দুই জীবিত শতবর্ষী

সিনেমাটোগ্রাফার রামানন্দ সেনগুপ্ত এবং সংগীত বিশারদ দিলীপকুমার রায়

চলতি বছরটি অনেক কৃতী বাঙালীর জন্ম শতবর্ষ। সেই তালিকায় অবশ্যই উঠে আসবেন সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র, অভিনেত্রী কানন দেবী, ভাস্কর শঙ্খ চৌধুরি বা গণনাট্য আন্দোলন খ্যাত চিত্ত প্রসাদ। সেই তালিকায় উঠে আসবেন আরও দুই জন যাঁরা সগৌরবে ঘোষণা করছেন যে তাঁরা আজও জীবিত। তাঁদের একজন সিনেমাটোগ্রাফার রামানন্দ সেনগুপ্ত এবং অপরজন সংগীত বিশারদ দিলীপকুমার রায়। দ্বিতীয় নামটি নিয়ে গোড়াতেই সংশয়ের নিরসন করে রাখা দরকার। তিনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের খ্যাতকীর্তি পুত্র দিলীপ কুমার নন। কিন্তু তিনিও আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল।

দিলীপকুমারের দাদামশাই হলেন রজনীকান্ত সেন। বংশ গৌরবে রামানন্দও পিছিয়ে নেই। তাঁর মামা হলেন ক্ষিতিমোহন সেন। একেবারে কৌশোরেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রামানন্দের পরিচয় করিয়ে দেন ক্ষিতিমোহন। তার পর ছবির দুনিয়ায় অবগাহন করে তিনি এখন টালিগঞ্জের বাসিন্দা। দিলীপকুমার চাকরি সূত্রে পায়ের তলায় সরষে নিয়ে দুনিয়া ঘুরেছেন। বর্তমানে থিতু হয়েছেন শান্তিনিকেতনে।

রেনোয়া বসে, ক্লদ দাঁড়িয়ে, রামানন্দ সেনগুপ্ত পাশে হরিসাধন দাসগুপ্ত

সত্যজিৎ রায় তাঁর জীবনে যে দু’জনকে ধ্রুবতারা হিসেবে মেনেছেন তার একজন ফরাসি চিত্রপরিচালক জাঁ রেনোয়া এবং অপরজন ইতালিয় সিনেমায় নবতরঙ্গের জনক ভিত্তোরিও ডি সিকা। রামানন্দ সেই বিরল মানুষ যিনি রেনোয়ার “দ্য রিভার” ছবির চিত্রগ্রাহক। সেটা পঞ্চাশের দশকের গোড়ার কথা। প্রায় একই সময়ে তিনি বিরল প্রতিভা ঋত্বিক ঘটকের “নাগরিক” ছবিরও চিত্রগ্রাহক- যে ছবি দিয়ে ঋত্বিকের চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা।

দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন রজনীকান্ত সেন।  মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান। রোগ শয্যায় শায়িত রজনীকান্তকে দেখে এসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “শরীর হার মানিয়াছে কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারে নাই। কণ্ঠ বিদীর্ণ হইয়াছে কিন্তু সংগীতকে  নিবৃত্ত করিতে পারে নাই”। রজনীকান্ত সারা জীবনে অন্তত দু’শো নব্বই খানা গান লিখেছেন। সুরারোপও করেছেন নিজে। কিন্তু কোন বাঁধা স্বরলিপি তৈরি করে যেতে পারেননি। দিলীপকুমার রায় আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন রজনীকান্ত রচিত গানের শুদ্ধতা চর্চায়।

ক্রেনের ওপর ক্লদ, দাঁড়িয়ে রেনোয়া, নীচে রামানন্দ সেনগুপ্ত

রামানন্দ সেনগুপ্ত-র ঝুলিতে আছে ৬৩ খানা বাংলা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি, বিদেশী ভাষায় পাঁচখানা এবং ছয় খানা তথ্যচিত্র। রেনোয়ার ‘দ্য রিভার’ ছাড়াও আছে নতুন ইহুদী (সলিল সেন ), ডাকহরকরা( অগ্রগামী), ঘুমভাঙার গান (উৎপল দত্ত), হংসমিথুন (পার্থপ্রতিম চৌধুরি), তিন ভূবনের পারে (আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়), ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট(পুর্ণেন্দু রায়চৌধুরি) এবং আরও কত কী।

দিলীপকুমার আজীবন ডুবে আছেন সংগীতে। রজনীকান্ত তো বটেই এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। শতবর্ষেও তাঁর কন্ঠ সমান সজীব। তাঁর মা রজনীকান্তের কণ্যা শান্তিলতা দেবীর গলায় গান শুনে শুনেই তিনি রজনীকান্তের স্বরলিপি বাস্তবায়িত করেছেন। দিলীপকুমারের তত্ত্বাবধানে গান রেকর্ড করেছেন হেমন্ত, সন্ধ্যা, অর্ঘ সেন, পান্নালাল ভট্টাচার্য-রা। তিনি নিজে তালিম পেয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং হিমাংশু রায়ের কাছে।

হিচকক, নির্মল দে ও রামানন্দ সেনগুপ্ত

রামানন্দ সেনগুপ্তের হাতেও প্রশিক্ষিত হয়েছেন অসিত সেন, দীনেন গুপ্ত, সৌম্যেন্দু রায়ের মত মানুষেরা। রামানন্দ এবং দিলীপকুমার জন্মসূত্রে বৈদ্য বান্ধব। তাঁরা পরস্পরে পরিচিত কি-না আমরা জানিনা। তবে একই সময়ের সড়কে সমান্তরালে হেঁটেছেন। কোন স্মৃতিচারণের আসরে তাঁদের যুগলবন্দী পরিবেশিত হতে পারে কি ?

Developed by DXDasia