হরিদাস মোদকের আকর্ষণ হল লুচি আর খোসা সমেত আলুর তরকারি
সকাল ন’টা। সোনালি রোদে চিকচিক করে ধীর গতিতে ট্রাম আসছে যাচ্ছে শ্যামবাজার মোড়ে। কারোর অফিস যাওয়ার তাড়া, কারোর স্কুল বা কলেজের। ট্রাম ক্রমশ বাঁক নেবে বিধান সরণির দিকে। শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা যা-ই হোক, একটু কচুরি খেলে ক্ষতি কী! আপনি কচুরি খাবেন কি খাবেন না এই ভাবতে ভাবতে দেখা গেল হুশ হুশ করে বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি চলে যাচ্ছে, অথচ আপনি মনস্থির করতে পারছেন না। তাই এত না ভেবে চট করে ঢুঁ মেরে আসুন বিখ্যাত আদি হরিদাস মোদকের দোকানে।

শ্যামবাজার মোড়েই পাশাপাশি দুই হরিদাস মোদকের দোকান। তার মধ্যে যে দোকানটা একটু পুরোনো পুরোনো দেখতে, সেখানে একবার ঢুকে পড়লেই গন্ধে আপনা আপনিই বসে পড়বেন আপনি। কাঠের বেঞ্চ-টেবিলের সামনে দোকানের এক কর্মী এসে জলে ধোয়া কলাপাতা দিয়ে যাবেন আপনাকে। রংচটা দেওয়ালে দেখা যাবে মহাপুরুষদের বাঁধানো সব ছবি। প্রত্যেকটা ফ্রেমে টাটকা রজনীগন্ধার মালা ঝুলছে। কচুরি আর ডালের যে প্রেম, তা আপনি না খেলে বুঝতেই পারবেন না। এই দোকানে কচুরি মিলবে শুধু সকালে। তারপর লুচি। কচুরিতে কাঁচা বিউলির ডাল আর হিঙের পুর। আবার ওই একই পুর যখন পাঁচফোড়ন দিয়ে ভাজা হয়ে ময়দার লেচিতে ভরা হবে, তখন তার নাম রাধাবল্লভী। শীতে আবার কড়াইশুঁটি দিয়ে বানানো হবে পুর।
আরও পড়ুন
পুঁটিরামের মিষ্টিতে ১৫০ বছরের স্বাদ
উত্তর কলকাতা বলতেই আমাদের সবার প্রথমে মাথায় আসে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে ঘোড়ায় চড়া নেতাজি মূর্তির কথা। আর শ্যামবাজার মোড়ের ঠিক পাশেই রয়েছে বিখ্যাত আদি হরিদাস মোদকের দোকান। প্রায় ২৫০ বছর আগে এই দোকান প্রতিষ্ঠা করেন হরিদাস মোদক। তারপর থেকে বংশ পরম্পরায় এই দোকানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মোদক পরিবার। হরিদাস মোদকে এসেছেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব, রানি রাসমণি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। দোকানের দেওয়ালে আজও জ্বলজ্বল করছে মহাপুরুষদের ছবি। হরিদাস মোদকের আকর্ষণ হল লুচি আর খোসা সমেত আলুর তরকারি। দোকানের বর্তমান কর্ণধার ইন্দ্রজিৎ মোদক। প্রায় ছয় প্রজন্ম ধরে এই দোকান আজও রমরমিয়ে চলছে। এখানে সমস্ত খাবার পরিবেশন করা হয় কলাপাতায়। কলাপাতায় লুচি আর আলুর তরকারি, তার টানেই উত্তর-মধ্য-দক্ষিণ কলকাতার অধিকাংশ মানুষ ভিড় করেন হরিদাস মোদকে। এছাড়াও সকালে কচুরি, ছোলার ডালও পাওয়া যায়। মিষ্টির মধ্যে এই দোকানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কালাকাঁদ, জিভে গজা, ছানার জিলাপি, কালোজাম। দোকানের বর্তমান মালিক বলেন, কেএফসি’র যুগেও কলেজ পড়ুয়ারা কিন্তু এখনও ভিড় করে। তার কারণ একটাই- নস্টালজিয়া এবং এখানকার বাঙালিয়ানা।

শ্যামবাজার মোড় থেকে আরজি কর হাসপাতাল যাওয়ার ঠিক ডানদিকে আপনি পেয়ে যাবেন হরিদাস মোদকের দোকান। অর্থাৎ শ্যামবাজার কালীবাড়ির ঠিক উল্টোদিকেই। লুচি বা কচুরির বর্তমান মূল্য একটু দেখে নেওয়া যাক। প্রতি প্লেট ৩ পিস লুচি- ১৮ টাকা, পরবর্তী প্রতি ১ পিস লুচি- ৬ টাকা; প্রতি প্লেট ৩ পিস কচুরি- ২১ টাকা, পরবর্তী প্রতি ১ পিস কচুরি- ৭ টাকা। এছাড়াও মাত্র ৬ টাকায় পেয়ে যাবেন গরম গরম সিঙারা।

২৫০ বছরের ইতিহাস লেগে আছে হরিদাসের দেওয়ালে দেওয়ালে। বয়স্ক থেকে অতি তরুণ- দোকানে গেলে বোঝা যায় বয়সটাই একমাত্র সত্য নয়। শ্যামবাজারের হরেকরকম জিনিসপত্র আর দোকানের ভিড়ে আজও কিন্তু জ্বলজ্বল করছে হরিদাস মোদকের মতো দোকান।