ফের নজর কাড়লেন কলকাতার ‘প্যাডম্যান’ – ন্যাপকিনের সঙ্গে এবার থাকবে বার্তাবাহী চিরকুট

গত ২১ মে কলকাতা পুরসভার আট নম্বর বরো অফিসে এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছে

সাইকেলে চেপে যখন বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্যানিটারি ন্যাপকিন (Sanitary Napkin) পৌঁছে দেওয়া শুরু করেছিলেন, সেই সময় তাঁর মাথায় কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খেত। সমাজ আমায় মেনে নেবে তো? মেয়েদের হাতেই আমাকে মার খেতে হবে না তো? বাবা-মা অপমানিত হবে না তো? এই প্রশ্নগুলোই আজ অবান্তর হয়ে পড়েছে ‘কলকাতার প্যাডম্যান’ (Kolkata’s Padman) বলে পরিচিত, বাঁশদ্রোণীর শোভন মুখোপাধ্যায় (Shobhan Mukherjee)-এর কাছে। সুন্দরবন, শিলিগুড়ি, দুই মেদিনীপুর, মালদা, বীরভূম, দুই দিনাজপুর-সহ রাজ্যের একাধিক জেলার প্রায় পাঁচ লক্ষ মেয়ের হাতে কম দামে ন্যাপকিন পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্রতী তিনি। তাঁর সেই ‘ঘরে ঘরে ন্যাপকিন’ প্রকল্পের সঙ্গেই এ বার যোগ করেছেন একাধিক সামাজিক সমস্যাকেন্দ্রিক বার্তা ও ফোন নম্বর লেখা চিরকুট।

সবুজ চিরকুটের উপরে লেখা, ‘নিখোঁজ হলে শিশু করবেন না দেরি, ফোন করুন ১০৯৮-এ/ হারিয়ে যাওয়া আটকাতে আমরা সবাই একসাথে’। কোনওটায় আবার লেখা— ‘এখন বিয়ে নয়/ আগে নিজের পায়ে দাঁড়াব, আমার উপর বিশ্বাস রাখো/ করে দেখাব’। সঙ্গে শিশু অধিকার ও সুরক্ষা কমিশন এবং পাচার-বিরোধী সংস্থার হেল্পলাইন নম্বর। রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে ঘরে ঘরে কম দামে পৌঁছে যাওয়া স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেটে এ বার থেকে থাকবে এমনই বার্তাবাহী চিরকুট। যা ঋতু-স্বাস্থ্যের পাশাপাশি নারী ও শিশু পাচার, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নারী নিগ্রহ নিয়ে সচেতনতার প্রচারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর জোগাবে মেয়েদের হাতের মুঠোয়। গত ২১ মে কলকাতা পুরসভার আট নম্বর বরো অফিসে এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছে।

শহুরে মহিলারা তুলনায় শিক্ষিত, সতর্ক হলেও গ্রামের মেয়েরা ততটা নন। সেখানেই এই সমস্যা বেশি। তাই তাঁদের সচেতন ও সাহায্য করতে এই উদ্যোগ।

এ ভাবেই ন্যাপকিনের সঙ্গে পৌঁছে যাচ্ছে চিরকুট

দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত শোভন মুখোপাধ্যায়ের মোট ১২০টা ইউনিট রয়েছে, কর্মরত প্রায় দশ হাজার মহিলা। সেগুলো আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন নিরন্তর। স্যানিটারি ন্যাপকিনের সঙ্গে বার্তাবাহী চিরকুট, পরিকল্পনাটি কি আপনারই? “হ্যাঁ। অনেক দিন থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল ন্যাপকিনের সঙ্গে শিশুশ্রম, গার্হস্থ্য হিংসা -এগুলো নিয়ে কাজ করবো। শহুরে মহিলারা তুলনায় শিক্ষিত, সতর্ক হলেও গ্রামের মেয়েরা ততটা নন। সেখানেই এই সমস্যা বেশি। তাই তাঁদের সচেতন ও সাহায্য করতে এই উদ্যোগ। শুধু ভাবলেই তো হল না, স্পনসরশিপ জোগাড় করা, রাজ্যের নারী ও শিশু সুরক্ষা কমিশন ইত্যাদি কমিশনের মতামত নেওয়া, স্টিকার ছাপানো অনেকরকম বিষয় জড়িয়ে ছিল এর সঙ্গে। ভাবনাকে রূপ দিতে সময় লেগেছে, কিন্তু কাজটা যে শুরু করতে পেরেছি এটাই ভালো ব্যাপার।” বলেন শোভন।

শোভনের এহেন উদ্যোগের পাশে থেকেছে উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে পাচার-বিরোধী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এছাড়া তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন রাজ্যের মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, শিশু অধিকার ও সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপার্সন অনন্যা চক্রবর্তী। দীর্ঘ লকডাউন পর্বে গার্হস্থ্য হিংসার বলি হতে হয়েছে মেয়েদের। এই সময়ে মহিলাদের উপরে অত্যাচার বৃদ্ধির প্রবণতা বিশ্ব জুড়েই বাড়তে দেখা গিয়েছে। অন্যতম কারণ, পরিবারের সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা একসঙ্গে থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই অশান্তি বেড়ে গিয়েছিল। মেয়েদের বাড়ির কাজ বেড়ে গিয়েছিল। তারই মধ্যে পরিবারের অন্য সদস্যদের তাঁদের দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার মনোভাব নারী-মনে চাপ তৈরি করছে, চাকরি হারিয়ে মেয়েদের আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। অর্থনৈতিক সমস্যায় হতাশাগ্রস্ত পুরুষদের একাংশের কাছে ক্ষোভ বহিঃপ্রকাশের সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল চোখের সামনে থাকা পরিবারের মহিলা। এর কুপ্রভাব পড়ছে পরিবারের শিশুদের উপরে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শৈশব। নির্দিষ্ট কোনও শ্রেণির নয়, সর্বস্তর থেকে আসছিল এমনই অভিযোগ। লকডাউনের পরবর্তী সময়েও এর প্রভাব রয়ে গিয়েছে।

শোভনের কথায়, “ঘরে ঘরে স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রকল্প নয় নয় করে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। ন্যাপকিনের সঙ্গে বার্তাবাহী চিরকুট পৌঁছে দেওয়ার এই কাজটায় শুরুতেই ভালো সাড়া পেয়েছি, আরও অনেক দূর এগোতে হবে এটা নিয়ে। আমি জেলায় জেলায় ঘুরে কাজ করি, সেখানে মেয়েরা নিজেরাই চাইছিল, এরকম কিছু হোক। কারণ, এই প্রয়োজনীয় নম্বরগুলো সেভাবে কারোরই মনে থাকে না এবং গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ মহিলারাই এ বিষয়ে অন্ধকারে থাকেন। এখন ন্যাপকিনের সঙ্গে প্রতিটি জেলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করছি সেইসব হেল্পলাইন নম্বরগুলো। চিরকুটগুলো তাদের কাছে থেকে যাবে।”

ছবি সূত্রঃ শোভন মুখোপাধ্যায়

Developed by DXDasia