সন্তেশ্বর রাভা- চিলাপাতা জঙ্গল বাঁচানোর মূল কান্ডারি

জঙ্গল কাটলে নেক্সট জেনারেশনের কী হবে? গাছেরও প্রাণ আছে তো। বিবেক থেকে ছেড়ে দিলাম

সন্তেশ্বর রাভা ওরফে সন্তেকে জলপাইগুড়ি জেলার চিলাপাতা রেঞ্জ, কোচবিহার ফরেস্ট ডিভিশনের ত্রাস হিসাবে মানা হত।  কুরমাই রাভাবস্তির বাসিন্দা সন্তে। নির্বিবাদে গাছ কাটত। ওদের একটা দলও ছিল সাত-আটজনের। বড় বড় শাল-জারুল-টিক করাত আর কুড়ুল দিয়ে কেটে ফালা ফালা করে দিত। ওদের দলকে ভয় পেত বনকর্মীরা।

দশজনের সংসারে এভাবেই রোজগার করতে নেমেছিল সন্তে। ১৬ বছরে বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর। চোখের সামনে সে দেখতে পেয়েছিল বন কেটে বেআইনি রোজগারের কাল শুরু হয়ে গিয়েছে। মেয়েরা খড়ি কাঠ আনতে গেলে দই-চিড়া নিয়ে আসার আবদার করত বনকর্মীরা। তার পর পয়সা চাওয়া শুরু। শেষে রাস্তায় গামছা পেতে তোলা আদায় শুরু হল। সন্তে ঠিক করল সে গাছ কাটবে। নির্বিবাদে শুরু হল গাছ কাটা। বনকর্মীরা সন্তের দলের কাছে পয়সা চাইবে কী নিজেরাই ভয়ে সন্ত্রস্ত। শেষে আদেশ হল, বনে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই যেন গুলি করা হয়। চার-চারবার ছড়রা বন্দুকের গুলি ওর শরীরে ঢুকেছে।

এই সন্তে রাভাই একদিন হয়ে উঠল চিলাপাতা জঙ্গল বাঁচানোর মূল কান্ডারি।

শিলিগুড়ি থেকে চিলাপাতায় আসা বিজয় দেবনাথের  বোঝানোতে সন্তে বুঝতে পারল জঙ্গল কাটা মানুষ ও প্রকৃতির ক্ষতি করে। এই বোধোদয় থেকেই সন্তের জঙ্গল বাঁচানোর জীবন। সন্তের কথায়, ‘জঙ্গল কাটলে নেক্সট জেনারেশনের কী হবে? গাছেরও প্রাণ আছে তো। গাছের সঙ্গে অক্সিজেনের কানেকশন আছে। শ্বাস নিতে পারব না। জল থাকবে না। জমিন শুকিয়ে যাবে। বিবেক থেকে ছেড়ে দিলাম’।

সৌমিত্র ঘোষ, বিজয় দেবনাথদের ‘জন বন ও শ্রমজীবী মঞ্চ’-র স্থানীয় সভাপতিও হয়েছিল সে। কেন্দ্রীয় বনবাসী অধিকার আইন অনুযায়ী কুরমাই, বানিয়া, আন্ডু, কোদালবস্তিতে তৈরি হল গ্রামসভা। গ্রামসভার অনুমতি ছাড়া এখন বন কাটতে (ক্লিয়ার ফেলিং কুপ বা সিএফসি) পারে না বনদফতর। আবার বনের ফাঁকা জায়গায় নতুন জঙ্গলও তৈরি করছে গ্রামসভা। যেমন, আন্ডু গ্রামসভা ১১ হেক্টর জমিতে চিলনি-জারুল-হরতকি-কাঞ্জাল-কাল্লার বন তৈরি করছে। এইসব হিসেব-টিসেব দিয়ে মুখের উপর জানিয়ে দিল সে, ‘আর কাউকে জঙ্গল কাটতে দেব না। ডিপার্টমেন্টকেও না। জঙ্গল যেমন রয়েছে তেমন থাকবে। জঙ্গল ছাড়া বাঁচতে পারব না যে।’ সন্তে শুধু দস্যুপনা ছাড়ল না, হয়ে উঠল জঙ্গলের বন্ধু।

চিত্রঃ প্রমোদ গুপ্তা।

Developed by DXDasia