
৬২ বছর ধরে লোকগান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচার করে চলেছেন
মাটির কাছাকাছি যাঁরা বসবাস করেন, লোকগান তাঁদেরই একান্ত সম্পদ। দারিদ্র্য, সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করে পরম মমতায় তাঁরা লোকগানকে লালন পালন করেন। শলাবৎ মাহাতো দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি ছৌ নাচ এবং নাচনি দলের সঙ্গে গান করতেন। ভাওয়াইয়া শিল্পী বিনয় রায় ছিলেন কৃষিজীবী। গম্ভীরা শিল্পী প্রবীণ দোকড়ি চৌধুরী মালদহ জাতীয় সড়কের ধারে পান বিড়ির দোকান চালাতেন। আলকাপ ও গম্ভীরা দুই ধরনের গানেই পারদর্শী তারাপদ সরকার হাটে হাটে ধান চাল কেনাবেচা করতেন। এঁরা কেউই আজ বেঁচে নেই।
রবীন্দ্র-কবিতায় ওঁদের কথা পেয়েছি– “গুরু গুরু গর্জন গুনগুন স্বর/ দিনরাত্রে গাঁথা পড়ি দিনযাত্রা করিছে মুখর।/ দুঃখ সুখ দিবস রজনী/ মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।” জীবনের এই মহামন্ত্রধ্বনি আসলে লোকগান, যা নির্মাণ হয়েছে প্রান্তিক মানুষেরই কায়িক শ্রম থেকে। কিন্তু লোকশিল্পীরা কতটা স্বীকৃতি পেলেন?

শিবব্রত কর্মকার ও তাঁদের সংস্থা ভ্রমরা আজ ৬২ বছর ধরে লোকগান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচার করে চলেছেন। লোকশিল্পীদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি করাটাও তাদের লক্ষ্য। সময়টা নেহাত কম নয়। ১৯৬২ সালে কাঁকুড়গাছিতে ‘ভ্রমরা’ শুরু হয়। তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা গ্রামে গ্রামে খুঁজে বেড়িয়েছেন লোকগান ও তার শিল্পীদের। সত্তরের দশক থেকে সংগৃহীত লোকগান রেকর্ড রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। ষাটের দশকের শেষ থেকেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকশিল্পীদের খুঁজে বার করে চলেছেন। সেখান থেকে তথ্যসহ লোকগান সংগ্রহ ও সংরক্ষণ-এর কাজ করে আসছেন।
কোথা থেকে লোকগান সংগ্রহের আগ্রহ পেলেন তিনি? পূর্ববঙ্গের মানুষ শিবব্রতবাবুর পরিবারে গান-বাজনার একটা চর্চা ছিল। পূর্ববঙ্গের বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গলের গান বাড়িতেই গাওয়া হতো। লোকগান তাঁর চেতনায় এবং চৈতন্যে শৈশবেই প্রবেশ করেছিল। পরবর্তীকালে উত্তরবঙ্গে তিনি বেশ কিছুটা সময় কাটান। সেখানেই গ্রামীণ শিল্পীদের সংস্পর্শে আসেন এবং আগ্রহ পান তাদের সংস্কৃতিতে। লোকশিল্পীদের নিজের কণ্ঠ গান রেকর্ডের আগ্রহ মূলত তখন থেকেই। এই লোকশিল্পীদের সান্নিধ্যে এসে তাঁর এদের জন্য কিছু করার তাগিদ তৈরি হয়। এদের কণ্ঠের লোকগানকে বিপুলা পৃথিবীর সামনে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগ নেন। লোকগানের সঙ্গে বসত করার সুবাদে শিবব্রতবাবুর অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ ভারী। গৌরীপুরে প্রবাদপ্রতিম শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়ার বাড়িতে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে তিনি দেখেছেন, শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়া মাহুত আর গাড়িয়ালদের থেকে গানগুলি শিখছেন। এই মাহুত বা গাড়িয়ালদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। শিবব্রতবাবু বলেন, “প্রতিমাদির সঙ্গে দোতারা বাজাতেন সুধীরদা। প্রতিমাদি সুধীরদাকে একটা রিক্সা কিনে দিয়েছিলেন যাতে গানের পাশে তাঁর জীবিকানির্বাহ হতে পারে। এসব দেখেই মনে হত, লোকশিল্পীদের জীবন ও জীবিকা চালানোর জন্য কিছু করা দরকার।”

১৯৯২ সাল নাগাদ ‘শিকড়ের সন্ধানে’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শিবব্রতবাবুরা শুরু করেন। দোকড়ি চৌধুরী, শলাবৎ মাহাতো, তারাপদ সরকার, বিনয় রায়দের মতো দুঃস্থ লোকশিল্পীদের দিয়ে, তাঁদের নিজস্ব লোকবাদ্য ব্যবহার করে, গ্রাম গ্রামান্তর থেকে সংগ্রহ করে আনা লোকগান রেকর্ড করার উদ্যোগ নেন ভ্রমরার সদস্যরা। শিবব্রত কর্মকার ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রান্তিক দুঃস্থ লোকশিল্পীদের সাহায্যর উদ্দেশ্যে এই কাজ তাঁরা শুরু করেন নিজেদের খরচে।

কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ বা লাভ ছাড়াই শিকড়ের সন্ধানে-র আটটি ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছিল। কোনো মিউজিক কোম্পানির দ্বারস্থ না হয়ে এভাবে স্ব-উদ্যোগে শিকড়ের সন্ধানে-র সাফল্য সে সময়ে হইচই ফেলে দেয়। শিকড়ের সন্ধানে আসলে সেইসব প্রান্তিক মানুষগুলোর সাফল্য, যারা দারিদ্রতার মধ্যেও আগলে রেখেছিলেন লোকগানকে। একটা সময় তাবড় মিউজিক কোম্পানি এই গানগুলিকে নিজেদের কায়দায় বাজারজাত করার প্রস্তাবও রেখেছিল। লোকসংগীতের শুদ্ধতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তাতে রাজি হননি এঁরা। চলেছিল ক্যাসেটগুলির পুশসেল। তা থেকে যতটা টাকা তোলা গেছে, সবটাই লোকশিল্পীদের কল্যাণে ব্যবহার হয়েছে। শিবব্রতবাবু বলেন, “ওঁদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। কলকাতায় চিকিৎসা করাতে হলে বিপদে পড়তেন। তাই তাঁরা কোথায় থাকবেন, কোথায় চিকিৎসা করাবেন, সবটাই আমরা ব্যবস্থা করে দিতাম। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এলে এখানে থাকতেন এবং ওয়ার্কশপ করাতেন।”
শিবব্রত কর্মকার ও তাঁদের সংস্থা ভ্রমরা আজ ৬২ বছর ধরে লোকগান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচার করে চলেছেন। লোকশিল্পীদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি করাটাও তাদের লক্ষ্য। সময়টা নেহাত কম নয়। ১৯৬২ সালে কাঁকুড়গাছিতে ‘ভ্রমরা’ শুরু হয়। তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা গ্রামে গ্রামে খুঁজে বেড়িয়েছেন লোকগান ও তার শিল্পীদের।
বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি আজ অনেকটা বদলেছে। লোকগান হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ, যেসব পার্বণে বাংলার মানুষ নাচ গানের আয়োজন করতেন, সেগুলোই এখন আর নেই। কত ব্রত, কত পুজো, মেয়েলি আচার অনুষ্ঠান সংস্কৃতির উত্থান পতনে তলিয়ে গেছে। শিবব্রতবাবু বলেন, “প্রত্যেকটা গানের সঙ্গে একটা কর্মযোগ ছিল। সেই কাজগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সেই গানগুলোও হারিয়ে গেছে। আর কেউ সেগুলো চর্চাও করেন না। লোকসংগীত এখন কারখানায় তৈরির মতো হয়ে গেছে। যে যার মতো করে লিরিক লিখছেন, সুর বানাচ্ছেন। অথচ আমি সেইসব শিল্পীদের দেখেছি যারা লোকগান ছেড়ে আসেননি, যতই দুঃস্থ হয়ে পড়ুন না কেন। আজ সেই লোকগানকে ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়।”

শিবব্রতবাবুর কথায় উঠে আসে অলিপুরদুয়ারের দুঃস্থ শিল্পী শরৎ কুমার বর্মনের কথা। যাঁর পরিধেয় বস্ত্র ছিল মাত্র একখানা। সামিয়ানা টাঙিয়ে বিভিন্ন মেলায় মানুষকে বিনে পয়সায় মাটির গান শোনাতেন। গঙ্গাচরণ বিশ্বাস, রতন কাহার, আশারঞ্জন চট্টরাজ, এমিলি হেমব্রম এরকম কত নাম। বিড়ি বাঁধতেন রতন কাহার। তাঁর ‘বড়লোকের বিটি লো’ গান বলিউডে রিমেক হয়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থে। এরকম প্রায় ৪০০ লোকগান বলিউড নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। কে খবর রাখেন?
উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত চা বাগানের মধ্যে হাটের দোকান চালান ভাওয়াইয়া শিল্পী চাঁদকিশোর রায় ও তার স্ত্রী নির্মলা। সৃষ্টিধর বাদ্যকরের পেশা সাপ ধরা এবং গ্রামেগঞ্জে সাপ খেলা দেখানো। তিনি সাপুড়ে গানের শিল্পী। ভাওয়াইয়া শিল্পী পরেশচন্দ্র রায় সাইকেল রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কজন রেখেছেন এঁদের খবর?
শলাবৎ মাহাতো পরবর্তীকালে লালন পুরস্কার পেয়েছিলেন। সবাই কি পান? ভ্রমরা চেষ্টা করে তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়ার। গত ৩১ ডিসেম্বরে একাত্তর বছর বয়স পূর্ণ করে শিবব্রতবাবুও সে যুদ্ধে সামিল। এখন ভ্রমরা-র প্রায় ৫০ জনের মতো সদস্য নিয়মিত লোকগানের চর্চা করে চলেছেন। বিশুদ্ধ লোকগানকে অর্থনৈতিক লাভ ছাড়াই মানুষের মাঝে প্রচার করাই লক্ষ্য তাঁদের। ভ্রমরা পেয়েছে তার নিরলস কাজের যোগ্য সম্মাননা। সংগ্রহ, সংরক্ষণ আর প্রচার করে লোকসংগীতের স্রোত বহমান রাখার জন্য আমেরিকার স্মিথ সোনিয়ান ফোক ওয়েজ দ্বারা পিট সিগার সম্মান, নির্মলেন্দু চৌধুরীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে লোকভারতী সম্মান ভ্রমরা-র ঝুলিতে উজ্জ্বল। শিবব্রতবাবু বলেন, “আমাদের ভ্রমরা-র ৬০ বছর উদযাপন হয়েছিল মালদহের প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে উপচে পড়া মানুষের ভিড় ইঙ্গিত দিয়েছে যে লোকসংগীতের কদর এখনও আছে। শুধু মানুষের কাছে তাকে পৌঁছে দিতে হবে।”
