মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আগে কি বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজো হত না?

দুর্গাপুজো করতে না পারার দুঃখে কৃষ্ণচন্দ্র জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করেন

জগদ্ধাত্রী পুজো বাঙালির কার্তিক মাসের উৎসব। মানুষের বিশ্বাস, তিনি দুর্গা এবং কালীর আরেক রূপ। তবে, দুর্গাকে রাজসিক দেবী, কালীকে তামসিক এবং জগদ্ধাত্রীকে সাত্ত্বিক দেবী মনে করা হয়। জগদ্ধাত্রী দেবীর তিনটে চোখ। তিনি চারটে হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক এবং তির ধারণ করে থাকেন। হস্তীরূপী করীন্দ্রাসুরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে দেবীর বাহন সিংহ। দেবী জগদ্ধাত্রী করীন্দ্র নামের অসুরকে বধ করেছিলেন বলে প্রচলিত। তাঁর আরেক নাম তাই করীন্দ্রাসুরনিসূদিনী।

দেবী জগদ্ধাত্রীর পুজো বাংলায় প্রাচীন কাল থেকেই হয়ে আসছে। বরিশাল থেকে জগদ্ধাত্রীর এক পাথরের মূর্তি পাওয়া গেছে, যা খ্রিস্টিয় অষ্টম শতকের বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। ১৫ শতকে শূলপাণি লিখেছিলেন ‘কালবিবেক’ নামের বই। সেখানে জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা বলা আছে। তবে জগদ্ধাত্রী পুজোকে বাংলার অভিজাত ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়।

লোকমুখে শোনা যায়, নবাব আলিবর্দি খাঁকে সময়মতো রাজকর দিতে না পারায় নবাবের লোক মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছিল। যখন তিনি কারাগার থেকে বেরোলেন, তখন দুর্গাপুজোর তিথি শেষের পথে। বিজয়া দশমীর দিন নৌকোয় করে রাজা ফিরছেন বাড়িতে। চারদিকে ঢাকের শব্দ। দুর্গাপুজোয় অংশ নিতে পারেননি, তাই রাজার মনে ভারি দুঃখ। সেই নৌকোতেই ঘুমিয়ে রাজা স্বপ্ন দেখলেন, রক্তবর্ণা চতুর্ভুজা এক দেবী কার্তিকের শুক্লানবমীতে আদ্যাশক্তিকে পুজো করার নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁকে। সেটা ১৭৫৪ বা মতান্তরে ১৭৫৬ সালের ঘটনা। 

এই ব্যাপারে আরেকটা গল্পও প্রচলিত আছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ে।১৭৬৩ অথবা ১৭৬৪ সাল নাগাদ কৃষ্ণচন্দ্র এবং তাঁর ছেলে শিবচন্দ্রকে বন্দি করেছিলেন নবাব মিরকাশিম। নবাব চেয়েছিলেন রাজাকে হত্যা করতে। তখন রাজাকে স্বপ্নে এক দেবী দেখা দেন এবং পুজো করতে নির্দেশ দেন। রাজা কারাগার থেকে মুক্ত হবেন, এই কথাও দেবী বলেছিলেন। তারপর রাজা সত্যিই কারাগার থেকে ছাড়া পেলেন। তান্ত্রিক পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনা করে জানলেন, কার্তিক মাসের শুক্লানবমীতে দেবীপুজোর তিথি আছে। সেই মতোই তিনি পুজোর আয়োজন করলেন। 

অনেকে মনে করেন, আলিবর্দি যখন রাজাকে বন্দি করেছিলেন, তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নে দেবী অন্নপূর্ণাকে দেখেছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি ভারতচন্দ্র দিয়ে ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য লিখিয়েছিলেন। আর যখন মিরকাশিম রাজাকে বন্দি রেখেছিলেন, তখন দেবী জগদ্ধাত্রী তাঁকে দেখা দেন। রাজা মুক্ত হয়ে আয়োজন করেন জগদ্ধাত্রী পুজোর। এরকম আরো বেশ কয়েকটি গল্পই চালু আছে, তবে সেগুলোর মধ্যে ফারাক খুব কম। কেউ বলেন, কৃষ্ণচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করেছিলেন নবাব মিরজাফর। আবার, কান্তিচন্দ্র রাঢ়ী তাঁর ‘নবদ্বীপ মহিমা’-তে জানিয়েছেন, কৃষ্ণচন্দ্র নয়, তাঁর প্রপৌত্র গিরিশচন্দ্রই কৃষ্ণনগরে এই পুজো শুরু করেন।

রাজবাড়ির দুর্গাকে কৃষ্ণচন্দ্র ডাকতেন রাজরাজেশ্বরী বলে। দেবী জগদ্ধাত্রীকেও সেই নামে ডাকতেন তিনি। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র নিজে শুধু জগদ্ধাত্রী পুজো করে থেমে থাকেনি। অধীনস্থ দেওয়ান ও ভূস্বামীদেরও সেই পুজোর আয়োজন করতে আদেশ দিয়েছিলেন। এইভাবে বাংলার অভিজাত সমাজের মধ্যে জগদ্ধাত্রী পুজো ছড়িয়ে পড়ে। সেই সব পুজো ভিড় করে দেখতে জেতেন সাধারণ মানুষরা। মালোপাড়ার বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনাও করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। 

প্রচলিত মত অনুযায়ী, চন্দননগরে জগদ্ধাত্রীপুজো শুরু করেছিলেন ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। ফরাসি সরকারের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ। অবশ্য কিছু গবেষক বলে থাকেন, কৃষ্ণচন্দ্র যখন প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করেছিলেন, ততদিনে ইন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু ঘটে। ড. বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এরকম মতই প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে চন্দননগরে এই পুজোর সূত্রপাত করেন দাতারাম সুর, যিনি ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্রের এক দেওয়ান। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে তাঁর অধীনস্থ সব অভিজাতরাই জগদ্ধাত্রীপুজো শুরু করেছিলেন। দাতারাম ছিলেন তাঁদেরই একজন। বাংলার নানা জায়গার ভূস্বামী ও দেওয়ানরা জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করলেও পরবর্তী কালে কৃষ্ণনগর ছাড়া একমাত্র চন্দননগরের পুজোই কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। 

তথ্যঋণ – বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য, ড. বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

Developed by DXDasia