
স্বরলিপি রচনায় বাংলায় পথিকৃৎ ছিলেন তিনিই
একটি ঘরানার স্রষ্টারা অন্য স্রষ্টাদের থেকে যেমন সঙ্গীতের সূত্র গ্রহণ করবেন আবার একই ভাবে নিজেরাও সঙ্গীতের সূত্র তৈরি করবেন। এটাই একটি ঘরানার নিজস্ব অবয়ব গঠনের মূল পন্থা। এখন প্রশ্ন হল, এমন ঘটনা কি বিষ্ণুপুরে ঘটেছিল? আমাদের ক্ষেত্র সমীক্ষা উত্তরের অনুসন্ধান করে যা পেল তা এরকম – “আমাদের সময়ের সঙ্গীত শিল্পের এমন একজন পারদর্শী জন্মগ্রহণ করেছেন যাকে এই শিল্পের নায়ক বলা যায়। ইতিপূর্বে যখন একবার আমার কলকাতায় আসার সুযোগ হয়েছিল, তখন আমি তাঁর কথা শুনেছিলুম যে তিনি সঙ্গীত বিষয়ে এমন একখানি সুন্দর পুস্তক রচনা করেছেন যেরকম গ্রন্থ এই শিল্প সম্পর্কিত রচনায় ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। সে কথা শুনে আমি ক্ষেত্রমোহন গোস্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলুম এবং তাঁর সঙ্গে কলকাতায় দেখা হয়েছিল। আমি অসঙ্কোচে বলতে পারি যে সঙ্গীত বিষয়ে এই গ্রন্থখানি একটি অনন্য রচনা। এই শিল্পের সূত্রাবলী ও নিয়মাবলী এতে নিপুণ ও বিস্তৃত ভাবে আলোচিত হয়েছে। সেগুলি মিয়াঁ তানসেনের সংজ্ঞা ও সূত্রাবলীর ভিত্তিতে রচিত। শুধু তাই নয় সুপণ্ডিত গ্রন্থকার নিজে কতগুলি সঠিক ও উপযোগী সূত্র আবিস্কার করেছেন। আমার আশা আছে সেগুলি স্থায়িত্ব লাভ করবে এবং এই গ্রন্থের মনোযোগী পাঠকবৃন্দ এ বিষয় পারদর্শী হতে পারবেন’।
এই কথাগুলির প্রসঙ্গ ধরে কতগুলি সিদ্ধান্তে আসা যায়। প্রথমত যে গ্রন্থের বিষয়ে এই কথা সেই গ্রন্থের নাম ‘সঙ্গীতসার’। যিনি আলোচক তিনি হলেন তানসেনের পুত্র বংশীয় বাসৎ খাঁ। তাঁর মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাসৎ খাঁ ক্ষেত্রমোহনের সূত্র আবিষ্কারের কথা যেমন বলছেন আবার একই সাথে তাঁকে সম্মান দিচ্ছেন ‘সঙ্গীত নায়ক’ হিসেবে। এই উপাধিটা গুরুত্বের দাবিদার। কারণ ভারতীয় সঙ্গীতের যাঁরা শাস্ত্রবিদ, তাঁরা সঙ্গীত বলতে তিনটি অঙ্গের কথা বলে থাকেন। এই তিনটি অঙ্গ হল গীত, বাদ্য ও নৃত্য। এই তিন বিভাগের তত্ত্ব ও ক্রিয়াংশ যাঁরা খুব ভালোভাবে জানেন ও বোঝেন তাঁদেরই একমাত্র সঙ্গীত নায়ক বলা হত। তালিকা অনুসারে দেখা যাচ্ছে যে বিষ্ণুপুর ঘরে এই বিরল উপাধির অধিকার মাত্র দুজনের যথা ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী ও গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষেত্রমোহন কথক বংশের সন্তান ছিলেন। মল্লভূমের মেদিনীপুর অঞ্চলের দাঁতনায় তাঁর জন্ম। তিনিও সঙ্গীত শিক্ষা করেছিলেন রামশঙ্কর ভট্টাচার্যের কাছে। অল্প বয়সেই তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এবং ঠাকুরবাড়ির মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ক্ষেত্রমোহনকে তাঁর সভা গায়ক নিযুক্ত করেন।
এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় বেনারসের বীণকার লক্ষ্মীপ্রসাদ মিশ্রের সঙ্গে। এবং ক্ষেত্রমোহন তাঁর কাছে যন্ত্র শিক্ষা নিতে থাকেন। ধীরে ধীরে তিনি সেতার, বেহালা বাদনে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এর পরেই তিনি এসরাজ শিক্ষা সম্পর্কে বাংলা ভাষায় বই লেখেন। আমাদের মনে রাখা দরকার যে নব জাগরণের একটা প্রধান চরিত্র হল আত্মচেতনা আত্ম আবিষ্কার ও গবেষণা এই সবগুলি দিকেরই পরিচয় আমরা লক্ষ্য করছি বিষ্ণুপুর ঘরে, একেবারে বাংলা ভাষায়। এই তথ্য আমাদের নির্দ্বিধায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করে যে, বিষ্ণুপুর ঘরানা বাংলার একমাত্র নিজস্ব ঘরানা।
এখন ‘সঙ্গীতসার’ বইটি সম্পর্কে কিছু কথা। এই বইটি লেখার প্রেক্ষাপটটি ঐতিহাসিক গুরুত্বের দাবিদার। আসলে ভারতে রাগের বিভিন্ন জাতি, ঠাঁট, রূপ, এই বিষয়গুলি নিয়ে বিভিন্ন ঘরে নানা রকম মতভেদ রয়েছে। এর ফলে রাগবিদ্যা নিয়ে ও সঙ্গীতের আসরে নানা রকমের কলহ দেখা যেত। সঙ্গীতের স্বচ্ছন্দ বিকাশ ও সাবলীলতা আনতে গেলে এই বিবাদের একটা মীমাংসা দরকার ছিল। এই কথা চিন্তা করেই লক্ষ্মীপ্রসাদ মিশ্র ও ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী ১৮৬৭ সালে কলকাতায় একটি বড় মাপের সঙ্গীতের সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে বহু সঙ্গীত গুণী যোগ দেন। সেই সময় ভারতে এই উদ্যোগটিই ছিল প্রথম। সেখানে সকলের মতের সমন্বয় করে এই গ্রন্থ লিখে ছিলেন ক্ষেত্রমোহন। তাঁকে স্বরলিপি রচনারও বাংলায় প্রথম পথিকৃৎ বিবেচনা করা হয়। ১৮৬৮ সালে প্রকাশ পায় তাঁর ঐকতানিক স্বরলিপি। এর আগে ১৮৬৭ সালে কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বরলিপির গ্রন্থ প্রকাশ পেলেও ক্ষেত্রমোহনকে স্বরলিপি রচনাকারের পথিকৃৎ বলা হয় কারণ এরও প্রায় দশ বছর আগেই মানে ১৮৫৮ সালে বেলগাছিয়া নাট্যশালায় প্রথম নাটক রত্নাবলী যখন অভিনীত হয় তখন সেই নাটকের জন্য ক্ষেত্রমোহন প্রথম ভারতীয় ঐকতান বাদন প্রবর্তন করলেন। এটাই ভারতের প্রথম অর্কেস্ট্রা বাদনের আয়োজন। তার জন্যও তিনি যে স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন সেগুলিই বই হয়ে পরে প্রকাশ পেয়েছিল। আর নাট্যশালার বাদকরা ক্ষেত্রমোহনের সেই স্বরলিপি দেখে দেখে কনসার্ট বাজাতেন। পাইকপাড়ার রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ছিলেন এই বেলগাছিয়া নাট্যশালার প্রাণপুরুষ। ১৮৬১ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনাবসানের পরে নাট্যশালা বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় মহারাজা যতীন্দ্রমোহন পাথুরিয়াঘাটা বঙ্গ নাট্যালয় তৈরি করলেন। সেখানেও যোগ দিয়েছিলেন ক্ষেত্রমোহন। লোকে সেখানে নিয়মিত ঐকতান বাদন শুনতে যেত। অর্থাৎ একটা ঘরানা তখনই নিজের অস্তিত্বকে সকলের থেকে আলাদা করতে পারে যখন তার পরীক্ষানিরীক্ষা সঙ্গীতের চর্চার নানা দিকে বিস্তার লাভ করতে পারে।
সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্যগুলি আমাদের সেই ইঙ্গিত পেতে সহায়তা করছে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ক্ষেত্রমোহন শুধু গান গাইতেন বা শেখাতেনই না, তিনি ছিলেন বহু গানের রচয়িতা। তাঁর গানের বহু ছক ভেঙে গান তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যেমন তাঁর লেখা ‘তেরো রি নয়ন বাণ’ গানটির ছকেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘তোমার মধুর রূপে’। এ ছাড়া ক্ষেত্রমোহনের গানে মহারাজ যতীন্দ্রমোহন এবং কুইন ভিক্টোরিয়ার প্রশস্তি পাওয়া যায়। যেমন ‘সকল জনগণপালিনী নরদেব সম্পদদায়িনী/ কুইন ভিক্টরিয়া মহারাজ্ঞী বিবিধ রিপু-ভয় হারিণী’ ইত্যাদি। একজন ঘরানার শিল্পী যদি মনে করেন যে ঘরানার নিজস্ব অবয়ব তৈরি করা দরকার তবে তিনি বা তাঁরা সকলেই সেই ঘরানার বিশিষ্টতা অর্জনের জন্য সঙ্গীত গবেষণাকে নিয়ে ভাববেন এমনটাই দরকার। যা শুরু করেছিলেন ক্ষেত্রমোহন। ১৮৬৮ থেকে ১৮৮৫-র মধ্যে তাঁর পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশ পায়। এগুলি হল ঐকতানিক স্বরলিপি, সঙ্গীতসার, গীতগোবিন্দের স্বরলিপি, কণ্ঠকৌমুদী ও আশুরঞ্জনী তত্ত্ব। এর মধ্যে আশুরঞ্জনী তত্ত্ব গ্রন্থটি হল বাংলা ভাষায় এসরাজ শিক্ষার আদি গ্রন্থ।
