প্রাকৃতিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে কাগজ তৈরি করছেন কলাভবনের প্রাক্তনী রুমা চৌধুরী

শান্তিনিকেতনে রুমা চৌধুরীর সংস্থা পেপার নেস্ট

মানুষের লেখাপড়া, জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে কাগজ আর কাগজ উদ্ভাবনের ইতিহাস। কাগজ না থাকলে থাকতো না বই, চিত্রকলা। সময়ের গর্ভে হারিয়ে যেতো কবিতা, গল্প, সাহিত্যকীর্তি, ছবি, বিজ্ঞানের সূত্র। কাগজ তার নিজের বুকে ধরে রাখে মানুষের কল্পনা আর বোধসঞ্জাত কৃষ্টিকে। একজনের কাজ পৌঁছে দেয় অন্যের কাছে। ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাচীন মিশরীয়দের হাতে তৈরি প্যাপিরাসের মাধ্যমে শুরু হয়ে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ইউরোপীয় পার্চমেন্ট কাগজ, প্রাচীন চিনের গানসু প্রদেশ, আরব, ভারতীয় উপমাহাদেশ, শিল্পবিপ্লবের সময় জার্মানিতে গুটেনবার্গের ছাপাখানা, তারপর পেপার মিলের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কারণে কাগজ তৈরি। কাগজের যাত্রাপথ অতি দীর্ঘ। এখনকার ডিজিটাল যুগের ই-বুকের দাপটেও কমেনি ছাপানো কাগজের চাহিদা। কিন্তু সেসব কাগজের বেশিরভাগই তৈরি হয় পেপার মিলে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই বাংলাতে হাতে বানানো কাগজকে বাঁচিয়ে রেখেছেন শান্তিনিকেতনের চিত্রশিল্পী রুমা চৌধুরী (Ruma Choudhury)। তাঁর সংস্থা পেপার নেস্ট-এর (Paper Nest) মাধ্যমে। বিশ্বভারতীর কলাভবনের প্রাক্তণ ছাত্রী তিনি। ২০১৯ সালে তৈরি করেন শান্তিনিকেতনের পেপার নেস্ট সংস্থাটি।

বঙ্গদর্শন.কম-কে আলাপচারিতায় রুমা চৌধুরী জানান, বিশ্বভারতীতে তাঁদের পাঠক্রমে শেখানো হত হ্যান্ডমেড কাগজ তৈরির কৌশল। সেখান থেকেই হ্যান্ডমেড কাগজ তৈরির ব্যাপারে আগ্রহ বাড়ে। তিনি জানান, “আমি ব্যাক্তিগতভাবে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করতে পারি। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে সম্পর্ক, সেটা আমাকে খুবই আকর্ষণ করে। একদিকে মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, অন্যদিকে সেই মানুষই প্রকৃতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। আমরা প্রকৃতিকে ‘মা’ বলে ডাকি। এই সার্বিক যোগাযোগ, প্রকৃতি-মানুষ সম্বন্ধই আমার কাজের অনুপ্রেরণা”। রুমার কথায়, তিনি প্রকৃতির মধ্যে মানুষকে আর মানুষের মধ্যে প্রকৃতিকে খুঁজে পান। শান্তিনিকেতনের প্রকৃতিও তাঁর মনোজগৎকে প্রসারিত করেছে, দিশা পেয়েছে তাঁর বোধ।

“কোনও কাগজ মসৃণ, কোনওটা খসখসে, সবার আকার, চরিত্র আলাদা। রং আলাদা। যাঁরা হ্যান্ডমেড কাগজে কাজ করেন, এই বিবিধতাই তাঁদের শিল্পীমনে একটা আলাদা স্বাধীনতার জন্ম দেয়। যেন কাগজের চরিত্রই শিল্পীসত্ত্বাকে খানিক চালনা করে। কাগজের চরিত্র আর শিল্পীর শিল্পকর্ম মিলে শিল্প পূর্ণতা পায়।”

কিন্তু প্রকৃতিকে অনুভব করার জন্য হ্যান্ডমেড কাগজ তৈরিকেই কেন বেছে নিলেন তিনি? উত্তরে তিনি বলেন, “হাত দিয়েই তো প্রথম কাগজ তৈরি শুরু হয়েছিল। এখন কারখানাতে কাগজ তৈরি হয়। কিন্তু হ্যান্ডমেড কাগজের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা এই ধরনের কাগজকে আলাদা করে দেয়। সরাসরি প্রাকৃতিক বর্জ্য থেকে কাগজ তৈরি করলে মনে হয় প্রকৃতিকেই যেন নিজের কাজে প্রতিফলিত করে তুলছি।” ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছ, কেটে ফেলা গাছ, ঘাস, খড় সবকিছু থেকেই কাগজ তৈরির রসদ সংগ্রহ করেন তিনি। বলেন, “মানুষ মারা গেলে আমরা তাঁর স্মৃতিচিহ্ন সযত্নে রেখে দিই। তেমনই প্রকৃতির যা কিছু মৃত, সেগুলো থেকে কাগজ বানিয়ে আমি তাদের ছাপ যেন রেখে দিই কাগজগুলোর মধ্যে।”

 

প্রথমে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন রুমা। ঘাস, খড়, আখ ইত্যাদি। তারপর সেগুলিকে ভালোভাবে ধুয়ে ফোটানো হয়। ফোটানোর সময় উপাদানগুলিকে অ্যাসিডমুক্ত করার জন্য কিছু কেমিক্যাল মেশানো হয়। তবে রুমা চৌধুরী চেষ্টা করেন কেমিক্যাল ব্যবহার না করে বিভিন্ন ছাই, ডাস্টের মাধ্যমে এই কাজ করতে। সব ফাইবারের স্ফুটনাঙ্ক আলাদা, তাই বিভিন্ন ফাইবারকে ফোটাতে আলাদা আলাদা সময় লাগে। ফোটানোর পর ফাইবারগুলোকে খুব ভালোভাবে ধুতে হয়। তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নদীর জলে বা জমিয়ে রাখা বৃষ্টির জলে ফাইবার ধোয়ার কাজটি করেন। তারপর ফাইবারগুলিকে পেষণ করে মণ্ড তৈরি করা হয়। সেই মণ্ডের সঙ্গে জল মিশিয়ে ছাঁচে ফেলা হয়। ছাঁচগুলি বিভিন্ন জ্যামিতিক আকারের- বৃত্ত, আয়তাকার, ত্রিভুজাকৃতি ইত্যাদি। মণ্ড আর জলের মিশ্রণকে ছাঁচ থেকে তুলে রোদে শুকোলেই তৈরি হয়ে যায় কাগজ। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছু ক্ষেত্রে ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগে, কোনও ক্ষেত্রে একদিন, আবার কোনও ক্ষেত্রে ১-২ মাস। রুমা চৌধুরী বলেন, “কাগজের ফাইবারগুলিই একে অপরকে ধরে রাখে। আমি কোনও আঠাজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করি না।” ফাইবারগুলি কোনও বাহ্যিক উপাদান ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে জুড়ে থাকে, এর মধ্যে দিয়ে মানুষের একে অপরের সঙ্গে জুড়ে থাকার ছবি খুঁজে পান তিনি। কোনও প্রাকৃতিক উপাদান, একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ অন্য একটা জিনিসে রূপান্তরিত হচ্ছে, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে থাকছে মূল উপাদানের গুণ, এটা রুমাকে একইসঙ্গে বিস্মিত আর উদ্দীপ্ত করে।

তাঁর কথায়, হ্যান্ডমেড কাগজের মধ্যে যে স্বকীয়তা আছে, তা কারখানায় তৈরি কাগজ-এর মধ্যে পাওয়া যাবে না। তাঁর কথায়, “কোনও কাগজ মসৃণ, কোনওটা খসখসে, সবার আকার, চরিত্র আলাদা। রং আলাদা। যাঁরা হ্যান্ডমেড কাগজে কাজ করেন, এই বিবিধতাই তাঁদের শিল্পীমনে একটা আলাদা স্বাধীনতার জন্ম দেয়। যেন কাগজের চরিত্রই শিল্পীসত্ত্বাকে খানিক চালনা করে। কাগজের চরিত্র আর শিল্পীর শিল্পকর্ম মিলে শিল্প পূর্ণতা পায়।” তাঁর এই কাজ ছুঁয়ে গেছে এলাকার স্কুল পড়ুয়াদেরও। তারাও তাঁর কাজ দেখতে, শিখতে নিয়মিত আসে। আর আসেন বিভিন্ন শিল্পী, শিল্পমনস্ক মানুষেরা। একজন প্রখ্যাত ডাক্তার ব্যক্তিগত জীবনে কবিতাচর্চা করেন, কবিতা লেখেন। তিনি রুমার কাছে কাগজ বানানো শিখেছেন, এই ভাবনা থেকে যে, নিজের বানানো কাগজে কবিতা লিখবেন। মুম্বইয়ের একজন বিজ্ঞানী পেপার নেস্টে এসে কাগজ বানানো শিখে যান। সারাবছরের কাজকর্মের পরে এটা তাঁদের কাছে একটা মানসিক স্বাধীনতা বলে দাবি করলেন রুমা। তিনি কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ডেমনস্ট্রেশন দিয়েছেন, অনলাইনেও ওয়ার্কশপ করান। শিল্পী শ্রীকান্ত পালের সঙ্গে পাভলভ হাসপাতালে পেপার ম্যাশের ওয়ার্কশপ করিয়েছেন। সেখানে তাঁরা শিখিয়েছিলেন ফেলে দেওয়া কাগজ থেকে ভাস্কর্য তৈরির পদ্ধতি। কলকাতা সেন্টার অফ ক্রিয়েটিভিটিতে হ্যান্ডমেড কাগজ তৈরির ডেমনস্ট্রেশন দিয়েছিলেন। কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করিয়েছেন। কাজ করেছেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কেএস রাধাকৃষ্ণনের সঙ্গেও।

“আমি জানি হ্যান্ডমেড কাগজ হয়তো বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। এই কাগজ সাধারণত শিল্পীরাই ব্যবহার করেন। নিজের হাতে কোনও জিনিস বানানোর সঙ্গে যে আনন্দ, আবেগ জুড়ে আছে, সেটাই প্রতিফলিত হয় আমাদের কাজে। সেটাই শিল্পীদেরও উদ্বুদ্ধ করে পেপার নেস্টের সঙ্গে কাজ করতে, এখানে এসে হ্যান্ডমেড কাগজ বানানোর কাজে যুক্ত হতে,” জানান তিনি। রুমা চৌধুরী একজন চিত্রশিল্পী। তাঁর আঁকা ছবি প্রদর্শিত হয় বিভিন্ন আর্ট গ্যালারিতে। প্রাকৃতিক উপাদান থেকে বিভিন্ন রং তৈরি করেন। তাঁর কথায়, “আমি চাই নিজের তৈরি করা কাগজে, নিজের তৈরি রং দিয়ে ছবি আঁকতে। তার সঙ্গে চাই, আমার এই ভাবনা বাকিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ুক। আমার তৈরি কাগজ কাজে লাগুক অন্যান্য শিল্পীদেরও।”

_______________
শিল্পী রুমা চৌধুরীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি লিখিত হয়েছে। বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৌমিক দাস।

Developed by DXDasia