তাঁর কাজের উদ্যম ও বিস্তৃতি দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়
তারা উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জনজাতি ধিমাল সম্প্রদায়। বহু কিছু হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের সমাজ থেকে। উত্তরবঙ্গের এই অতি প্রাচীন জনজাতিরাও আজ সময়ের নিয়মে হারিয়ে যেতে বসেছে। আর এর মধ্যেই চলছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই সময় তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করছেন পানিঘাটা হাইস্কুলের সাতান্ন বছর বয়স্ক শিক্ষক গর্জেন কুমার মল্লিক।

নকশালবাড়ির কেতুগাবুর জোতে বাড়ি গর্জেনের। ধিমালদের অনেক ভাষা, অনেক শব্দ, অনেক সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। সেখানে গর্জেনবাবু লড়াই করে তৈরি করেছেন ধিমাল কল্যাণ সমিতি। তার মাধ্যমে তিনি ধিমালদের পুরানো অনেক ঐতিহ্যের পোশাক সংগ্রহ করেছেন। লিখতে শুরু করেছেন ধিমাল ভাষার অভিধান। তৈরি করেছেন ব্যাকরণ। হারিয়ে যাওয়া ধিমাল শব্দ সংগ্রহ করে দিনরাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সকলের অলক্ষ্যে। আরও চাঞ্চল্যকর খবর হল, ধিমাল ভাষায় তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেছেন। তার সঙ্গে দশটি রবীন্দ্র সঙ্গীত ধিমাল ভাষায় অনুবাদ করে সেই ভাষায় রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইছেন তিনি। আবার নিজে ধিমাল ভাষায় কবিতাও লিখছেন তিনি। হারিয়ে যেতে থাকা পঞ্চাশটি লোককথা ধিমাল ভাষা ও বাংলায় অনুবাদ করার কৃতিত্ব তাঁর ঝুলিতে।

ধিমালদের নিজস্ব অনেক বাদ্য যন্ত্র হারিয়ে যেতে বসেছে। যেমন, চোঙ্গা মিরদং, পাশিংকোদোতারা, পাশিংকোধোল, তুনজাই, গুমরা, মুচুঙ্গা, তুমনা। সেইসব বাদ্যযন্ত্র নতুন ভাবে তৈরি করার জন্য পাঁচ জনের একটি মিস্ত্রি দল তৈরি করেছেন গর্জেনবাবু। তিনি সেসব বাজাতেও জানেন। মিস্ত্রি দল তৈরি করার পাশাপাশি ধিমালদের মধ্যে নতুনদের নিয়ে শিল্পী দলও তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ২০১৭ সালের ১৩ থেকে ২০ অক্টোবর নকশালবাড়িতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ওয়েস্টবেঙ্গল স্টেট একাদেমি অফ ডান্স ড্রামা মিউজিক এন্ড ভিসুয়াল আর্টস এবং কলকাতার ললিত কলা একাডেমির রিজিওনাল সেন্টার ধিমাল সম্প্রদায়ের বিরল ঐতিহ্যমণ্ডিত বাদ্যযন্ত্র তৈরি নিয়ে এক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করলে সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন গর্জেনবাবু। ধিমাল কম্যুনিটি এক্সিসটান্স প্রিজারভেশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সম্পাদকও তিনি। ধিমাল লোকসংস্কৃতি রক্ষা দলের নেতৃত্ব তাঁর হাতে। দিল্লি সহ অন্যত্র ধিমালদের ওপর তিনি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করে এসেছেন। নিজে ভালো গাইতেও পারেন। শিলিগুড়ি কলেজ থেকে সাধারণ বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক গর্জেন মল্লিক বর্তমানে পানিঘাটা হাই স্কুলে জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক।
তিন বছর আগের এক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, ধিমালদের সংখ্যা এখন সাকুল্যে ১০১০ জন। কুড়ি বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ৫৫৩ জন। আর ডঃ ইছামুদ্দিন সরকার ও অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ের দার্জিলিং তরাই অঞ্চলের মেচ, ধিমল ও থারু সম্প্রদায়ের আর্থ সামাজিক সমীক্ষার এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১৮৪৯ সালে ধিমলদের সংখ্যা ছিল ১৫০০০ জন। ১৯০১ সালে তা ছিল ৬০৭ এবং ১৯১১ সালে তা হয় ৪৪৪।

অনেক লড়াই সংগ্রামের মধ্যে বড় হয়েছেন গর্জেনবাবু। আজ তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ স্বাক্ষর। গর্জেনবাবু ছাড়া ধিমাল সম্প্রদায়ের মধ্যে উল্লেখ করার মতো অনেক শিক্ষিত মানুষ আজ আছেন। অথচ কয়েক বছর আগেও এমন ছবি ছিল না। হরদেব মল্লিক আজ এম কম পাশ করে শিলিগুড়ির একটি নার্সিং হোমে হিসাব রক্ষকের কাজ করছেন। পিঙ্কি মল্লিক বাংলায় অনার্স নিয়ে এম এ পাশ করেছেন। এরকম আরও একটি ছেলে এম এ পাশ করেছে। গর্জেনবাবুর বাড়িতেই তন্ময়ী মল্লিক আজ ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছেন। তাঁর এক নাতনি মনীষা মল্লিক আবার নন্দপ্রসাদ হাই স্কুলে একাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। তবে গর্জেনবাবু নাওয়াখাওয়া ভুলে লড়াই চালিয়ে গেলেও আক্ষেপ করেন, তাঁদের সম্প্রদায়ের অনেক ছেলে এলাকায় কাজ না পেয়ে রাজস্থান, কেরালা সহ অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে। নতুনদের অনেকে পেটের টানে বাইরে ছুটতে থাকায় ঐতিহ্য বজায় রাখতে কবিতা লেখা বা সৃজন কাজে সেভাবে উৎসাহ দেখাচ্ছে না। তাই আর কতদিন ধরে রাখা যাবে বাংলার এই লুপ্তপ্রায় উপজাতিকে, সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ডঃ ইছামুদ্দিন সরকার, অশেষ দাসদের মতো ইতিহাস গবেষক ও লেখকদের মনে।