ফরাসডাঙ্গার জগদ্ধাত্রী পুজো

চন্দননগরের পুজো – আবেগ এবং পরম্পরার প্রতি আস্থা

বাঙালিদের কাছে দুর্গাপূজা যেমন একটা বড় উৎসব ঠিক একইভাবে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজোও তাই। কলকাতার পশ্চিম পারে অবস্থিত চন্দননগর অর্থাৎ  কলকাতার ঠিক উলটো পিঠে। একটু খোলসা করে বলি। এত দিন জানা ছিল কলকাতার যমজ দাদা লন্ডন। কিন্তু চন্দননগর ঘুরতে গেলে মনে হয় এই শহরটি কলকাতার যমজ ভাই। কারণটা কিছুই নয় বাগবাজার, বউবাজার, রাসবিহারি এভিনিউ এইগুলি চন্দননগরেরও খুব ব্যস্ত সমস্ত জায়গা। জলভরা তালশাঁস, মতিচুড়ে মেতে ওঠে আরেক কলকাতা যেখানে দুর্গার দশ হাত রূপের বদলে পূজিত হন মা-জগদ্ধাত্রী। ইনিও সিংহবাহিনী। চার হাতে থাকে চার রকমের অস্ত্রসম্ভার। আসলে বাঙালি মতে এটি প্রকৃত দুর্গাপূজা যা অকাল বোধনে সূচিত হয়নি।

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো-র ছবি দেখতে

চন্দননগরের পুজো দেখার দিকটি হল আবেগ এবং পরম্পরার প্রতি আস্থা। মায়ের রূপের সাবেকিয়ানা এখানে সজীব এবং টাটকা। এখানের কলকাতার কিছু পুজো মণ্ডপকে দুর্গা পুজোরর পর কিনে নিয়ে গিয়ে নতুন করে সাজিয়ে গুছিয়ে লাগানো হয় ঠিকই কিন্তু প্রত্যেকটি মণ্ডপে মায়ের মাথার উপরে লক্ষ্য করা গেল ঝুলন্ত লাল-সাদা কাপড়ের চাঁদোয়া। এখানে বহু মণ্ডপ আছে যেখানে মায়ের গয়না পরানোর রীতি-নীতিও মন ভরে দেখার মত। সিতাহার, কানপাশা, টিকলি, টায়রা, সাতনরি হারের গয়না, ঝুমকোলতা, ময়ূরবেণি, ময়ূরমুকুট সব পরানো হয় মা-কে। সিংহবাহনও একইভাবে নানারকমের গয়নাগাটি পরেন। তাঁর রানিমার্কা মাথার মুকুটটি সব মণ্ডপেই চোখে পড়ে। আসলে প্রাচীন ফরাসডাঙ্গার বনেদি বাড়ির মেয়ে-বউরা ঠিক যে রকম গয়না পরে সাজতেন ঠিক একই ভাবে সাজানো হয় মা-কে। সঙ্গে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম শোলার সাজতো আছেই। তাই এখানে ঠাকুর দেখতে দেখতে প্রত্যেকের মনেই একটা কথাই বারে বারে ঘুরে ফিরে আলোড়িত হয়েছে- মাতৃরূপের পরম্পরাগত আভিজাত্যেই লুকিয়ে রয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব। এই আভিজাত্য, প্রাচীনতা- অভিনবত্বের জোয়ারে কোনরকম সংঘাত সৃষ্টি করে না। কিন্তু মানুষকে স্বস্তি দেয়। মানুষের ক্লান্তি দূর করে।

হুগলী জেলার গুপ্তি পাড়াতেই  প্রথম বারোয়ারি বিন্ধ্যোবাসিনী-তে দেবীর পূজা শুরু হয়েছিল জগদ্ধাত্রী রূপে। সেটিকেই বাংলার প্রথম বারোয়ারি পূজা বলে গণ্য করা হয়। সেই থেকে দিকে দিকে হুগলী জেলা জুড়ে বারোয়ারী জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু হল। পাশা-পাশি ফরাসডাঙ্গার ফরাসি পাড়ার জগদ্ধাত্রী আর কলকাতার ইংরেজ পাড়ার বাঙালিদের মধ্যে ছিল দুর্গাপূজা নিয়ে এক বিপুল প্রতিযোগিতার আবেদন। সেই আবেদন আজও অনেকটাই বিদ্যমান।

চন্দননগরে মায়ের পুজোর যে খরচ তার জন্য চন্দননগরের মানুষের ‘তেজুরি’ রাখাই থাকে। এই তেজুরিকে স্থানীয় মানুষ বলে ঈশ্বর বৃত্তি ফান্ড। সেখানেই টাকা জমা রাখা হয় আর সেখান থেকেই সব খরচ হয়। মাতৃরূপের মধ্যে থাকে দৃঢ় সামঞ্জস্য।

Developed by DXDasia