
লোকসংগীত শিল্পী রতন কাহারের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার
দুপুর বারোটা। ফোনের কলার টিউনে সেই বিখ্যাত ও বিতর্কিত গান – বড়লোকের বেটি লো (Boro Loker Beti Lo)। ফোন করেছি রতন কাহারের ছেলে শিবনাথ কাহার-কে। তিনি তখন মাছের আড়তে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বাড়ি থেকে দূরে। ফোন পেয়ে বললেন, “বাড়ি ফিরে বাবার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব।” শিবনাথ কাহার রতন কাহারের কনিষ্ঠ পুত্র।
শিবনাথ কাহারের বাবা সেই রতন কাহার (Padma Shri Ratan Kahar)। আজ যিনি পদ্মশ্রী পেয়েছেন, অতীতে যাঁর গান বলিউডের র্যাপার বাদশা ব্যবহার করেছিলেন। রতন কাহারের পরিচয় শুধু একটা পদ্মশ্রী বা একটা বিখ্যাত গানের লেখক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। লোকশিল্পীদের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার যে নিরন্তর লড়াই করতে হয়, সেই লড়াইটার নাম রতন কাহার। শিল্পের প্রতি যে মমতায় পারিপার্শ্বিক সব প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করা যায়, লোকশিল্পের প্রতি সেই মমতার নাম রতন কাহার।

ভাদুগানের জগতে কীভাবে এসে পড়লেন তিনি? রতন কাহারের মামাবাড়ি ছিল সিউড়ি। শৈশবে দরিদ্র রতনরা আশ্রয় নিয়েছিল মামার বাড়িতে। মামারা লেটো দলে গান গাইতেন। এই মামাদের দেখেই আলকাপ, লেটো, ভাদুর গানে আকৃষ্ট হয় ১২-১৩ বছরের ছোট্ট রতন। একসময় রতনও ভাদু গান বা কিছু প্যারডি গান ভাদুর সঙ্গে মিশিয়ে গেয়ে বেড়াত সিউড়ি টাউনে। ধীরে ধীরে রতন হয়ে ওঠে সিউড়ির পরিচিত মুখ।
সেই ছোট্ট রতন ঘাত-প্রতিঘাতে আজ অশীতিপর বৃদ্ধ। বাংলার মানুষ গানের জন্যই তাঁকে এক ডাকে চেনে। বঙ্গদর্শন.কম-কে রতন কাহার (Ratan Kahar) বলেন, “ভাদু গানের সূত্রেই আমি সিউড়িতে খুব পরিচিত হয়ে গেলাম। আকাশবাণী জেলা বেতার থেকে এসে কিছু মানুষ আমার থেকে গান নিয়ে যায়। ১৯৭২ সালে ‘বড়লোকের বেটি লো’ গানটা লিখেছিলাম। তখন থেকেই আমি, স্বপ্নাদি (স্বপ্না চক্রবর্তী) রেডিওতে গান করেছি। ১৯৭৬ সালে বড়লোকের বেটি লো-র রেকর্ডিং বেরিয়েছিল।”
সংসার চলত কীভাবে? রতন বলেন, “ভাদু গানের পাশে লেটোর গান করেছি। আলকাপে, যাত্রাতে নেচেছি। তখন পয়সা ছিল না। অভাবের সংসারে হাততালি সম্বল ছিল। আমি নাচতে গাইতে খুব ভালো পারি। তবে তাতে পেট ভরে না। বিড়ি বাঁধার কাজ শুরু করেছি সংসার চালানোর জন্য।”
সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না। তবু লোকশিল্পের পথ থেকে তিনি সরে আসেননি। লোকগানের জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। মা-বাবা রতন কাহারের এই লোকগানের প্রতি ভালোবাসাকে ভালো চোখে দেখেননি। ।
সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না। তবু লোকশিল্পের পথ থেকে তিনি সরে আসেননি। লোকগানের জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। মা-বাবা রতন কাহারের এই লোকগানের প্রতি ভালোবাসাকে ভালো চোখে দেখেননি। তাঁর ভাষায়, “মা বাবা বিরক্ত হতো। বলতো, কাজকর্ম না করে খালি গান গান করে বেড়াবি! কতদিন খেতে পাইনি, ঘরে আশ্রয় জোটেনি। কিন্তু আমি যেখানে গানবাজনা হতো, সেখানেই থাকতাম।”
অশীতিপর রতন কাহারের পদ্মশ্রী প্রাপ্তিতে তাঁর এলাকা সিউড়িতে খুশির বন্যা। ঠিক কতটা খুশি এলাকাবাসী? শিবনাথ কাহারের কথায়, “সিউড়ির লোকজন সকলেই খুব খুশি, গর্বিত। বাবার ছবি ফেসবুকে পোস্ট হচ্ছে। বাড়িতে সাংবাদিকরা আসছেন, বন্ধুবান্ধবদের বাবাকে নিয়ে কথা বলতে দেখে ভালো লাগছে।”
পদ্মশ্রী তাঁকে স্বীকৃতি জানিয়েছে। লোকগান হারিয়ে যাচ্ছে যেখানে, সেখানে লোকশিল্পীর পদ্মশ্রী পাওয়া মরা গাঙে জোয়ার নিয়ে আসার মতো না হলেও খানিকটা প্রাপ্তি তো বটেই।
বাবা অনেক কষ্টসাধন করার পর পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছেন। কী প্রতিক্রিয়া ছেলের? তিনি বলেন, “আমরা অনেক কষ্ট করে বড়ো হয়েছি। আর্থিক কারণে বেশি দূর পড়তে পারিনি। একটা হারমোনিয়াম কিনে দেওয়ার ক্ষমতাও বাবার ছিল না। ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে অনেক অনুষ্ঠানে যেতাম। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বাবার জনপ্রিয়তা দেখেছি। তখন খুব গর্ব হতো বাবাকে নিয়ে। সংসার চালানোর জন্য বাবা কখনো কখনো ধার নিত। গান করে বাবা সেই টাকা শোধ দিত।” শিবনাথ কাহার অবশ্য ২০২০ সালে ২৬ বছর বয়সে হারমোনিয়াম কিনেছেন। গান শেখার অদম্য ইচ্ছেটা তিনি যে লোকশিল্পী বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন।
দারিদ্র আর লোকগান করার অদম্য ইচ্ছে নিয়েই লোকশিল্পীদের জীবনযাপন। রতন কাহার তাঁর অন্যতম উদাহরণ। পদ্মশ্রী তাঁকে স্বীকৃতি জানিয়েছে। লোকগান হারিয়ে যাচ্ছে যেখানে, সেখানে লোকশিল্পীর পদ্মশ্রী পাওয়া মরা গাঙে জোয়ার নিয়ে আসার মতো না হলেও খানিকটা প্রাপ্তি তো বটেই। যাত্রা, আলকাপ, ভাদু, লেটো নিয়ে আবেগ মথিত স্বরে রতন কাহার পূর্বস্মৃতি ধরে বলে যান, “লেটোর দলে নজরুল বাঁশি বাজাতেন। তিনি লিখতেন লেটো গান। যারা নাচ করত, তারা সেই গান গাইত। আমার মামাও গাইত নজরুলের লেখা গান। সব হারিয়ে গেছে।”
প্রকৃত লোকশিল্পীরা ভালো নেই। তাঁদের সংখ্যাটাও কমে আসছে ক্রমশ। গ্রাম বাংলা থেকে লেটোর গান হারিয়ে গেছে আজ। নজরুল যে গান লিখতেন একসময়, সে গান কালের গর্ভে। এসব নিয়ে বিষণ্ন তিনি। তাঁর কাছে গান শিখতে আসেন এখনকার প্রজন্ম। তিনি বলেন, “এখনকার প্রজন্মের গানের প্রতি ঝোঁক কম। তাহলে আরও শিল্পী আমি তৈরি করতে পারতাম।”
