বড়িশার সাবর্ণ পরিবার পর্ষদের আয়োজনে ষোড়শ আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব
মাঝে মাঝে মনে হয় কলকাতা ‘সব পেয়েছির দেশ’। চাইলেই সারা পৃথিবীটা যেন মুঠোয় চলে আসে। আর শীতকালই যেন তার মক্ষম মুহূর্ত। তবে, এই বছর শীতে অতিমারির আবহে ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব স্থগিত এবং ৪৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা দেরিতে শুরু হওয়া মন ভারি করে তুলেছিল। সেই দুঃখে খানিক প্রলেপ পড়লো এবার। প্রতি বছরের মতো এ বছরও আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবের আয়োজন করেছে সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পর্ষদ, দেখতে দেখতে যা ১৬তম বর্ষে পদার্পণ করলো। এই ষোড়শ আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবে এবারের থিম ‘সিন্ধু সভ্যতা’ এবং ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে থাকছে দু’টি দেশ—ফ্রান্স ও শ্রীলঙ্কা। সিন্ধু সভ্যতাকে সামনে রেখে স্মরণ করা হবে বিশ্ববন্দিত বাঙালি ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বড়িশার সাবর্ণ সংগ্রহশালায় আগামী ১৩ থেকে ১৬ ফ্রেব্রুয়ারি আয়োজিত হবে এই উৎসব।

আজ থেকে ১০০ বছর আগে আবিষ্কৃত প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস-কেই ফিরে দেখা যাবে এই আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবে। ‘সিন্ধু সভ্যতা’ স্মরণের পাশাপাশি থাকবে এবারের উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ দেশ-বিদেশের পুতুল। ইংল্যান্ড, রাশিয়া, ফ্রান্স, ভিয়েতনাম সহ দশটি দেশ থেকে আনা হচ্ছে বিভিন্ন ‘প্রাচীন’ পুতুল। থাকবে আন্দামান বা নাগাল্যান্ডের আদিবাসীদের তৈরি দেশীয় পুতুলের সম্ভার। প্রদর্শিত হবে লোথাল বা ঢোলাভিরার মতো ওই এলাকার বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, খ্রিষ্টপূর্ব ২৯০০ সালে ওড়িশার কেওনঝড় এলাকার মানুষের ব্যবহৃত একটি হাতের বালা।

সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পর্ষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরীর কথায়, “প্রতিবছরই আমাদের ইতিহাস উৎসবের নির্দিষ্ট থিম থাকে। ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এ বছরের থিম ‘সিন্ধু সভ্যতা’। এছাড়াও রয়েছে দেশ-বিদেশের পুতুল, বেতার জগত—ভারতে বেতার আসার পর থেকে যা যা কর্মকাণ্ড হয়েছে সেটা তুলে ধরা হবে, পাশাপাশি তুলে ধরা হবে মুম্বই যাওয়ার পর কিংবদন্তি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কর্মকাণ্ড; থাকবে তাঁর লেখা চিঠি ও ডায়েরি। রেট্রোস্পেক্টিভ বিভাগে থাকছেন প্রয়াত অভিনেতা রবি ঘোষ; তিনি যে একজন ভালো গল্ফ খেলোয়াড় ছিলেন, তা অনেকেরই অজানা। ভালো ছবিও আঁকতেন তিনি। সেসব দিক তুলে ধরা হবে। আন্তর্জাতিক বিভাগে থাকছে শ্রীলঙ্কা-ফ্রান্স। দু’টি দেশের অসংখ্য মুদ্রা, স্ট্যাম্প, হাতের কাজ সহ অনেক কিছু থাকবে প্রদর্শনীতে। এর সঙ্গে ক্যুইজ, ওপেন হাউজ সেশন, প্রদর্শনী, হেরিটেজ ওয়াক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির আয়োজন থাকবে প্রতিদিন।”


১ ফেরুয়ারি আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব উপলক্ষে ভবানী রায় চৌধুরী লিখিত ‘বঙ্গীয় সাবর্ণ কথা কালীক্ষেত্র কলিকাতা’ বইটির তৃতীয় সংস্করণ উদ্বোধন করেন সঙ্গীতশিল্পী সৈকত মিত্র। এছাড়া থাকছে আরও একটি দুষ্প্রাপ্য ঐতিহাসিক নথি। ১৯২৮ সালে অতুলকৃষ্ণ রায় ‘লক্ষ্মীকান্ত, এ চ্যাপ্টার ইন দি সোশ্যাল হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। সাবর্ণ পরিবারের অন্যতম বংশধর লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলার যোগ, তাঁর অবদান, ইংরেজ শাসনের আগে তাঁদের প্রতিপত্তি থেকে শুরু করে কালীঘাট মন্দিরের ইতিহাস—পুরোনো কলকাতার অন্যতম দলিল এই বইটি। বইটি এখন আর পাওয়া যায় না। সেটির একটি মুদ্রণ রাখা হবে ইতিহাস উৎসবে। তাই, পরিশেষে এ কথা বলাই যায় যে বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাবর্ণদের এই ইতিহাস উৎসব প্রতিবারের মতো এবারও ইতিহাসপ্রেমীদের সমৃদ্ধ করবে।
ছবিঃ দেবর্ষি রায় চৌধুরী