
‘টার্নিং পয়েন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ঈশিতা সান্যালের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার
“দুরারোগ্য মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে পুনর্বাসন বা রিহ্যাবিলিটেশন। শুধু ওষুধ কখনও মূলস্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে না মানুষকে। বর্তমানে যদিও কলকাতা জুড়ে এমন বহু প্রতিষ্ঠান মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যারা সক্রিয়ভাবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে, তবু মানুষের মনে এখনও যথেষ্ট দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-স্টিগমা রয়েছে এই বিষয়ে।” মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলতে বলতে বঙ্গদর্শন-কে এমনটাই জানালেন ‘টার্নিং পয়েন্ট’ (Turning Point)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ঈশিতা সান্যাল (Ishita Sanyal)।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার বুকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও ডে-কেয়ারের কাজ করে চলেছে ‘টার্নিং পয়েন্ট’। বহু মানুষের জন্য ভরসা ও বিশ্বাসের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে তারা। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ২৫ বছর পূর্ণ হল এই প্রতিষ্ঠানটির। মাত্র তিনজনকে নিয়ে শুরু হয়েছিল যে অভিযান, আজ তা ছুঁয়ে গেছে হাজারও মানুষের জীবন। এই দীর্ঘ পঁচিশ বছরে ঠিক কতখানি বদলেছে আমাদের চারপাশের সমাজ? মানসিক স্বাস্থ্য (Mental Health) নিয়ে তখনকার মানুষের যা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা কি সত্যিই পাল্টেছে? “অবশ্যই পাল্টেছে!” – দৃঢ়কণ্ঠে বলেন ঈশিতা। বলেন, “যে সময়ে দাঁড়িয়ে টার্নিং পয়েন্ট শুরুর কথা ভেবেছিলাম আমরা, তখনও মেন্টাল হেলথ নিয়ে তেমন ভাবে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি মানুষের মধ্যে। সারা দেশ জুড়ে পেশেন্টকে হাসপাতালে ভর্তি করে ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা। এর সঙ্গে ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা হয়তো ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ডে-কেয়ারই প্রাধান্য পাবে, এমন কোনো সংস্থা ছিল না। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি কলকাতার (Kolkata) প্রথম ডে-কেয়ার সেন্টার।”

বছর ভর কলকাতা ও মফস্সলের বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে সচতেনতা শিবিরের ব্যবস্থা করে টার্নিং পয়েন্ট। থাকে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পোস্টার কম্পিটিশন ও ক্যুইজ। ঈশিতা বলেন, “অনেক সময়ই শিশুদের আচরণে অসংলগ্নতা ধরা পড়ে। হঠাৎ করে পরীক্ষায় খারাপ ফল হতে শুরু করে কিংবা মিথ্যে কথা বলার প্রবণতা দেখা যায় তাদের মধ্যে। বাবা মায়েরা তা লক্ষ্য করলেও সন্তানকে বোঝার বদলে তার উপর রাগ করেন। এর একমাত্র কারণ সচেতনতার অভাব।”

স্কুল কেন? ঈশিতা সান্যাল বিশ্বাস করেন, কেবল প্রাপ্তবয়স্করা নন। মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে জানা দরকার শিশুদেরও। “অনেক সময়ই যখন একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু (Special Child) স্কুলে ভর্তি হয়, দেখা যায় অন্য শিশুরা তার আচরণ নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছে। এর ফলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুটি তিলে তিলে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যা কালক্রমে তাকে ঠেলে দিতে পারে অনেক বড়ো বিপদের দিকে। যদি স্কুলে থাকতেই একটি শিশুকে শেখানো যায় যে ব্যঙ্গ নয়, বরং পাশে এসে দাঁড়ানোই শিক্ষার মূল পরিভাষা, তাহলে পিছিয়ে পড়া শিশুটির বিকাশে কোনো অন্তরায় থাকবে না। স্কুলে ক্যাম্পেন করবার সময় অভিভাবকদেরও উপস্থিত থাকতে বলি আমরা। তাঁরা নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হলে তবেই বুঝতে পারবেন, তাঁর সন্তানের কোনো মানসিক অসুবিধা হচ্ছে কিনা।”
টার্নিং পয়েন্ট-এর ২৫ বছর উপলক্ষে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বিশেষ বার্তা
পঁচিশ বছর আগের দৃশ্যপট একেবারেই আলাদা ছিল। যে সময় শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসাই পিছিয়ে রয়েছে অনেকখানি, সে সময় দাঁড়িয়ে এমন নজিরবিহীন একটির সংস্থা তৈরির ভাবনা এল কীভাবে? ঈশিতা জানাচ্ছেন তাঁর ভাইয়ের সিজোফ্রেনিয়া ধরা পড়েছিল হঠাৎই। সে সময় কলকাতার সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠান চষে ফেলেছিলেন তিনি। তখনই লক্ষ্য করেন, মেডিসিনের ব্যবস্থা থাকলেও যত্নের অভাব রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। “ট্রিটমেন্টের অর্থ তো কেবল ওষুধ নয়! কাউন্সেলিং বা পুনর্বাসনের গুরুত্ব যে ক্রনিক মেন্টাল ইলনেস সারানোর ক্ষেত্রে ঠিক কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা ব্যাখ্যার অতীত।” মনস্তত্বের ছাত্রী ঈশিতা বলে ওঠেন।

আগে মানসিক অসুস্থতা বিষয়ে গ্রহণযোগ্যতা একেবারেই ছিল না সাধারণ মানুষের মধ্যে। ঈশিতা সান্যালের জীবনেও সাহায্যের চাইতে বাধাই বেশি এসেছিল। তাঁদের সংস্থার জন্য ঘর ভাড়া দিতে চাননি অনেকেই। বলেছিলেন, শহরের বাইরে দূরে কোথাও জায়গা খুঁজে নিতে। অর্থনৈতিক সমস্যার থেকেও অনেক বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছিল সামাজিক সমস্যাগুলি। এমনকি প্রাণনাশের হুমকি অবধি পেয়েছিলেন তাঁরা।
আগে মানসিক অসুস্থতা বিষয়ে গ্রহণযোগ্যতা একেবারেই ছিল না সাধারণ মানুষের মধ্যে। ঈশিতা সান্যালের জীবনেও সাহায্যের চাইতে বাধাই বেশি এসেছিল। তাঁদের সংস্থার জন্য ঘর ভাড়া দিতে চাননি অনেকেই।
টার্নিং পয়েন্ট প্রত্যেকটি মানুষকে সমান গুরুত্ব দিতে চেষ্টা করে। যাঁরা একসময় এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সমাজের মূলস্রোতে ফিরে গেছেন সফলভাবে, তাঁদের অধিকাংশই প্রশংসা করেন এখানকার ব্যবস্থাপনার। যেমন সুজাতা দাস বলেন, “আত্মবিশ্বাসহীনতা, হতাশা কিংবা ডিপ্রেশন ছাড়াও চূড়ান্ত পরিমাণে আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল আমার মধ্যে। টার্নিং পয়েন্টে এসে আমি জীবনকে ভালোবাসতে শিখেছি। ঈশিতাদি’র কাউন্সেলিং সেশনগুলি আমার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করেছে।” অন্যদিকে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত বলেন, “মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ করতে না পারায় চরম হতাশায় ডুবে গেছিলাম। দেখতাম বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়েরা কত সফল জীবনযাপন করছে। তবে টার্নিং পয়েন্ট আমার জীবন সম্পূর্ণরূপে বদলে যায়। এখানে আমি শিখেছি হঠাৎ আসা রাগ বা বিরক্তি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।”
এক্সপেরিমেন্ট হিসাবেই শুরু হয়েছিল টার্নিং পয়েন্টের পথ চলা। আজ ভারতের বাইরেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে গেছে তাদের ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলি। হাজার বাধা বিপত্তির মাঝেও জনসাধারণের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে আগের চেয়ে। অনেক বাবা মা-ই আজ বোঝেন যে সন্তানের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নজর রাখা ঠিক কতখানি দরকারি। এই মুহূর্তে ২৫ জন এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাধীন। এখনও বহুদূর পথ পাড়ি দিতে হবে ঈশিতা সান্যাল এবং তাঁর সংস্থাটিকে। ২৫ বছরের টার্নিং পয়েন্টের হাত ধরে পরিবর্তন আসবে নিশ্চিত, যারা সমাজের চোখে আপাতভাবে দলছুট।
____
টার্নিং পয়েন্ট-এর ঠিকানা: ৯/২৯, যাদবপুর সেন্ট্রাল রোড, বিধানপল্লি, যাদবপুর, কলকাতা ৭০০ ০৩২
