হোর্ডিং-কাটআউট থেকে হোম-যজ্ঞ, ফুটবলপ্রেমী বাঙালির মেসি-যাপন

লিওনেল মেসি : বাঙালি ফুটবলপ্রেমীর আইকন

প্রতিবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের মরশুম এলেই পাড়ার চায়ের দোকান, অফিস ফিরতি ট্রেনে কিংবা স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে, ক্লাসের ফাঁকে কান পাতলেই এবারেও শোনা যাচ্ছে, “এবার কিন্তু ফ্রান্স নেবেই!”
– “না না, আর্জেন্টিনা ব্যাক-টু-ব্যাক। কোনও কথা হবে না।”
পাশে এক জার্মানি সমর্থক, যিনি ২০১৪-র পর থেকে একটু চুপচাপ আছেন, টুক করে একটু খোঁচা দেন, “সেবারের ফাইনালটা মনে আছে তো?”
ব্রাজিলের সাপোর্টার ব্যক্তি মিটিমিটি হাসছেন – “কানের ভুলেই তো গোল দুটো খেয়েছিলি। নইলে তো হাতের পাঁচ হয়েই যেত এতদিনে।”
কথাটা হজম করে প্রত্যাশিতভাবেই জার্মানি সমর্থকের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “তুই ভাই একটু সেভেন আপ খেয়ে আয়।” এবং তারপর মারপিট হওয়ার উপক্রম…
এরই মধ্যে পাশে এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা ব্যক্তিটি বলে উঠলেন, “যাই বলো ভাই, যে দলকেই সাপোর্ট করো! ‘গোট’ ইজ ‘গোট’!”

কেউ হাতে ট্যাটু করিয়েছেন মেসির পোর্ট্রেট। কারও আস্ত বাড়িটাই আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো, বাড়ির সামনে মেসির সুবিশাল কাটআউট। মেয়ের বিয়ের প্যান্ডেলও আর্জেন্টিনার রঙে। কেউ ক্যাফে খুলেছেন লিও-র নামেই।

কথাটির বিরোধিতা করার সাহস হল না কারও। নামের এমনই জাদু। যারা একটু আগেই সেভেন আপ নিয়ে কুস্তি শুরু করতে যাচ্ছিলেন, তারাও মন্তব্যে সম্মতি জানান। আড্ডা চলতে থাকে এভাবেই। সুস্থ সাবলীল তর্কাতর্কি, একটু আধটু খোঁচা কিংবা বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা।

পরদিন সকালবেলা আর্জেন্টিনার সাপোর্টার ব্যক্তি শুধু নয়, বাংলার আপামর ফুটবলপ্রেমীই বোধহয় বসে পড়লেন টিভি, মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপের সামনে। ৩৯ বছর বয়সী ‘গোট’ দশ নম্বরের নীল-সাদা স্ট্রাইপ জার্সি পরে ক্যানসাস সিটি স্টেডিয়ামের ঘাসে পা রাখছেন তখন। তাঁর কেরিয়ারের ষষ্ঠতম এবং সর্বশেষ ফিফা বিশ্বকাপ। ২০১৪-র ফাইনালে লড়ে গিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত, কিন্তু কাপ অধরা থেকে যায়। অবশেষে, ২০২২-এ স্বপ্নপূরণ। সমর্থকদের খেদ রয়ে গিয়েছিল একটাই। একটাও হ্যাটট্রিক হল না যে এখনও! ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি কোটি কোটি অনুরাগীর মনের কথা শুনতে পেয়েছিলেন বোধহয়। আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার স্কোর শেষমেশ দাঁড়ালো ৩-০। তিনটে গোল একজনের নামেই, লিওনেল মেসি।

সেদিন সকালে পাড়ায় কিছু বাড়ি, ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে তারস্বরে চিৎকার। মনে হচ্ছিল, ভারতের জাতীয় দল কোনো প্রতিযোগিতা জিতছে। কিংবা অনেক অপেক্ষার পর, পাড়ার পল্টু ডব্লুবিসিএস ক্র্যাক করে ফেলেছে। বাংলার পাড়ায় পাড়ায় মেসি-পাগলামি এমনই। কেউ হাতে ট্যাটু করিয়েছেন মেসির পোর্ট্রেট। কারও আস্ত বাড়িটাই আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো, বাড়ির সামনে মেসির সুবিশাল কাটআউট। মেয়ের বিয়ের প্যান্ডেলও আর্জেন্টিনার রঙে। কেউ ক্যাফে খুলেছেন লিও-র নামেই। কত ফুটবলপ্রেমীর মনখারাপের, অবসাদের সঙ্গী মেসির খেলা। শর্ট ফরম্যাট ভার্টিক্যাল ভিডিওর যুগে মিলেনিয়াল, জেনজি-র হোয়াটস্যাপ ইন্সটা আপাতত কদিন ছেয়ে থাকবে মেসির অজস্র গোলের ক্লিপিংসে।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে কীভাবে মেসিকে ভালোবাসেন বাঙালিরা? সেই উত্তর আড্ডার আসরেই মেলে। আর মেলে অভিজ্ঞতায়, মেলে ফেলে আসা কৈশোরে চিলেকোঠা ঘরের দেওয়ালে থাকা পোস্টারগুলোয়।

বাঙালির ‘সব খেলার সেরা’ ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা বরাবর। তাই চার বছর পরপর বিশ্বকাপের মরশুমে কলকাতা সেজে ওঠে আর পাঁচটা উৎসবের মতোই। কলকাতার অলিগলি ঘুরলেই দেখা যাবে, পাড়ার মোড়ে মোড়ে বিশাল বিশাল সব পতাকা। কোথাও ব্রাজিল, কোথাও আর্জেন্টিনা… উত্তর কলকাতার ‘ফিফা গলি’ থেকে শুরু করে পাটুলির রাস্তা পর্যন্ত সেজে ওঠে ফুটবলের রঙে। এই সময়ে, অন্যান্য দেশের জাতীয় পতাকাগুলি নিজেদের জাতীয়তাবাদের দ্যোতনা হারিয়ে উৎসবের রঙের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এর মধ্যেও লক্ষ করলে দেখা যাবে, এবার মেসির উপস্থিত যেন একটু বেশিই। সে হলোই বা বেশি। শেষবার বিশ্বকাপে খেলবেন তিনি। একটু বেশি ভালোবাসা তাঁর প্রাপ্য।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে কীভাবে মেসিকে ভালবাসেন বাঙালিরা? সেই উত্তর আড্ডার আসরেই মেলে। আর মেলে অভিজ্ঞতায়, মেলে ফেলে আসা কৈশোরে চিলেকোঠা ঘরের দেওয়ালে থাকা পোস্টারগুলোয়। সদ্য স্কুল পাশ করে কলকতার কলেজে পড়তে আসা ছেলে-মেয়েগুলির ঘরে, ক্লিপে আটকানো পোলারয়েডের মতো দেখতে একগোছা ছোটো ছোটো ছবিতেও মেলে। কেউ মেসির জন্মদিন সেলিব্রেট করেন নিজের বাড়িতে। খেলা শুরু হওয়ার আগে একদল মানুষ আর্জেন্টিনার পতাকা নিয়ে, দশ নম্বর জার্সি পরে বেরিয়ে পড়েন পাড়ার রাস্তা ধরে। ১৭ জুন সকালে, বাঘাযতীনের একটি মেসি-অনুরাগী ক্লাবের কর্মকর্তারা তো হোম-যজ্ঞ পর্যন্ত করে ফেললেন আর্জেন্টিনার জাতীয় টিম ও মেসির মঙ্গল কামনায়। এক অনুরাগী জানাচ্ছেন, মেসি ফুটবল খেলে না, বলের সঙ্গে প্রেম করে। বাকি সবাই থার্ড হুইল। কেউ জানান, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের চড়াই উৎরাই-এর সঙ্গেও জুড়ে আছেন মেসি। জীবনের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেসি হয়ে উঠেছিলেন তাঁর ধ্রুবতারা। নতুন প্রজন্মের এক ফ্যান লিখেছেন, “আমার মনে হয় ও (মেসি) আসলে কবিতা লেখে, তবে সেটা পা দিয়ে, সবুজ ঘাসে। ফুটবল ওর কলম।”

রক্তমাংসের একটি মানুষ নিজের প্রতিভার জোরে এভাবেই হয়ে ওঠেন উপাস্য। তাঁর খেলা কোনোদিন স্টেডিয়ামে বসে দেখা হবে না, তাঁকে সামনে থেকে স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হবে না জেনেও বাঙালি আমজনতার একাংশ সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশের মানুষকে বরণ করে নিয়েছেন নিজের ঘরের ছেলের মতোই। তবে, মেসি-ম্যাজিক সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা বাঙালি ফুটবল প্রেমীদের হয়েছিল। আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে, ২০১১ সালে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আর্জেন্টিনার একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় আমাদের কলকাতা শহরে। বেশ মনে পড়ে, আইডলের বাঁ পায়ের জাদু দেখার জন্য সেই ভারী বৃষ্টি-বাদলার দিনেও যুবভারতীর একটিও আসন খালি থাকেনি। মেসি তখন সমগ্র ক্রীড়াজগতের অন্যতম আইকন হয়ে উঠছেন। স্প্যানিশ ক্লাব ফুটবলের দৌলতে বাংলায় তাঁর জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। তারপর একটা বড়ো সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ‘গোট’-এর ঝুলিতে এসেছে আটটি ব্যালন-ডি’অর, কোপা এবং অবশ্যই বিশ্বকাপ। একবিংশ শতকের প্রথম দশকে বড়ো হয়ে ওঠা বাংলার একটা গোটা প্রজন্ম জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মেসির প্রতিভায় মোহিত হয়েছে। তাদের কথা মাথায় রেখেই (এবং অবশ্যই বাণিজ্যিক স্বার্থে) গতবছর ডিসেম্বর মাসে মেসিকে আবার ভারতে নিয়ে আসবার ব্যবস্থা করা হয়। ১৩ ডিসেম্বর তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য পদার্পণ করবেন এই শহরে। প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই শহরে উৎসবের আমেজ। বিশাল বিশাল বিজ্ঞাপনে ছেয়ে আছে কলকাতা।

এক অনুরাগী জানাচ্ছেন, মেসি ফুটবল খেলে না, বলের সঙ্গে প্রেম করে। বাকি সবাই থার্ড হুইল। কেউ জানান, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের চড়াই উৎরাই-এর সঙ্গেও জুড়ে আছেন মেসি। জীবনের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেসি হয়ে উঠেছিলেন তাঁদের ধ্রুবতারা।

সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা নিজেদের শখ আহ্লাদ ভুলে নিজের আইকনকে দূর থেকে একঝলক দেখার জন্য মহার্ঘ্য টিকিট কিনছেন। কিন্তু এবারে ‘যার শেষ ভালো তার সব ভালো’ হল না। বাঙালির মনে থেকে যাবে বহুদিন এই স্মৃতি। ক্ষিপ্ত, উদ্ভ্রান্ত জনতার মধ্যে থেকে কাঁধে টার্ফ নিয়ে হেঁটে যেতে যেতে এক ব্যক্তি জানালেন, “মেসিকে দেখতে এসেছিলাম। দেখতে পাইনি, তাই টার্ফ নিয়ে যাচ্ছি। পাড়ায় খেলা হবে।” কলকাতার  ইতিহাসে সর্বকালের সেরা রিফান্ড পলিসি বোধহয় এটাই ছিল।

তবে দুঃখ-স্মৃতি হয়তো শারীরিক আঘাতের মতোই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা কমে আসে। একটা সময়ে মিলিয়েও যায়। বিশ্বকাপ আসতে আসতেই ডিসেম্বরের ক্ষত শুকিয়ে এসেছে। আড্ডায় শোনা যাচ্ছে প্রায়শই, “আরেকবার হয়েই যাবে! ব্যাক-টু-ব্যাক! মেসিদা আছে তো!”  

Post Tags
Developed by DXDasia