সেই মেস, ঘনাদা ও তার সঙ্গীদের কোত্থেকে খুঁজে পেয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র?
“না, বাহাত্তুরে কিছু নয়, বাহাত্তর নম্বর সেই বনমালি নস্কর লেন।
সেই ট্রাম, বাস, লরি, মোটর, রিকশা, ঠেলা আর মানুষের ভিড়ের ধাক্কায় যেন টলতে টলতে ছিটকে পড়া নোংরা, সরু, আঁকাবাঁকা গলিটা। সেই উপচে-পড়া ডাস্টবিন আর ঘুঁটে-লেপটানো পোড়ো বাড়ির দেওয়াল বাঁচিয়ে, একবার ডাইনের খাটালের সুবাসে আর একবার বাঁয়ের টিনের কারখানার ঝাঁপতাল সংগীতে দিশাহারা হয়ে খাপরা আর টিনের চালের বস্তির মধ্যে যেন থমকে দাঁড়ানো বেঢপ বেমানান পলস্তারা-খসা সেকেলে বাড়িটা।”
(ঘনাদাকে ভোট দিন, প্রেমেন্দ্র মিত্র)
এমন গলি আর বাড়ির প্রেমে পড়া কঠিন। অথচ সেই অসম্ভব-প্রায় ব্যাপারটাই কেমনভাবে যেন ঘটে গেল একটা বয়সের গাছ-পাথর না থাকা, হাড়গিলে, গুলবাজ লোকের পাল্লায় পড়ে। গুল বলে গুল! অমন তথ্যগর্ভ, জ্ঞানগর্ভ, ইতিহাস-ভূগোল-সমাজনীতি গুলে খাওয়া নির্লজ্জ গুল খুব কম লোকই মারতে পেরেছে এযাবৎ। শুধু গুলের বলেই বছরের পর বছর মেসে নিশ্চিন্তে কাটিয়ে গেছেন মানুষটি। ঘনাদা এখানেই যাকে বলে ইস্পেশাল!
আর, ঘনাদার কথার সূত্র ধরেই বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের দোতলার সেই ঘর থেকে আন্টার্কটিকা, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ভ্রমণ করেছে শিশির, শিবু, গৌর এবং গল্প-কথক সুধীর। সেইসঙ্গে অবশ্য আমরাও। এহেন ভ্রমণের খয়রাতিও দিতে হয়েছে। এই যেমন শিশিরের থেকে ঘনাদা ধার নিয়েছে হাজার হাজার সিগারেট। খাবারের প্রতিও শর্তহীন প্রেম ঘনাদার। সেই প্রেমকে সার্থক করে তোলার দায়িত্বও নিজেদের ঘাড়ে নিতে হয়েছে বাকিদের। তবু, ঘনাদাকে ছাড়েনি কেউ। এই সম্পর্কও বিরল বৈকি!
১৩৫২ বঙ্গাব্দের পূজাবার্ষিকী ‘আলপনা’-তে ‘মশা’ গল্পের সূত্রে প্রথম আত্মপ্রকাশ করলেন ঘনাদা। তারপর, ১৯৮৭-তে লেখা ‘মৌ-কা-সা-বি-স বনাম ঘনাদা’ পর্যন্ত তিনি একইভাবে গেঁড়ে বসে থেকেছেন ওই মেসবাড়িতে। তাঁকে বাড়িওয়ালা তাড়াবে কী, নিজেই মাঝেমাঝে ভয় দেখিয়েছেন মেস ছেড়ে উঠে যাওয়ার। বাকিরা কোনোমতে আটকেছে। এই বিয়াল্লিশ বছরে মেসবাড়িতে সামান্য চুনকাম-সংস্কারের কাজও করা হয়নি, পাছে ঘনাদার অসুবিধে হয়। ঘনাদা এমনই দোর্দণ্ডপ্রতাপ।
এমন চরিত্রের হদিশ হঠাৎ কোত্থেকে পেলেন প্রেমেন্দ মিত্র? প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, “বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প লেখার সময় একজন হিরোর দরকার পড়ল। বিদেশি সায়েন্স-ফিকশনের হিরোকে দেখা যায়, যেমন সে বিদ্যাদিগগজ তেমনই তার গায়ের জোর। আমি হিরো করলাম একজন সাধারণ অন্নভুক বাঙালিকে। সে কলকাতার মেসের ভাত খেয়ে এমন শক্তিমান যে তার মুখের জোরের ধারেকাছে কেউ দাঁড়াতে পারে না।”

অব্যর্থ চরিত্রসৃষ্টি সন্দেহ নেই। শুধু মুখের জোরে দীর্ঘদিন এমন বিখ্যাত হওয়ার নজির সত্যি আর কটা আছে? কেউ কেউ বলতেই পারেন টেনিদার কথা। কিন্তু ভুললে চলবে না, টেনিদা স্বয়ং গুরু মানতেন ঘনাদাকে। আর, টেনিদার গল্পের মেজাজ আলাদা। সেখানে বাংলা সাহিত্যে ঘনাদার মতো মুখসর্বস্ব ওস্তাদের জুড়ি নেই। এমন চরিত্র রক্তমাংসের কাউকে দেখে কল্পনা করাও মুস্কিল। আর এই ঘনাদাকে নিঃস্বার্থ ভঙ্গিতে এতদিন বইলেন যাঁরা, তাঁদের মতো সঙ্গীদেরও বাস্তবে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তবে, বাস্তব থেকেই তাঁদের খুঁজে পেয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। এমনকি স্বয়ং ঘনাদাকেও। এমনকি, সেই বিখ্যাত মেসবাড়িটিও সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত নয়। ঘনাদার গল্পের ভিতরে বোনা আছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের নিজেরও অনেকখানি।
প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন ঘোর অনিশ্চয়তায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। একবার শ্রীনিকেতন ছুটছেন কৃষিবিজ্ঞান পড়তে, আবার ঢাকা যাচ্ছেন বিজ্ঞান পড়তে। সেইসময়ে একাধিকবার এসে থাকতেন ভবানীপুরে গোবিন্দ ঘোষাল লেনের এক মেসে। এই মেসের ছায়াই পড়েছে বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের মেসবাড়িতে। সেই গোবিন্দ ঘোষাল লেনের বাসিন্দা ছিলেন বিমল ঘোষ ওরফে টেনদা (টেনিদা নয়)। প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন তাঁর একান্ত গুণমুগ্ধ। এই টেনদাই যেন উঠে এসেছেন ঘনাদা চরিত্রে। হুবহু মোটেই নয়। আগেই বলেছি, ঘনাদার মতো চরিত্রকে বাস্তবে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবু, টেনদার টেনদার চরিত্রের কিঞ্চিৎ আলো ঘনাদার ওপরে পড়েছিল বৈকি।
ঘনাদার সঙ্গী শিশির, শিবু ও গৌর নামের আড়ালে থাকা বাস্তবের রক্তমাংসের চরিত্ররা তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট। এমনকি, নামের ভিতরেই রয়েছে ইঙ্গিত। এই যেমন শিবু হলেন বিখ্যাত শিবরাম চক্রবর্তী। তাঁর সঙ্গে প্রেমেন্দ্র মিত্রর বন্ধুত্ব প্রশ্নাতীত। শিবরামের নানা বিচিত্র কীর্তিকলাপের কথা লিখে গেছেন প্রেমেন্দ্র নিজেই। শিবরামও প্রেমেন্দ্র মিত্রর প্রতিভার প্রতি মুগ্ধতা উপুড় করেছেন বারবার। যৌবনের বন্ধু সেই শিবরামকেই প্রেমেন্দ্র বুনেছেন ‘শিবু’ চরিত্রে।
গৌর চরিত্রে যেমন বুনেছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক এবং একাধিক গল্প-সংকলনের সম্পাদক গৌরাঙ্গপ্রসাদ বসুকে। আর, যার থেকে কয়েক হাজার সিগারেট নির্দ্বিধায় ধার নিয়েছেন ঘনাদা, সেই শিশির হলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং অভিনেতা শিশির মিত্র। গৌরাঙ্গপ্রসাদের সঙ্গে মিলে বসুমিত্র চিত্র প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন তিনি। এই বসুমিত্রের ব্যানারেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল ‘কালোছায়া’ সিনেমাটি।
এই তিনজনেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর প্রথম যৌবনের বন্ধু, মেসযাপনের সঙ্গী। মেসবাড়িকে কেন্দ্র করে গপ্প ফাঁদার সময়ে তাই সেইসব স্মৃতিকে জড়িয়ে নিতে সামান্য দ্বিধাবোধও করেননি তিনি।
আর, ঘনাদা গল্পের সেই কথক? বেশ কয়েকটি গল্পের পর ‘ধুলো’-তে আমরা প্রথম জানতে পারি তার নাম ‘সুধীর’। এই সুধীর যে আসলে লেখক স্বয়ং, তা বুঝতেও খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয় না। সুধীর প্রেমেন্দ্র মিত্ররই ডাকনাম। ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে ঐ গোবিন্দ ঘোষাল লেনের মেসে থাকার সময়ে হঠাৎই দুটি গল্পের প্লট মাথায় এসে গেছিল প্রেমেন্দ্রর। একরাত্রির ভিতরে গল্পদুটি লিখে পরের দিন পাঠিয়ে দিলেন ‘প্রবাসী’তে। তারপর ফিরে গেলেন ঢাকায়। মাস তিনেক পর কলকাতা থেকে মামা বীরেন সেনের চিঠি এল—“সুধীর, তোর প্রবাসী এলে পড়ে পাঠিয়ে দেব।” অর্থাৎ, প্রবাসীতে মনোনীত হয়েছে দুটি গল্পই। ১৯২৪-এর মার্চ এবং এপ্রিলে যথাক্রমে প্রকাশিত হল ‘শুধু কেরানি’ আর ‘গোপনচারিনী’ গল্পদুটি। প্রকাশমাত্রই সাড়া পড়ে গেল। তবে, এতগুলি কথা এখন বলার একটাই কারণ—‘সুধীর’ ডাকনামের প্রমাণ দাখিল।
ঘনাদা-র গল্পের ভিতরে তাই নিজেকেও গোপনে জড়িয়ে নিয়েছেন স্বয়ং লেখক। এই বিজড়ন আরো ঘন হয়েছে নানা জায়গায়। যেমন, ‘ঘনাদার চিঠিপত্র ও মৌ-কা-সা-বি-স’ গল্পটিতে ছড়ার ধাঁধাঁয় যে ঠিকানাটির উল্লেখ রয়েছে, তা আদতে প্রেমেন্দ্র মিত্ররই বসতবাড়ি। কালীঘাটের গঙ্গার যে পাশটায় আলিপুর কারাগার, তার উলটোপিঠে এই বাসা–
‘নদী না খাল?
তার ওপারে শুরু
লম্বা লাল দেওয়াল।
দেওয়ালের ওখানে কারা?
ওখানে রইল ইশারা।
এখন খুঁজলে বাড়ি
পাবে তাড়াতাড়ি।’
এই বাড়িতেই জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। ১৯৮৪ সালে ঘনাদার কয়েকজন রক্তমাংসের অনুরাগী মিলে এই বাড়িতেই গড়ে তুলেছিলেন ঘনাদা ক্লাব। যে ক্লাব গড়ে তোলার আদর্শ ছিল ইংল্যান্ডের শার্লক হোমস ক্লাব। ‘কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞান’ পত্রিকায় ১৯৮৩-তে এমন ক্লাবের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সিদ্ধার্থ ঘোষ। তিনি, রবীন বল, কিন্নর রায় ও আরো কয়েকজন মিলে এরপর গড়েই ফেলেন ক্লাব।
ঘনাদার মতো এমন চরিত্রর ফ্যান ক্লাব হবে, সেই তো স্বাভাবিক। তবে, সেটি যে তার স্রষ্টার বাড়িতেই গড়ে উঠল তাতে বেশ খানিক অভিনবত্ব আছে বৈকি। অবশ্য এই সমাপতন তো ঘনাদা আর প্রেমেন্দ্র মিত্রর সম্পর্কে স্বাভাবিক। এই সম্পর্কে তো বাস্তব আর সাহিত্যের পার্থক্যটাই আবছা হয়ে গেছে বারবার।
ঠিক যেভাবে সত্য আর গুল-গল্পের পার্থক্যটাকেও অনায়াসে গুলিয়ে দিতেন ঘনাদা।
প্রচ্ছদে ঘনাদার ছবি ‘ঘনাদাসমগ্র ১’-এর প্রচ্ছদ থেকে গৃহীত। শিল্পী: সমীর সরকার। ভিতরের অলংকরণও ওই বই থেকেই নেওয়া। শিল্পী: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য।