সম্প্রতি, কমিউনিটি পুলিশিং উইং-এর পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হয়
তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি…কলকাতার কোনও অচেনা এক পাড়া থেকে ভেসে আসছিল পুরোনো দিনের হৃদয়বিদারক সুর, ভেসে আসছিল বেহালার তারের মূর্ছনা, প্রায় ছিঁড়ে যাওয়া একজোড়া জুতো পরে বেহালা বাজাচ্ছিলেন একজন বৃদ্ধ। বিঠোভেনের কোনও সিম্ফনি নয়, ভ্যান গঘের ছবিও নয়… তিনি ভগবান মালী, সেই দরিদ্র বৃদ্ধটি, যিনি কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে তাঁর জীর্ণ বেহালাটি প্রাণবন্ত করে তুলেছেন।
আপনি রাস্তায় বেহালা বাজান কেন? খুব স্বাভাবিক এই প্রশ্নটি করায় ভগবান মালী আমাদের জানান, “আমার পরিবারের ৫ জনের খাওয়াপরার দায়িত্ব রয়েছে আমার কাঁধে। অতিমারির এই পরিস্থিতে আমি কাজ হারাই। তবে, আমার এই ভাঙা বেহালাই আমায় বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমি মালদা থেকে কলকাতায় আসি নিজের যোগ্যতায় কিছু উপার্জনের আশায়। আর সেকারণেই কলকাতার রাস্তায় বেহালা বাজাই, আমি জানি এই শহরের মানুষ সংগীতকে শ্রদ্ধা করে। অনেকেরই ভালো লাগে আমার বাজনার সুর এবং অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ঈশ্বর আর আমার বেহালার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
বার্ধক্য-দারিদ্রে কুঁচকে যাওয়া মুখে হাসি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভগবান মালী বাজাচ্ছিলেন ‘কাশ্মীর কি কলি’-র দিওয়ানা হুয়া বাদল, যে সুরে মন চলে যাচ্ছিল অনেক দূর। এর মধ্যেই ছোট্ট একটা বাচ্চা বড়োদের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য চিৎকার করে সবাইকে বলতে থাকে “দাদু খুব ভালো বাজায়”। ভিড় জমে ওঠে, কেউ কেউ নিজেদের পছন্দের গান বাজিয়ে শোনাতে বলেন। ভগবান মালী এক এক করে সকলের কথা রাখেন এবং বাজাতে থাকেন একটার পর একটা মন ভালো করে দেওয়া গানের সুর।
সম্প্রতি ভগবান মালীকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। তিনি থাকেন গিরিশপার্কে এবং উত্তর কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায় বেহালা বাজাতে দেখা যায় তাঁকে। ফেসবুকে সেই ভিডিও শেয়ার করেন অনিন্দিতা ঘোষ। শুধু ফেসবুক নয়, টুইটারেও পৌঁছে যায় সেই ভিডিও এবং হাজার হাজার ‘লাইক’ পায় পোস্টটি। এটাই বোধহয় সামাজিক মাধ্যমের একটা ইতিবাচক দিক এবং গানবাজনারও, মৃত্যু এবং অতিমারির এই সময়ে তা ছুঁয়ে গেছে সহস্র হৃদয়।
আমাদের অনেকের মতো ভগবান মালীর জীবনও পাল্টে গেছিল কোভিডের কারণে। “আমরা মালদা থেকে কলকাতায় এসেছিলাম আমাদের মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে, ওর মা হয়েছে। তারপর লকডাউন হয় এবং আমরা আর ফিরতে পারিনি। কীভাবে আমার পরিবারের পাশে দাঁড়াবো আমি জানতাম না। তারপর আমি ঠিক করি, এই সঙ্গীতপ্রেমী শহরে নিজে বাঁচতে আর পরিবারের পেট চালাতে আমার ভাঙা বেহালাটা বাজাবো।”
সম্প্রতি, ভগবান মালীকে একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ কমিউনিটি পুলিশিং উইং-এর পক্ষ থেকে সম্মানিত করা হয়। দরিদ্র এই শিল্পীকে আর্থিক সহায়তাও করা হয়। কলকাতা পুলিশের অ্যাডিশনাল কমিশনার, শ্রী তন্ময় রায় চৌধুরি উপস্থিত ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে, উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটি পুলিশের ওসি শ্রী মানস ঝা এবং ময়দান পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তারা। “আমি নিজেই মালদা থেকে এসেছি এবং যখন জানলাম এই মানুষটিও মালদার, তখনই একটা সংযোগ টের পাই এবং ওঁকে সাহায্য করার ব্যপারে পদক্ষেপ নিই। আমি মনে করি, কলকাতার নাগরিক হিসাবে এই ধরনের শিল্পীদের সঙ্কটে পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। আমাদের আর্জি, সকলে এগিয়ে আসুন এবং এই ধরনের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে সাহায্য করুন।” বলেন ওসি মানস ঝা।
ভগবান মালীর ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিনিটে ৯২০০টির বেশি শেয়ার এবং ৮৮০০টির বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। ভালোবাসা, আশীর্বাদ আর প্রশংসার স্রোতে ভেসে যায় ভিডিওটি, বহু মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তাঁর ঠিকানা জানতে চান। এসবের পরেও নির্লিপ্ত থেকেছেন তিনি। আরও মন দিয়ে বাজিয়ে গিয়েছেন তাঁর বাবার শেখানো পুরোনো দিনের বাংলা গানগুলি। দিনের শেষে, তিনি এবং তাঁর পরিবার নিখরচায় রেশন পাওয়ায় খুব খুশি, কারণ গানের সুরে হৃদয় ভরলেও ক্ষুধার্ত পেট ভরে না। তবে, ভগবান মালীর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়েছে। একমনে ঘাড় গুঁজে, বিডন স্ট্রিটের শান্ত গলির ভিতর ভাঙা বেহালায় ‘ফুলোঁ কি রং সে’ বাজিয়ে চলেন তিনি। তাঁর সুর যেন একটা ইতিবাচক হাওয়া…জীবন বয়ে চলে মৃত্যুকে অতিক্রম করে, সঙ্গীত বয়ে চলে জীবন অতিক্রম করে।