কুঠার আবিষ্কারক মানুষকে গাছেরা বিশ্বাস করে না

প্রয়োজন গাছ সুমারি, গাছের অডিট

কলকাতাবাসীর গাছের প্রতি ভালোবাসা বাড়ছে। যদিও, দুর্ভাগ্যের কথা হল, এখনও কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতেই কখনও থাকে না, তাদের দলের বৃক্ষ-নীতি কী? গাছ নিয়ে তারা কী ভাবছেন! পৃথিবীর সব ধরনের প্রাণী গাছের সঙ্গে সহবাস করে। মানুষই একমাত্র প্রাণী, যারা কুঠার আবিষ্কার করেছে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গাছ কেটে চলেছে। গাছের চোখে প্রতিটি মানুষই হত্যাকারী। এর মধ্যেই, সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা গাছ নিয়ে নিঃশব্দে একটি ঐতিহাসিক কাজ করে ফেলেছে। প্রথমে সেই গল্পটা বলে নিই।

গত ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আমফানের দাপটে তছনছ হয়ে গিয়েছিল কলকাতা শহর। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে নর্দান পার্কে অতি প্রাচীন একটি বটগাছ সেই রাতে মাটিতে হেলে পড়েছিল। সকলের চেষ্টায় গাছটিকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। প্রাণ ফিরে পেয়েছে সেই প্রাচীন বটবৃক্ষ। কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এইরকমই প্রায় দেড় হাজার গাছ আমফানের দাপটে ভেঙে পড়েছিল শহরে। এরমধ্যে আছে বট, অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া, বকুল বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এর ভেতর বেশ কিছু প্রাচীন গাছকে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং কলকাতা পুরসভার উদ্যোগে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। কলকাতা পুরসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ২৫ বছর বা তার বেশি পুরোনো যেসব গাছ গোড়া থেকে উপড়ে পড়েছে, সেইসব গাছগুলিকে পুনঃস্থাপন করা হবে। এরপর শহরে প্রায় ৩০০টি গাছকে পুনঃস্থাপন করা হয় যার মধ্যে ২৮৫টি গাছকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে সম্প্রতি পুরসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ৭০ নম্বর ওয়ার্ড ভবানীপুর এলাকায় সবথেকে বেশি সংখ্যক গাছ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগের ফলে, ওই ওয়ার্ডে কুড়িটি গাছ ফিরে পেয়েছে তাদের নতুন জীবন। নর্দান পার্ক, রয়েড স্ট্রিট, জাস্টিস চন্দ্র মাধবপুর রোড, চক্রবেরিয়া রোড, রবীন্দ্র সরোবর, সুভাষ সরোবর এলাকায় গোড়া থেকে উপড়ে পড়া বৃক্ষগুলিকে পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। সুভাষ সরোবরে ৩৭টি বৃক্ষকে পুনঃস্থাপন করা হয়, তার মধ্যে ৩৩টি গাছ প্রাণ ফিরে পেয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রবীন্দ্র সরোবরে ১৪৪টি গাছকে পুনঃস্থাপন করা হয়, তার মধ্যে ১১১টি পুনর্জীবন পেয়েছে বলে পুরসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পুরোনো মহীরুহগুলো যখন ভেঙে পড়ে, বা হেলে পড়ে ঝড়ের দাপটে, পুনঃস্থাপন করার জন্য গাছগুলির ডালপালা কেটে ছোটো করা হয়। তারপর ক্রেনের সাহায্যে মাটি থেকে তুলে নিয়ে নতুন করে স্থাপন করা হয়। যেসব অংশে ডালপালা কেটে দেওয়া হয়, সেই সব জায়গায় ক্ষত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডালপালা ছাঁটা জায়গাগুলিতে ছত্রাক তৈরি সম্ভাবনা থাকে। তাই ১৫ দিন পর পর এই বৃক্ষগুলিকে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করেন। প্রয়োজনীয় জৈবসার, জল, ওষুধ দেওয়া হয়। যাতে পুষ্টির অভাব না হয়। কলকাতায় পুনর্জীবন পেয়েছে ২৮৫টি গাছ। এই দাবি পুরসভার। কিন্তু এখনও শহরের গাছের কোনও অডিট-এর ব্যবস্থা নেই। হলে জানা যেত, এই যে এত অর্থব্যয় করে একটা ভালো কাজ করা হল। এক বছর বাদে বা তারও পরে সেসব গাছ কী অবস্থায় আছে।

এ তো গেল কলকাতার গাছ নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কথা। কলকাতা শহরের সঙ্গে গাছের সম্পর্ক কিন্তু আজকের নয়। বহু পুরোনো। কলকাতার জায়গার নামগুলোর দিকে তাকান একবার। নিমতলা, তালতলা, বকুলতলা, ঝাউতলা, বেলতলা, বটতলা, লেবুতলা, নারকেলডাঙ্গা, হরিতকি বাগান, পেয়ারা বাগান, চালতা বাগান এমন কত নাম। বোঝাই যায় এই শহরের সঙ্গে একসময় গাছের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এখন নামগুলো আছে। গাছগুলো সব হারিয়ে গিয়েছে। কলকাতায় গাছের নাম দিয়ে যে সব জায়গার নাম, সেই সব জায়গায় কি ওই গাছগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনা যায় না? তালতলায় যদি ফের শ’খানেক তালগাছ লাগানো যায় বা বকুলতলায় বকুল গাছ, ঝাউতলায় ঝাউগাছ, আমাদের এই শহর আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

রাতে কলকাতা থেকে বিমানবন্দরের দিকে যেতে প্রচুর গাছের গায়ে দেখতে পাবেন ইলেকট্রিকের তার জড়িয়ে আলো জ্বলছে। নানা রং-এর আলো। দেখতে ভালোই লাগে। কিন্তু এই যে সারা রাত ধরে গাছের গায়ে আলো জ্বলে, তাপ সৃষ্টি হয়, তাতে কি গাছের কোনও অসুবিধে হয়? সালোক সংশ্লেষ কোনও ভাবে ব্যাহত হয়? মানুষই যখন দারিদ্রসীমা পেরোতে নাজেহাল, তখন রাস্তার কুকুর, বা গাছ নিয়ে ভাবার সময় কোথায়। এমন মত অনেকেরই। কিন্তু গাছ, পুকুর, জলাশয়, পশু-পাখির কথা বাদ দিয়ে যে উন্নয়নের কথা, তা আজ সারা পৃথিবীতেই বাতিল হয়ে গিয়েছে। সোডিয়াম ভেপার আলোর সংখ্যা এই শহরে বেড়েই চলেছে। অনেকেরই মত, এই আলো পাখির প্রজনন ক্ষমতাকে নষ্ট করে। করে কী না জানি না। তবে কথাটা যখন উঠেছে বিষয়টির সত্যতা আছে কী না তা খতিয়ে দেখা উচিত।

২০১৩-১৪ সালে বাইপাসের ধারে একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। তখন নিয়মিত দেখতাম একটা একটা করে রাস্তার ধারের অর্জুন গাছ মরে যাচ্ছে। ৫-৬টা অর্জুন গাছ ওই সময়ে মরে যেতে দেখেছি। বুঝতাম গাছগুলোকে খুন করা হচ্ছে। কিন্তু কী ভাবে বোঝা যাচ্ছিল না। এক দিন পুরসভার কনট্রোল রুমে ফোন করে খবরটা জানিয়েও ছিলাম। ওঁরাও বলেছিলেন দেখছি। কিন্তু দেখতে পারেননি। একই ভাবে ভিআইপি রোড, বিটি রোড, যশোর রোডের ধারেও বহু দিন ধরে অনেকেই দেখেছেন বহু গাছে মরে যাচ্ছে অজানা কারণে। তারপর অবধারিত ভাবেই দেখা যায় বেশ গুছিয়ে ট্রাকে চাপিয়ে ওই গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে। গাছের মৃত্যু চোখ খোলা রাখলে দেখতে পাবেন কলকাতার ব্রিগেড এলাকাতেও। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতেও দেখেছিলাম বিশাল রুদ্রপলাশ গাছটা মরে গেছে। চোখে পড়েছিল আরও কয়েকটা গাছের কঙ্কাল। এই মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক, বলতে পারব না। শহরের একটি অতি প্রাচীন গাছের মৃত্যু কেন হল? এর উত্তর কে দেবে জানা নেই! একটা কথা, হয়তো গুজব, চালু আছে বেশ কিছু কাল। বলা হয় গাছে গর্ত করে হিং ভরে দেয় খুনিরা। তাতেই গাছ ধীরে ধীরে মরে যায়। দু’এক জন বটানিস্টকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বলতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। সত্যি কোনও রাসায়নিক দিয়ে পরিকল্পিত ভাবে গাছ খুন করা হচ্ছে কী না! গাছ খুন করার জন্য সুপারি কিলারের অস্তিত্ব শহরে সত্যি আছে কী না!  বৃহত্তর কলকাতায় এখনই যেটা দরকার সেটা হল ওয়ার্ড ভিত্তিক গাছ শুমারি। গাছের নাম সহ ছবি দিয়ে এই গাছ গণনার রিপোর্ট ইন্টারনেটে আপলোড করা হোক। খোলা হোক একটি বিশেষ গাছ-কন্ট্রোল রুম, যা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। যেখানে গাছ কাটা সহ গাছের বিষয়ে যে কোনও অভিযোগ নাগরিকরা জানাতে পারবেন। এর সঙ্গে সরকার বিধানসভায় পেশ করে তার নির্দিষ্ট বৃক্ষরোপণনীতি ঘোষণা করুক। এবং নিয়মিত অডিট চালু হোক শহরের সবুজায়নের। সবুজ ধ্বংস হতেই থাকবে, আর বৃক্ষরোপণ দিবসে আমরা স্লোগান দিয়েই যাব একটি গাছ একটি প্রাণ, এ চলতে পারে না।

গাছেদের মনের কথা শুনতে পেতেন কবি বিনয় মজুমদার। তাই তিনি লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর পল্লবিত ব্যস্ত বনস্থালী/ দীর্ঘ  দীর্ঘ ক্লান্তশ্বাসে আলোড়িত করে;/ তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে/ চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা।'

শকুন্তলা যখন পতিগৃহে যাচ্ছেন, বিদায়ের অনুমতি চাইলেন মহর্ষি কণ্বের কাছে। মহর্ষি বললেন, অনুমতি তো দেবে গাছেরা। গাছদের কাছে অনুমতি চাইতে বললেন শকুন্তলাকে। গাছকে এই সম্মান আমরা কবে আবার ফিরিয়ে দিতে পারব?

ছবিঃ রাসেল রণি
 
 

Developed by DXDasia