
ভোটের দিকে তাকিয়ে বিভাজন করতে তালাক নিয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।
শুভাশিস মৈত্র– আপনার সাথে আগে একবার কথা হয়েছিল- মানে রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতি, তাদের পক্ষ থেকে আপনি বলেছিলেন আপনাদের আন্দোলনের কথা। এখন দেখা যাচ্ছে যে সারা দেশ জুড়ে তালাক নিয়ে একটা আলোচনা চলছে এবং আমাদের রাজ্যের শাসক দল এবং পার্সোনাল ল বোর্ডের লোকজন আরও অনেকে তালাকের সমর্থনে কথা বলছেন। কয়কজন মন্ত্রীও বলেছেন। তো এইটাকে আপনি বা আপনারা কীভাবে দেখছেন?
খাদিজাবানু– আমরা আসলে যে কথাটা বলতে চাইছি সেটা হচ্ছে যে মানে, একটা হচ্ছে যে বিজেপি যে ভাবে বিষয়টাকে নিয়ে এল, যে পদ্ধতিতে হঠাৎ করে নিয়ে এল সেটাতে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এটা কিন্তু সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে, আসলে বিভাজন সৃষ্টি করতে আরও সাহায্য করছে, এটা আমরা মনে করি। এখন ওরা বলছেন মুসলিম নারীদের নিরাপত্তা, মর্যাদার কথা –এই যে কথাগুলো ওঁরা বলছেন, বলার মধ্যে আমাদের আপত্তি নেই, কিন্তু এই যে বারবার করে মুসলিম নারীদের কথা আপনারা বলছেন, তো সেখানে আমাদের কথা হচ্ছে এটাই, যে তারা তো মুসলিম নারীদের সম্মান রক্ষা করতে পারেননি গুজরাটে। এ কথা আমাদের এখনও মনে আছে,কেন না ২০০২ সালে গুজরাটে দাঙ্গাবাজরা গর্ভবতী মায়েদের খুন করে। মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়। আবার দেখলাম, গোরুর মাংস রেখেছে এই সন্দেহে একটি মেয়েকে রাস্তায় অপমানিত করল, একটা খুন হল। এখন তারা ই দেখছি মুসলমান নারীদের সম্মানের কথাটা হঠাৎ করে তুলছেন। এটা নিয়েই আমাদের কথা। মানে প্লেসিং ইজ নট গুড। এর মধ্যে যেন একটা বিভাজন সৃষ্টি হচ্ছে বলে আমরা নিজেরা মনে করছি। যে পদ্ধতিতে ওনারা তুলছেন তার ফলে হল কী দেখুন, আপনি আশ্চর্য হবেন, ভেবে দেখুন এর ফলে হঠাৎ করে কিন্তু মৌলবাদিরা একেবারে যেন কোথা থেকে উঠে এল এবং তারা চাঙ্গা হয়ে গেল। ছিল এই মৌলবাদ। এটা আমরা লক্ষ্য করছি।
শুভাশিস মৈত্র– বুঝতে পেরেছি।
খাদিজাবানু– এখন- তৃণমূল যেটা করল, তৃণমূল যে সমর্থন করল এটা কিন্তু তারা করল অন্য দলগুলোর মতো ভোটের কথা ভেবে। কেন না কিছুদিন আগেও মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন তালাক প্রথাটা বন্ধ হবে। তিনি এর বিরুদ্ধে ছিলেন।
শুভাশিস মৈত্র– বলেছিলেন?
খাদিজাবানু– হ্যাঁ, উনি বলেছিলেন। বলেছিলেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে।
যেটা গোটা পৃথিবীর ২২টা দেশ বন্ধ করে দিয়েছে। পাকিস্তান বাংলাদেশ তুরস্ক ইয়েমেন বিভিন্ন মুসলিম দেশে বন্ধ করে দিয়েছে। আর ভারতবর্ষে কিন্তু এই জিনিসটাকে সব রকম সরকারের পক্ষ থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। বিজেপি যে এখন তুলেছে সামনে পাঁচটা রাজ্যের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে। এর মধ্যে দিয়ে তারা মুসলিম শিক্ষিত মেয়েদের সমর্থন চায়, এই অভিসন্ধিতে।
শুভাশিস মৈত্র– আপনি বলছন, কেন্দ্রীয় সরকারের এটা কোনও ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান নয়?
খাদিজাবানু– আমরা লক্ষ্য করছি, সমস্ত দল, পুজোর প্যাণ্ডেলগুলোতে পুরস্কার দিচ্ছে, পুজো উদ্বোধন করছে, ইফতার করছে। মুসলিমদের রোজার সময়ে সব দলের নেতারা ইফতার করতে শুরু করছে। ধর্মটাকে উস্কানি দেওয়া, এটা তো ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কাজ নয়। ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত। অবশ্যই প্রত্যেকের নিজের মতো করে তাঁর ধর্ম পালন করার অধিকার আছে। কিন্তু সেটাকে উস্কিয়ে দিয়ে শক্তিশালী করাটা রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। আমরা লক্ষ্য করছি হচ্ছে সেটাই। নেতা-মন্ত্রীরাও যেটা করছে সেটা কিন্তু ভাল হচ্ছে না, নিরপেক্ষতাটা থাকছে না।
শুভাশিস মৈত্র– আর এই যে একটা গুজরাটে একটি সংগঠন যারা বলছে ব্যক্তিগত আইন নয় কোরান অনু্যায়ী চলতে হবে। এটাও তো একটা মত আছে…
খাদিজাবানু– ও…এটা তো মুসলিম আন্দোলন BMM … এই রকম একটা কী যেন নাম। ওটা হচ্ছে ওই মুসলিম …কী নামটা ভুলে গেলাম .. BMM বোধহয়, ওরা তো সংবিধান নয়, ধর্মটাকেই রক্ষা করতে চাইছে।
শুভাশিস মৈত্র– সেটা সম্পর্কে আপনাদের কী মত?
খাদিজাবানু– আমাদের বক্তব্য হচ্ছে যে এখানে ধর্ম হচ্ছে, যার যার ধর্ম তিনি করবেন, তার ব্যক্তিগত ব্যপার। ফলে ভারতবর্ষ যেহেতু সেকুলার স্টেট, এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করতে হবে সর্বক্ষেত্রে, সমস্ত আইনের ক্ষেত্রে সব সময়ে। সেখানে যারা ধর্মকে রেখে এসব করতে চায়,- এটার দ্বারা কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা হবে না। কেন বলছি ধরুন- শুধু তালাকের প্রশ্ন না, ব্যক্তিগত আইনে আছে যদি কোনও দুর্ঘটনায় স্বামী মারা যায় আর শ্বশুরমশাই জীবিত থাকেন, সেই গৃহবধূকে তার সন্তানদের নিয়ে তক্ষণাৎ সেই বাড়ি থেকে বিতারিত হতে হয়। এটা তালাকের চেয়েও খারাপ। এটা ব্যক্তিগত আইন।
শুভাশিস মৈত্র– এটা কী হতেই হবে!!
খাদিজাবানু– এটা মুসলিম ব্যক্তিগত আইন, কেউ মানবিকতার জন্য রাখে- কিন্তু সেটা খুব রেয়ার। এইগুলো তো হচ্ছে খুব অমানবিক ব্যপার। যে ধর্মেই থাক।
শুভাশিস মৈত্র– এটা কী কোরান অনুমোদন করে? আমি জানিনা অবশ্য। জানতে চাইছি আপনার কাছে।
খাদিজাবানু- হজরত মহম্মদ যা বলেছেন তার ভিত্তিতেই কোরান ও হাদিসে হবে এটাও নয়, সমস্যা হচ্ছে এটাই। দীর্ঘ বছর শত শত বছর ধরে যারা যেমন ক্ষমতায় থেকেছেন তারা তাদের মত করে ধর্মের ব্যাখ্যা তৈরি করেছেন। আমাদের বক্তব্য, আমরা তো সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি-এগিয়ে যাচ্ছি তো আমরা। এবং আধুনিক যে প্রযুক্তিবিজ্ঞান সেখানে ইন্টারনেট হোক সেখানে মোবাইল হোক আরও সমস্ত আধুনিক প্রযুক্তিবিজ্ঞান এই বিজ্ঞান তো আমরা ভোগ করছি- উপভোগ করছি। মৌলবাদিরাও তো ভোগ করছে বিজ্ঞান কে। তাহলে যে আইন প্রয়োগ করলে মেয়েদের জীবনের নিরাপত্তা থাকবে না, সেটা এখানে প্রয়োগ করে ধর্মের কথা বলা হচ্ছে কেন? একটা কথা বলি। ধর্মে একটা কথা আছে জানেন- হাদিস এও, ‘সুদ খাওয়া হারাম।’ ভারতে এখন সব Banking System য়ে মৌলবাদিরাও সুদ নেয়, Bank থেকে। নেয় কিনা বলুন?
শুভাশিস মৈত্র– ব্যাঙ্ক দেয় তো বটেই। নিতে তো হবেই।
খাদিজাবানু– সারা ভারবর্ষেই নেয়। তাহলে ব্যক্তিগত আইনের কিন্তু আপনার পরিবর্তন হয়ে গেল। পরিবর্তন হল না?
শুভাশিস মৈত্র– হ্যা, তা হল।
খাদিজাবানু- তাহলে এই যে ব্যক্তিগত আইনের যে পরিবর্তন হল তখন চুপ। আর মেয়েদের প্রসঙ্গ এলে বলা হচ্ছে ধর্মের উপর আঘাত। এই যে ধরুন যেটা আমাদের দেশে Criminal আইন; সকলের জন্য একই আইন হয়েছে, ইসলামিক আইনে আগে তো হাত-পা কেটে দেওয়ার বিধান ছিল। ভারতীয় দণ্ডবিধি তো এখন সবার জন্য সমান। Social Marriage Registration Act –অনিচ্ছুক ছিল মুসলিমরা প্রথমে।পরে মেনে নেয়। হিন্দু-মুসলিম বিবাহ মেনে নেয়নি? ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তন তো হয়েছে। কিন্তু তালাকের প্রশ্নে এখানে ভারবর্ষে স্বার্থান্বেষীরা কেন বলছে ধর্মের উপর আঘাত? তারা তো সুদ ইত্যাদি অন্য সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন- মৌলবাদীরা। আধুনিক প্রযুক্তির সমস্ত সুয়োগ সুবিধা ভোগ করছেন। সুধু মেয়েদের আইনের ক্ষেত্রে বলছে যে ধর্মের উপর আঘাত।
শুভাশিস মৈত্র– আচ্ছা। আপনার কি মত? যদি মুসলিম মহিলাদের একটা মত নেওয়া হয়, ভোট নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে আপনার কি ধারণা? কি রকম রেজাল্ট আসবে। গোপন ব্যালেটে?
খাদিজাবানু– আমরা তো শত শত মেয়েদের নিয়ে কাজ করছি তাদের অনেক সময় হাত তুলে জিজ্ঞাসা করেছি। এবং তাদের কে বলেছি তোমরা কি চাও। তারা একেবারে চিৎকার করে বলেছে, তালাক বন্ধ হোক।
