রেকি করতে ইতালি গেল ইন্দ্রনীল সেন

বিশ্বকাপে যাওয়ার খবর শুনে জড়িয়ে ধরে প্রদীপ ব্যানার্জি বলেছিলেন– ‘ফাটিয়ে দে।’

তখনকার দিনে লটবহর নিয়ে বিশ্বকাপ কভার করতে যাওয়া এক বিশাল ঝক্কির ব্যাপার। সঙ্গে করে গাদাগুচ্ছের জিনিস বয়ে নিয়ে যেতে হত। এবং প্রত্যেকটা যন্ত্র সামলানোর জন্য একজন করে মানুষ। প্রায় মাঠে খেলতে নামার আয়তনের সমান স্কোয়াড নিয়ে যাওয়া। যাহোক, ইতালিতে বিশ্বকাপ কভার করতে যাওয়া ঠিক হওয়ার পর, সেই স্কোয়াডে কারা কারা যাবে— ক্যামেরাম্যান, এডিটর, সাউন্ড রেকর্ডার, কো-অর্ডিনেটর ইত্যাদি – ঠিক করে ফেলা গেল। অভিজিৎ ব্যানার্জি ক্যামেরায়, সত্যেন্দ্র মোহান্তি সাউন্ডে, শুভাশিস(সোনামনি) বুমম্যান, দেবকান্ত চক্রবর্তী এডিটর, আর রণজিৎ দাস কো-অর্ডিনেটর। আমরা প্রত্যেকেই এর আগে বেশ কিছু বছর একসঙ্গে কাজ করেছি এবং পরস্পরের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিতও ছিলাম যথেষ্ট।

স্বভাবতই বিশ্বকাপ কভার করতে যাব দলবল নিয়ে – সে-খবর কলকাতার প্রচারমাধ্যম এবং ক্রীড়াজগতে ছড়িয়ে পড়ল। টেলিভিশন সংস্থা হিসেবে তো বটেই, দলের প্রত্যেক সদস্যও অ্যাক্রিডিটেশন পাবে-– এটা জেনে অনেকেই খুশি হয়েছিল। আবার বেশ কিছু লোকের গাত্রদাহ হয়েছিল বলেও জেনেছিলাম। প্রদীপ ব্যানার্জির সঙ্গে তার আগে বেশ কিছু টেলিভিশন প্রোগ্রাম করেছিলাম ফুটবল সংক্রান্ত। আমি নিজে গিয়ে প্রদীপ দাকে এই বিশ্বকাপ কভারের খবরটা দিয়েছিলাম। মনে আছে, আমায় জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন – ‘ফাটিয়ে দে।’ ওঁর স্ত্রী আরতিদি তখন জাতীয় মহিলা ফুটবল সংস্থার প্রেসিডেন্ট। যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন। বাংলা থেকে কিছু কমবয়েসি যুবক ক্যমেরা কাঁধে নিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ যুদ্ধে শামিল হচ্ছে বলে আনন্দের সীমা ছিল না তাঁদের।

কিন্তু এর আগের একটা গল্প না বললেই নয়। আমার ছোটভাই ইন্দ্রনীল সেন তখন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে সদ্য নাম করেছে। কাজকর্ম নিয়ে গান গাওয়ার ফাঁকে প্রায়শই আলোচনা হত ওর সঙ্গে। ঠিক করলাম, ইন্দ্রনীল আর ওর ছোটবেলার বন্ধু রণদীপ দাস-– যে তখন বায়ুদূত এয়ারলাইন্সে চাকরি করত – এই দুজনকে ইতালি পাঠাব সব প্রস্তুতি সেরে রাখার জন্য। কোথায় থাকব, বিভিন্ন দেশের টিম ট্রেনিং গ্রাউন্ডগুলোকে একবার দেখে নেওয়া, মিডিয়া ব্রিফিং নেওয়া এবং আনুষঙ্গিক যা যা প্রয়োজন হতে পারে –- এইসব। নির্দিষ্ট সময়ে ইন্দ্রনীল আর রণদীপ রোম, মিলান পৌঁছে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে আমাদের ওয়াকিবহাল করাল। পরে অবশ্য রণদীপ আমাদের সঙ্গেও আরেকবার গেছিল এবং তাতে ওর রেকি করার অভিজ্ঞতাটা আমাদের সুবিধেই দিয়েছিল।

ইন্দ্রনীলরা যখন গিয়েছিল, রোম শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে তখন ইতালির ট্রেনিং সেশন চলছে। কোচ বিলার্দো তখন তাঁর ছেলেদের নিয়ে প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আর মাঝেমাঝেই টেলিভিশন মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিয়ে চলেছেন। মিডিয়া সেন্টারের প্রধান ছিলেন অ্যাড্রিয়ানো বোত্তা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মিডিয়াকে যোগাযোগ ও নিয়মকানুন বোঝাবার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপরে। তাঁকে অ্যাসিস্ট করতেন ড্যানিয়েলা নামের এক মহিলা। মিঃ বোত্তার সঙ্গে কথা বলে ইন্দ্রনীল আর রণদীপ বুঝতে পারল, এরা ABU(এশিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন) এবং তাদের সদস্য হিসেবে ভারতীয় দূরদর্শন ছাড়া এখানকার টেলিভিশন-বিষয়ক আর কোনো খবরই রাখে না। 

 

ইন্দ্রনীল আর রণদীপ দুজনের কাছেই ইটালিয়া ৯০-র সেই বিশাল মিডিয়া সেন্টার এবং তার ব্যবস্থাপনা হয়ে উঠছিল অনেকটা স্বপ্নরাজ্যে আসার মতো। তবে, মুগ্ধতার পাশাপাশি সমস্যার খোঁচাও ছিল। যেমন, অন্যান্য অনেক ইউরোপীয় দেশের মতো এখানেও ভাষা ছিল একটা বড় অন্তরায়। পুংলিঙ্গ-স্ত্রীলিঙ্গ গুলিয়ে যেত প্রায়শই, আর ইতালীয় নাম ইতালিয়ানদের মতো উচ্চারণ করার প্রবণতা বিপদও ডেকে আনত মাঝেমাঝে। মিডিয়া সেন্টারের প্রধানের সঙ্গে কথা বলার সময়, ইন্দ্রনীল নাকি তাঁকে ‘মিঃ বোত্তো’ বলে সম্বোধন করেছিল। তাতে উনি হেসে বলেছিলেন – ‘মাই নেম ইজ মিঃ বোত্তা। মিঃ বোত্তো সাউন্ডস লাইক মিঃ ভুট্টো।’ এমন উচ্চারণ-বিভ্রাট ইতালি সফরে নিত্যসঙ্গী ছিল।

এদিকে, কলকাতায় বসে আরেকধরণের প্রস্তুতি চলছিল। তখন ভিডিও ফরম্যাট ছিল ‘লো ব্যান্ড’-এর। তার ক্যামেরা, এডিটিং মেশিন – সবই খুব বড় আকারের। আগেই বলেছি, এখনকার মতো একটা ছোট ডিজিটাল ক্যামেরা আর ল্যাপটপ নিয়ে কাজ সারা যেত না। তাই নিজেদের সেটআপ নিয়ে যেতে হলে কিলো-কিলো ওজনের যন্ত্র নিয়ে ইতালি পৌঁছনোর পরিকল্পনাটা ছিল একটা প্রায়োরিটি। এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলে অবশ্য কিছুটা ছাড় পাওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছিল। 

ইন্দ্রনীল আর রণদীপ কলকাতায় ফিরে জানাল, হোটেল কনফার্মড। হোটেলের রুমের ভেতরে স্টুডিও বানিয়ে নেওয়ার অনুমতি পাওয়া গেছে, হোটেল থেকে পনেরো মিনিটের দূরত্বে ব্রডকাস্টিং সেন্টার থেকে আপলিঙ্কিং করা যাবে, অ্যাক্রেডিটেশনের সমস্ত অ্যাপ্রুভাল ওরা করে এনেছে – ইত্যাদি ইত্যাদি। এবার শুধু আমাদের টিমের প্লেনে ওঠার অপেক্ষা।

অতঃপর, মিশন ইটালিয়া’৯০… 

Post Tags
Developed by DXDasia