুলিতেই তৈরি হয়। অন্য জায়গার দামি চা-ও ওই নামে বিক্রি করা চলে না। 

অষ্টাদশ শতকে, বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খানের সমৃদ্ধ বয়ন ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং এই শাড়ি তৈরির নৈপুণ্যকে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদের বালুচর গ্রামে নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে শিল্পটি বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর গ্রামে চলে আসে। মল্ল রাজবংশের রাজত্বকালে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে শাড়ি শিল্পের উন্নতি ঘটে। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক ও আর্থিক কারণে এই বালুচরী শাড়ির শিল্পটি মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। কারণ বেশির ভাগ তাঁতিরা এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে এই শাড়ি তৈরি আবার শুরু হয় এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ সহ আন্তর্জাতিক পরিসরে শাড়ি-প্রেমী  মহিলাদের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা জুড়ে রয়েছে বিষ্ণুপুর ঘরানার বালুচরী। সূক্ষ কারুকর্মে বোনা এই শাড়ির আঁচলে চিত্রিত হয় পুরাণ কাহিনির দৃশ্য। এ রকম এক একটি শাড়ি তৈরি করতে বয়নশিল্পীদের প্রায় এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লাগে। সবদিক বিবেচনা করেই বালুচরী শাড়িকে ভারতে জিআই (GI) মর্যাদা দেওয়া হয়। বিষ্ণুপুরে তো বটেই কলকাতা শহরেই বিভিন্ন নামী-দামি বস্ত্রবিপণিতে নানা ডিজাইনের বালুচরীর খোঁজ মিলবে। কলকাতায় তন্তুজের একাধিক শাখা বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনুমোদিত বিশ্ব বাংলার বিপণিগুলিতে আপনি পাবেন পছন্দসই বালুচরী। কারুকাজ অনুযায়ী এদের মূল্যও হবে ভিন্ন ভিন্ন।

পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে প্রিয় ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়িগুলির মধ্যে একটি হল ধনিয়াখালি শাড়ি। উৎপত্তিস্থল থেকেই এই নাম উৎপত্তি। ধনিয়াখালি বা ধনেখালি হুগলি-দামোদর সমভূমির একটি অংশ এবং বর্তমানে চিনসুরা মহকুমার মধ্যে অবস্থিত এই অঞ্চল, শাড়ি তৈরির জন্য বিশেষ প্রসিদ্ধ। এই শাড়ি খুব অল্প সময়েই বাংলার সমস্ত প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। ধনিয়াখালি শাড়িকে তাঁতের শাড়ির ‘সোনার ফসল’ বলা হয়। ধনিয়াখালি শাড়িও পেয়েছে জিআই ট্যাগ। এই শাড়িতে ঐতিহ্যগত ভাবে লাল বা কালো পাড় রাখা হত। তবে ক্রমশ অন্যান্য রঙের সুতোও ব্যবহার হতে থাকে। ধনিয়াখালি শাড়ি আজকাল হুগলির হরিপাল, রাজবলহাট রসিদপুর, দ্বারহাটা, রামনগর,গুরাপ এবং অন্তপুরে তৈরি হয়।

ভারতীয় তাঁতের শাড়ির ইতিহাসে শান্তিপুর এবং ফুলিয়া উল্লেখযোগ্য নাম। এই দেশের ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি তাঁতকেন্দ্র শান্তিপুর। পঞ্চদশ শতকের গোড়ার দিকে বৈষ্ণব সংস্কৃতি ও ভক্তি আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল শান্তিপুরে তাঁতের শাড়ি বয়নের কথা বিভিন্ন দলিলে নথিভুক্ত রয়েছে। পুরো মধ্যযুগ জুড়ে শান্তিপুরী শাড়ির বয়নশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল, এবং বিখ্যাত নীলাম্বরী শান্তিপুরীর চাহিদার কথা এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে শোনা যেত। যদিও এই অঞ্চল অতি সূক্ষ্ম সুতির ধুতি তৈরির জন্য সুপরিচিত ছিল কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় তাঁতিরা বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে এক সময় শাড়ি বুনতে শুরু করে। পরাধীন ভারতে ব্রিটিশরা প্রায়ই এই দেশের তাঁতিদের শোষণ করত যাতে তারা সেরা মসলিন, বস্ত্র এবং তুলো ইউরোপে নিয়ে যেতে পারে। বিদেশি বস্ত্র ব্যবসায়ীরা এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর মুনাফা করেছিল এবং বাংলার তাঁতিদের নিঃস্ব করে ফেলেছিল। শান্তিপুরের তাঁতিরা কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দাদনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে একত্রিতও হয়েছিল। শান্তিপুরী শাড়ি কলকাতা শহরে পাওয়া যাবে বেশ কিছু দোকানে। তবে জিআই ট্যাগ দেখে কিনতে চাইলে একটু সময় নিয়ে ঐতিহ্যবাহী নামী শাড়ির দোকানে হানা দেওয়াই সমীচীন।

Developed by DXDasia