এই সৌধের সামনে থেকেই ‘পরশ পাথর’ খুঁজে পেয়েছিলেন তুলসী চক্রবর্তী

লোহার রেলিঙে ঘেরা অযত্নে পড়ে থাকা এই স্থাপত্যের নাম প্যানিওটি ফাউন্টেন

কলকাতা এক স্মৃতির শহর। আবেগেরও। ইতিহাস তার গা জড়িয়ে ওঠা এক কোমল লতানে গাছ। যাকে ছাড়িয়ে দিতে চাইলেও শিকড়ে শিকড়ে রয়ে যায় মাটির নিচে। বিভিন্ন সময়ের ব্যবধানে এ শহরে রাজত্ব করে গেছেন বিভিন্ন মানুষ। কেবল ক্ষমতায় না, নিজেদের কাজ দিয়ে ছাপ ফেলেছেন কলকাতায়। তাঁদের কেউ খুব সাধারণ, কেউ অসাধারণ জায়গা থেকে উঠে এলেও নিজেদের কাজে তাঁরা জায়গা করে নিয়েছেন এই শহরে। দেশের রাজধানী সরে গেলেও বহু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সরে যায়নি এখান থেকে। চেষ্টা করেও সরিয়ে ফেলা যায়নি এত বছরেও। পাশাপাশি কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ বিভিন্ন স্থাপত্য। তার কিছু কিছু এখন হেরিটেজ তকমায়, কিছু রয়ে গেছে তার বাইরেও। অবহেলায় দিন কাটাচ্ছে, সময় বদলে যাচ্ছে, শহরে ভিড় বাড়ছে অথচ বহু নতুন মানুষ জানতেও পারছেন না এসব স্থাপত্যের বাস।

মধ্য কলকাতার হৃৎপিণ্ড যদি ধর্মতলাকে ধরি, যদি কেন, কলকাতা শূন্য অর্থাৎ রাজভবনের ঠিক উত্তর-পশ্চিম কোণে শহরের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বাগান, কার্জন পার্ক। নাম বদলে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি পার্ক ও পরে ভাষা উদ্যান নামে পরিচিত হয়েছে। দেখতে ঝলমলে নয়, জনপ্রিয়তাতেও নিভন্ত প্রদীপের মতো। এই পার্কে ঢুকলে প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে মার্বেলে বাঁধানো চারটি থামের উপর একটি চাল। লোহার রেলিঙে ঘেরা অযত্নে পড়ে থাকা এই স্থাপত্যের নাম প্যানিওটি ফাউন্টেন। যার ছাদের গায়ে লেখা ‘এ গুড নেম ইজ র্যাপদার টু বি চুজেন দ্যান গ্রেট রিচেস’।

কী এই প্যানিওটি ফাউন্টেন? কেনই বা এমন এক স্থাপত্যের এখনও গুরুত্ব রয়েছে ব্যস্ত শহরের বুকে? কেন মেট্রো কনস্ট্রাকশনের দরুণও ভেঙে ফেলা হয়নি এতখানি জায়গা? কেনই বা হেরিটেজ বলে আজও গণ্য করা হবে এই স্থাপত্যকে?

সাল ১৮৯৮, সাধারণ মানুষকে পানীয় জল সরবরাহের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় এই জলের ফোয়ারা। লর্ড কার্জনের সদিচ্ছায় সৌধটির নাম দেওয়া হয় প্যানিওটি ফাউন্টেন। গ্রিক ব্যবসায়ী ডেমিট্রিয়াস প্যানিওটির স্মৃতিতে নামাঙ্কিত এই সৌধ।

ডেমিট্রিয়াস প্যানিওটি, একজন রাইটার হিসাবে বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে যুক্ত হন ১৮৪৯ সাল নাগাদ। ধীরে ধীরে নিজের কাজের গুণে তিনি হয়ে ওঠেন গভর্নর জেনারেল রিপণের প্রাইভেট সেক্রেটারি। নিজের কাজের পুরস্কার হিসাবে মহারানী ভিক্টোরিয়ার হাতে তিনি কম্পেনিয়ন অফ ইন্ডিয়ান এম্পেরর পদবীতে ভূষিত হন। ১৮৯৫ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অন্যান্য ভাইসরয়দের সঙ্গেও তিনি কাজ চালিয়ে যান একই মহিমায়।

আবার আসা যাক সৌধের কথায়। এক দীর্ঘ সময়ের ঝড়ঝাপটা সামলে ও অযত্নের দরুণ খুবই করুণ অবস্থার মধ্যে টিকে রয়েছে এই সৌধ। যেকোনও দিন ভেঙে পড়তে পারে এর ছাদ। পিলারগুলির অবস্থাও খুব যে ভালো তা নয়। অথচ এই সৌধকে নিজের ছবিতে কাজে লাগিয়েছেন কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায় নিজেও। তাঁর ‘পরশ পাথর’ ছবিতে তুলসী চক্রবর্তী এই সৌধের সামনে এসেই খুঁজে পান তাঁর পরশপাথর, এক বৃষ্টির বিকালে। 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসও বদলে চলে ক্রমাগত। ক্ষয় হতে থাকে যা কিছু আমরা ধরে রাখতে পারি না তার। নতুন কোনও কিছু থেকে উঠে আসে ইতিহাস। অথচ একটু স্নেহ, একটু যত্ন দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব আরও অনেক কিছুই। উপেক্ষা থেকে অপেক্ষার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এসব কিছুকেই। ব্যস্ততা, বর্তমান, ভবিষ্যৎ কোনওটিই অনস্বীকার্য নয়। কিন্তু একদিন ইতিহাস ফুরিয়ে গেলে আমাদেরও যে পিছন ফিরে তাকানোর মতো কিছু থাকবে না- তা ভাবার সময় এবার এসে গেছে বৈকি!

তথ্যঋণ – দিব্যেন্দু ব্যানার্জী

Post Tags
Developed by DXDasia