
শাক দিয়ে শেকড়ে ফেরার গল্প
প্রথমেতে শাক দিয়া ভোজন আরম্ভ।
তাহার পর সূপ আদি দিলেন সানন্দ।।
বনবাস থেকে ফেরার পর দীর্ঘ চোদ্দো বছর উপবাসে থাকা দেওর লক্ষ্মণকে স্বহস্তে রান্না করে এমনই ভোজ সীতা খাইয়েছিলেন। বাংলা ভাষায় রামকথার অন্যতম আদিকবি কৃত্তিবাসের লেখা শ্রীরাম পাঁচালির উত্তরকাণ্ডে রয়েছে খাবারের দীর্ঘ তালিকা। আর সেই তালিকায় সবার প্রথমেই আমরা পাই শাকের উল্লেখ। বাঙালির রসনাবিলাসে শাকের উপস্থিতি ও বৈচিত্র্য নিয়ে এমন রেফারেন্স খুঁজে পাওয়া যাবে এমনকী প্রাকৃতপৈঙ্গল থেকেই।
ওগগর ভত্তা
রম্ভঅ পত্তা
গায়িক ঘিত্তা
দুগ্ধ সজুত্তা
মৌইলি মচ্ছা
নালিচ গচ্ছা
দিজ্জই কন্তা
খা পুনবন্তা
বেহালার সরশুনা অঞ্চলের ক্ষুদিরাম পল্লীতে একাধিক শিল্পীর সমন্বয়ই মঞ্চ ‘চাঁদের হাট’ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মহিলাদের কাছে শাক রান্না হয়তো একটা দৈনন্দিনের অভ্যাসের বিষয়। কিন্তু মল্লিকা দাস সুতারের ভাবনা ও গ্রন্থনায় সেই নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাটিই ‘শাকের চড়ুইভাতি’ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত বিশেষ হয়ে উঠেছিল।
মাঠ থেকে কুড়িয়ে আনা শাকের চড়ুইভাতির প্রস্তুতি
অর্থাৎ, সে-ই পুণ্যবান যার স্ত্রী কলাপাতায় গাওয়া ঘি, দুধ, মৌরলা মাছ আর পাটশাক দিয়ে গরম গরম ভাত রোজ রেঁধে খাওয়ায়। লক্ষণীয়, প্রিয় খাবারের মধ্যে শাকের এই সগৌরব উপস্থিতি। বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যেও শাক আর মাছ— এই দুটি খাবারের উল্লেখ মিলবেই মিলবে। মুকুন্দ চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল কাব্যে শুধু বিভিন্ন শাকের নামের উল্লেখ আছে এমন নয়, সেখানে বর্ণিত হয়েছে শাকের রন্ধনপ্রণালীও। কালকেতুর মা নিদয়ার সাধভক্ষণের বর্ণনায় পাই,
আমার সাধের সীমা এলেঞ্চা কলমী গিমা
বোদালি কাটিয়া কর পাক।
ঘনকাটি খরজ্বালে সন্তেলিবে কটু তৈলে
দিবে তাতে পলতার শাক।।
পুঁই ডগা মুখী কচু ফুল বড়ি আর কিছু
দিবে তাতে মরিচের ঝাল… (ইত্যাদি)
মাঠ থেকে হেঁসেলে
মধ্যযুগের সাহিত্যকীর্তিগুলি ভালো করে লক্ষ করলেই শাক ও বাঙালির আত্মিক যোগের ধারণা করা যায়। তবে শাকের সঙ্গে ভারতের এই অংশের মানুষের সম্পর্ক আরও অনেক প্রাচীন। মানুষ প্রকৃতির রহস্য জানার যে চেষ্টা শুরু করেছে তার প্রাথমিক পর্ব শুরু হয়েছিল বোধহয় অনেকটাই গাছেদের হাত ধরে। গুহায়, জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষের লড়াই শুধু জন্তু-জানোয়ারদের সঙ্গে ছিলো, এমনটা নয়। খিদের জ্বালায় অচেনা ফল খেয়ে মরতে হয়েছে কত মানুষকে, অচেনা ফুল-পাতার ব্যবহারে বিষগ্রস্ত হতে হয়েছে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে সুষম খাদ্যের ইতিহাস। কী খেতে হবে— এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন, কীসের সঙ্গে কী খেতে হবে আর কতটা খেতে হবে। রসনার এই রসায়নের সূত্রপাত মানুষের ঘটেছিল সেই অরণ্যচারী দশাতেই। নৃতাত্ত্বিকরা বিশ্বাস করেন কৃষিকাজের আবিষ্কার মূলত মেয়েদের হাতে। একইভাবে পুরুষেরা শিকার বা মাছধরায় ব্যস্ত থাকাকালীন মেয়েরাই যে শাকপাতা খুঁজে খুঁজে খাদ্যাখাদ্য বিচার করে আমাদের খাদ্যসংস্কৃতিকে এমন মুখরোচক ও রঙিন করে তুলেছিলেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কিনা প্রয়োজনীয় জিনিসটুকু বেছে নিয়ে বাদবাকি সব কিছুকে নাকচ করে দেওয়া মনুষ্যজাতির অভ্যেসের মধ্যেই পড়ে। আর সেখান থেকেই কৃষি-সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আসে ‘আগাছা’-র ধারণা। যা কিছুকে ফসল বলে মানুষ জানে তার বাইরে সবটাই হলো আগাছা। অথচ গাছগাছালির গুণাগুণ চেনার আগে একটা সময়ে সবাই তো কেবল গাছ ছিলো। চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতাতেও এই ভাবনার সমর্থন পাই। রবীন্দ্রনাথের ‘বলাই’-গল্পের নামচরিত্র বলাই সম্বন্ধে বলা হয়,
‘‘…ওর সব চেয়ে বিপদের দিন, যেদিন ঘাসিয়াড়া ঘাস কাটতে আসে। কেননা, ঘাসের ভিতরে ভিতরে ও প্রত্যহ দেখে দেখে বেড়িয়েছে; এতটুকু-টুকু লতা, বেগনি হল্দে নামহারা ফুল, অতি ছোটো ছোটো; মাঝে মাঝে কন্টিকারি গাছ, তার নীল নীল ফুলের বুকের মাঝখানটিতে ছোট্ট একটুখানি সোনার ফোঁটা; বেড়ার কাছে কাছে কোথাও-বা কালমেঘের লতা, কোথাও বা অনন্তমূল; পাখিতে-খাওয়া নিমফলের বিচি প’ড়ে ছোটো ছোটো চারা বেরিয়েছে, কী সুন্দর তার পাতা— সমস্তই নিষ্ঠুর নিড়নি দিয়ে দিয়ে নিড়িয়ে ফেলা হয়। তারা বাগানের শৌখিন গাছ নয়, তাদের নালিশ শোনবার কেউ নেই।…”
শাকান্ন পাকশালা
তাছাড়া আধুনিক পৃথিবীর একর একর জমিতে ধান বা গম চাষের মনো-কালচার-অভ্যস্ত উৎপাদন রীতির সঙ্গে রীতিমতো বেমানান শাকপাতা বা গেঁড়িগুগলি-নির্ভর খাদ্য সংগ্রহ বা ফোরেজ পদ্ধতি। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে দেখি পুত্র-পরিত্যক্ত ও প্রতিবন্ধী গৌরবির স্বপ্নে আসে তার সদ্যমৃত সই আয়েছা বিবি। স্বপ্নে হারার মা তাকে হাত ধরে এক আশ্চর্য দেশে নিয়ে যায়। সেখানে থানকুনি আর দূর্বা ঘাসের মেলা। মাদার গাছের ছায়ায় ঢেঁকি শাকের জঙ্গল। তার মনে হয় ঐ শাকের জঙ্গলই তার স্বর্গ। মনে হয় তার আর আয়েছার স্বর্গ অভিন্ন, বস্তুত সব গরিব মানুষের স্বর্গই এক। অন্যের জমিতে অযত্নে ফলে ওঠা শাক তুলতে তাদের নৈতিকতায় বাধে না, বাধে না আয়েছার হাতে তোলা দূর্বা বা বেলপাতা হিন্দুবাড়ির পুজোয় বিক্রি করতে। “ঈশ্বরের জিনিস তো। শাকেপাতায় দোষ নেই।”
মানুষ তথাকথিত ‘সভ্য’ হওয়ার আগে পৃথিবীতে প্রায় সব মানুষের ভিতরেই ছিল নতুনকে জানবার উৎসাহ। আর সেই উৎসাহ থেকেই সম্ভবত মেয়েদের হাত ধরে মানুষ পরিচিত হয় প্রথমে গাছগাছালি ও পরে চাষবাসের সঙ্গে— এ কথা আগেই বলা হয়েছে। মেয়েদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্ম ক্ষমতার ফলেই শিকারজীবী বা পশুচারণকারী যাযাবরবৃত্তি থেকে কৃষিসভ্যতা হয়ে আজকের নগরসভ্যতায় এসে পৌঁছেছে, সে কথা বলাইবাহুল্য। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের লগ্নেই মেয়েরা খুঁজে পেয়েছিল এই শাকপাতার বিশাল সম্ভার। সেই সময় থেকেই মেয়েদের সঙ্গে শাকপাতার আত্মিক যোগাযোগ। ভূত চতুর্দশীতে চৌদ্দশাক খাওয়ার কথা তো সকলেই জানি। তাছাড়াও লোকাচারের বিভিন্ন আলপনাতেও তাই সহজেই দেখা যায় বিভিন্ন শাকের চিত্রণ। এমনকী মেয়েদের শাড়ির পাড়ের নকশাতেও ফুটে ওঠে শাকের প্রতিচিত্র। শাক যেন মেয়েদের সই-ই বটে। দুর্দিন হোক কিম্বা সুদিন, খিড়কির পুকুরপার থেকে শাক তুলে নানা পদে তা রেঁধে খাওয়া ও খাওয়ানোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকত মেয়েদের হেঁশেলের কর্ত্রী হয়ে ওঠার প্রস্তুতি পর্ব। বাপের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ থাকুক না থাকুক ছোটোবেলার চেনা শাক ফিরিয়ে দিত একটুখানি বাপেরবাড়ি, বাল্যকালের টুকরো-টাকরা স্মৃতি।
মেয়েদের সঙ্গে শাকের এই আত্মিক সম্পর্ককে কিছুদিন আগে পুনঃস্থাপিত হতে দেখলাম শিল্পী ও পরিবেশকর্মী মল্লিকা দাস সুতারের হাত ধরে। বেহালার সরশুনা অঞ্চলের ক্ষুদিরাম পল্লীতে একাধিক শিল্পীর সমন্বয়ই মঞ্চ ‘চাঁদের হাট’ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মহিলাদের কাছে শাক রান্না হয়তো একটা দৈনন্দিনের অভ্যাসের বিষয়। কিন্তু মল্লিকা দাস সুতারের ভাবনা ও গ্রন্থনায় সেই নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাটিই ‘শাকের চড়ুইভাতি’ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত বিশেষ হয়ে উঠেছিল। সেদিন তাঁরা শুধু শাক রান্না করেননি, বরং তাঁদের চিরপরিচিত এই শাকপাতাগুলির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তাঁদের ফেলে আসা দিনের গল্প। মূল মঞ্চে পরপর অর্ধবৃত্তাকারে সাজানো ছিলো বেশ কিছু উনুন। সেই উনুনে নানা কিসিমের শাক রাঁধা হচ্ছিল কেবল আনুষঙ্গিক মশলা, বড়ি ইত্যাদি সহযোগেই নয়, বরং ফেলে আসা স্মৃতির ফোড়ন দিয়েও। প্রতিটি উনুনের ওপর ঝুলছিল শিউলি দাসের হাতে সেলাই করা টুকরো-টুকরো কাপড়ে রন্ধনকারীর নাম ও তাঁদের শাক-স্মৃতি। এঁদের অনেকেই বহু বছর আগে বিয়ে হয়ে এসেছেন ক্ষুদিরাম পল্লীতে। এই অঞ্চলে উদ্বাস্তু হয়ে অথবা বিবাহসূত্রে শ্বশুরবাড়িতে এসে অনেকেই খুঁজে পাননি তাঁদের আবাল্য চেনা বহু শাক। অনেক পরে হয়তো বাজারে খুঁজে পেয়েছেন। শাকের চড়ুইভাতিতে ব্যবহৃত প্রতিটি স্মৃতিকথাতেই ঘুরেফিরে আসে সেইসব স্মৃতি। বাজারে পাওয়া গেলেও সেই পুকুর পাড় থেকে তুলে আনা শাকের স্মৃতির ভাগই যেন বেশি। বাজারে খুঁজে পাওয়া শাকে তো সেই স্মৃতি নেই।
বেহালার সরশুনা অঞ্চলের ক্ষুদিরাম পল্লীতে একাধিক শিল্পীর সমন্বয়ই মঞ্চ ‘চাঁদের হাট’ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মহিলাদের কাছে শাক রান্না হয়তো একটা দৈনন্দিনের অভ্যাসের বিষয়। কিন্তু মল্লিকা দাস সুতারের ভাবনা ও গ্রন্থনায় সেই নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাটিই ‘শাকের চড়ুইভাতি’ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত বিশেষ হয়ে উঠেছিল।
সবার পাতে শাক
শিল্পী মল্লিকা দাস সুতারের কথায় বুঝতে পারি, তাঁর বেড়ে ওঠার পর্বে চারপাশের ও দিনানুদিনের খুঁটিনাটিই পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছে তাঁর শিল্পের বিষয়। ছোটোবেলায় হুগলি-র গ্রামে বাড়ির উঠোনে দেখা লক্ষ্মীপুজোর আলপনা থেকে শ্বাশুড়ির হাতে রাঁধা কচুর নানা বাঙাল পদ— সবই তাঁকে শিল্পসৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা জোগায়। আর সেই অনুপ্রেরণা শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি শিল্পী, তিনি তা ছড়িয়ে দিয়েছেন তার আবাসস্থলের চারপাশের মহিলাদের মধ্যে। এই মহিলারা তাঁরাই, যাঁদের নিজের নাম ধরে প্রায় কেউই ডাকে না। সকলেই তাঁদের চেনে অমুকের মা কিংবা তমুকের বৌ এই নামে। তাঁদের রোজকার কাজ, ছোটো ছোটো ভালো লাগাকে একত্রে তুলে ধরেছেন মল্লিকা তাঁর কাজের মাধ্যমে। এই কাজ শুধু রান্নাবান্না কিংবা অফবিট খাদ্যোৎসব বা হারিয়ে যাওয়া শাকের রেসিপির ডকুমেন্টেশনে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং সেদিনের কুড়িয়ে পাওয়া শাকের চড়ুইভাতি আসলে হয়ে উঠেছিল হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য মেয়েবেলার গল্প। বাড়ির আশেপাশের আগাছার জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা মালতী রায়, অরুণা হালদার, কানন সুতারদের সেইসব মেয়েবেলা, যার কথা হয়তো কারুর জানার কথা ছিলো না। পৃথিবীতে আজ মানুষের মাইগ্রেশন বহুল চর্চিত একটি বিষয় হলেও মেয়েমানুষের মাইগ্রেশনের কথা, বিশেষত বিয়ের সূত্রে মাইগ্রেশনের কথা কমই আলোচিত হয়। কদাচিত বাংলা ছড়ায় উঠে আসে মেয়েদের চাপা দীর্ঘশ্বাস,
‘এপারেতে লঙ্কাগাছটা রাঙা টুকটুক করে
গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে’
আবার কখনও ফুটে ওঠে কৌলিন্যপ্রথা পীড়িত সমাজে পুরুষের বহুবিবাহের প্রসঙ্গ
‘জাদু এ তো বড়ো রঙ্গ জাদু, এ তো বড়ো রঙ্গ।
চার তিতো দেখাতে পার যাব তোমার সঙ্গ।।
নিম তিতো, নিসুন্দে তিতো, তিতো মাকাল ফল।
তাহার অধিক তিতো, কন্যে, বোন-সতিনের ঘর।।’
শাকেভাতে বাঙালি
কুড়িয়ে পাওয়া শাকের চড়ুইভাতির সূত্রে আলোচনায় উঠে এলো এইসব প্রসঙ্গও। মালতী রায় লিখেছেন— ‘আমি ছোটোবেলায় দেখেছি মা কে বাগান থেকে ঢেঁকি শাক তুলে আনতে… ক্ষুদিরাম পল্লীতে অনেক ধরনের শাক দেখলেও ঢেঁকি শাক দেখতে পাই না। ছোটোবেলা থেকেই এই শাক খেতে খুব ভালো লাগত। এখন মাঝেমাঝে বাজারে এই শাক উঠলে কিনে নিয়ে আসি।’ পাওয়া যাবে এর ঠিক উলটো বয়ানও, যেখানে বৈবাহিক কারণে মাইগ্রেশনের সূত্রে সমৃদ্ধ হচ্ছে জ্ঞানভাণ্ডার, পূর্বনারী থেকে বর্তমান প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে চলেছে ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রভাব। সুমতি মণ্ডল বলছেন, “আমি ছোটোবেলা থেকে জানতাম শোলাকচুর কন্দ বা মূলটাই খাওয়া যায়, কিন্তু এর শাকও যে খাওয়া যায় তা জানতাম না। শ্বশুরবাড়িতে এসে শাশুড়ির কাছে প্রথম এই শাক রান্না শিখি… নিরামিষ রান্না করলে এই শাকে ছোলা, নারকোল দিয়ে রান্না করি। আবার চিংড়ি মাছ দিয়েও রান্না করি। শাশুড়ি মা বলতেন এই শাক খেলে রক্তবাড়ে ও শুদ্ধ হয়” এইসব বয়ানেও খোঁজ মেলে পৃথিবীতে ক্রমাগত চলতে থাকা মেয়েমানুষের এই নিয়ত মাইগ্রেশনের। প্রিয় গাছ, চেনা বাড়ি, কাছের মানুষ— পিতৃতন্ত্রের সুকঠিন কাঠামোয় পুরনো সব ছেড়ে নিজের শিকড়টুকুও উপড়ে মেয়েদের অন্য জায়গায় এসে বসবাস যে করতেই হয়।
বিশ্বায়নের যুগে আজ আমরা পরিচিত হয়েছি নানাধরনের খাবারের সঙ্গে। এখন আমাদের সকলের হাতে অনেক বিকল্প, অনেক অপশন। আজকালকার বাচ্চারা তো শাক-সবজি খেতে চায়ও না, পারেও না। কোভিডকালে এই কচিকাঁচাদের হাত ধরেই শুরু হয় শিল্পীর জার্নি। পেশায় শিক্ষক মল্লিকা একদিন হঠাৎই খেয়াল করেন, লকডাউনে তাঁর বাড়ির আশেপাশের বাচ্চারা ডুবে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের পর্দায়। বিকেলবেলা ছোটাছুটি না করে, একসঙ্গে থেকেও পাশাপাশি বসে তারা কেবল মোবাইলে গেম খেলছে। সেই বাচ্চাদের মোবাইল থেকে দূরে রাখবার প্রাথমিক প্রয়াস থেকেই মল্লিকা তাদের আলাপ করান নানারকম বীজের সঙ্গে। শুরু হয় কচিকাঁচাদের দল, ‘গ্রিন-মার্কার্স’। বাচ্চারা পাড়া ঘুরে বাড়ি বাড়ি বিভিন্ন সবজি ও গাছের চারা বিলোতে শুরু করলো। সেই গাছ কেউ পুঁততে দিলেন সহজেই, আবার কেউ রাজি হতে দেরি করলেন অনেকটা। কিন্তু অবশেষে রাজি করানো গেল অনেককেই। আশেপাশের মানুষ, যাঁদের বাড়ির পাশে সামান্য জায়গা আছে, তা সে পড়ে থাকা প্লাস্টিকে ঢাকা জায়গাই হোক না কেন, সেখানে সবজির বাগান করার স্বপ্ন দেখালেন মল্লিকা। করোনা কালে যখন সবাই বাড়িতে আটকে তখন নিজের প্রয়োজনীয় খাদ্যের অন্তত কিছুটা নিজেই উৎপাদন করার সাহস জোগালেন তিনি। বাড়ির পাশে সবজির বীজ বপনের মাধ্যমে বাজার-প্রচলিত খাদ্য-রাজনীতিকে প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করালেন শিল্পী ও তাঁর কচিকাঁচা সঙ্গীসাথিরা। তারপর এলো তাঁদের মায়েদের পালা। মল্লিকা দাস সুতার ও তার সহচরীরা ক্ষুদিরামপল্লী অঞ্চলে একাধিক সমীক্ষা চালান, বিভিন্ন প্রশ্নে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন ঐ অঞ্চলে কোন কোন শাক এখনও মানুষ খেয়ে থাকেন। বেশিরভাগ বাড়ি থেকে জানা যায় শাক খুব কমই খাওয়া হয় এখন, আর বাচ্চারা তো খেতেই চায় না। একথা শুধু ক্ষুদিরামপল্লী কেন, সমস্ত দেশের জন্যই সম্ভবত সত্য। নিজেদের শিকড়কে ভুলিয়ে দিতে ভিনদেশি নানা খাবারের পসরা এখন আমাদের হাতের নাগালে। How to be a good consumer— এই মন্ত্রে দীক্ষিত উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সকলে। কিন্তু ভালো কনজিউমারের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে শরীরস্বাস্থ্যের যে বারোটা বাজছে সে কথা আমাদের আর খেয়াল থাকছে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কী খাব, কেন খাব, কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল : ঠিক করার দায়িত্ব ক্রেতাদেরই।
মল্লিকা দাস সুতার ও তার সহচরীরা ক্ষুদিরামপল্লী অঞ্চলে একাধিক সমীক্ষা চালান, বিভিন্ন প্রশ্নে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন ঐ অঞ্চলে কোন কোন শাক এখনও মানুষ খেয়ে থাকেন।
শাকস্মৃতি-সুখস্মৃতি
মল্লিকা দাস সুতার বললেন, ঔপনিবেশিকতা এবং পুঁজিবাদী বাজার-ব্যবস্থায় ধ্বসে পড়া মানব মনের কথা। খাদ্য রাজনৈতিক কর্মী বন্দনা শিবা যে বলেন, আমাদের ঠাকুমা দিদিমারা যেটাকে সুখাদ্য বলেন তাই খাওয়া উচিত, সেই ঠাকুমা-দিদিমারাও যে কলোনিয়ালিজম ও ক্যাপিটাল-কলোনিয়ালিজমের মিশেলে তৈরি এই খাদ্যরাজনীতির ভিকটিম, তাঁদের জানাবোঝাও যে ক্রমাগত ম্যানিপুলেটেড হয়েছে বাজার অর্থনীতির হাত ধরে— সেই কথাই বললেন মল্লিকা। শিকড়ের বিষয়ে আমাদের জ্ঞান ফিকে হতে হতে আজ আর নেই বললেই চলে। ফেলে আসা সেই জাতিগত সামূহিক জ্ঞান ও আজকের মানুষের আধুনিক এপিস্টেমোলজি ও কালিনারি কালচারের মধ্যেকার মিসিং-লিংক খুঁজতে গিয়ে সহজলভ্য, অনাদরপুষ্ট অথচ নানা পৌষ্টিকগুণে সমৃদ্ধ শাককেই বেছে নিয়েছেন তিনি। অবশ্য মল্লিকার খাদ্য রাজনীতি বিষয়ে ভাবনা ও কর্মকাণ্ড শুধু শাকে আটকে নেই। তাঁর বিভিন্ন কাজে তিনি বারবার প্রশ্ন করছেন বর্তমান মানুষের প্রকৃতি বিষয়ক ধারণা ও জীবনযাপনগত মূল্যবোধকে।
সেই কর্মকাণ্ডেই নতুন সংযোজন ‘কুড়িয়ে পাওয়া শাকের চড়ুইভাতি’। মল্লিকা ও অন্যান্য মেয়েরা এমনই রূপকথার আদলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নতুন নতুন ভাষ্য গড়ে তুলুন। সে গল্প যেন ফুরোয় না, নটেগাছটা বুড়িয়ে যাক, কিন্তু যেন মুড়োয় না।