শিবরাম চক্রবর্তী-র সাক্ষাৎকার

‘লেখকদের ভেতর আমি এক মজুর, মেহনতি মানুষদের একজন’

'উল্টোরথ' পত্রিকার একটি নিয়মিত বিভাগ ছিল অমিতাভ বসুর ‘দৈনন্দিন জীবনে’; প্রতি সংখ্যায় একজন সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে সাজানো হতো এই বিভাগ। প্রশ্নগুলো পরিকল্পিত বা ছকবাঁধা থাকলেও উত্তরগুলো উপভোগ্য হয়ে উঠত ব্যক্তিবৈচিত্র্যের কারণেই। ১৮৯৩ শকাব্দের মাঘ সংখ্যায় (বর্ষ ২০, সংখ্যা ১১, জানুয়ারি, ১৯৭২) ছাপা হয় শিবরাম চক্রবর্তীর (১৯০৩–১৯৮০) সাক্ষাৎকার। লেখাটিও অমিতাভ বসু-র বয়ানেই।

শিবরাম চক্রবর্তীর কাছে সেদিন সকালে উপস্থিত হলাম―দৈনন্দিন জীবনে বিশেষ রচনার প্রশ্নগুলি নিয়ে উল্টোরথের পক্ষ থেকে। যথারীতি আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল―সকালে আপনি কখন ওঠেন? শিবরামবাবু হেসে বললেন―সেটা সময়-সাপেক্ষ। ঘুম ভাঙলেই ওঠার চেষ্টা করি। কিন্তু রাতভোর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এমন ক্লান্ত হয়ে পড়ি যে সেই ক্লান্তি দূর করতেই আবার একটুখানি ঘুমিয়ে নিতে হয়। এমনি করে করে যখন না উঠে পারা যায় না, খুব খারাপ দেখায়, তখন বাধ্য হয়েই বিছানা ছাড়তে হয়।

সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলাম―সারাদিনে লেখেন কখন? বললেন―লিখতে ইচ্ছে করে না আমার একেবারেই―রাতেই কি আর দিনেই কি। নেহাত না লিখলে নয়, অন্ন জুটবে না, তাই প্রাণের দায়ে, হ্যাঁ, লিখে নাও (কোন মহৎ প্রেরণার বশে নয়) লিখতে হয়। রিকসাওয়ালা যেমন রিক্সা না টানলে খেতে পাবে না, আমারও প্রায় সেই দশা। লেখকদের ভেতর আমি এক মজুর, মেহনতি মানুষদের একজন। মোট নামিয়ে পয়সা কুড়নো, মোটের উপর আমার উপায়, মোটামোটি বলতে গেলে। লিখি আমি পরের দিন, কেননা আমি ভালই জানি, পরের দিন কোন লেখাই আমার টিকবে না।

বললাম, কোন মন্তব্য করব না। কারণ আপনার সব কথাই কি মেনে নিতে পারছি? বরং বলুন আমার আর একটি প্রশ্নের উত্তর―লেখার জন্যে সামনে খোলা জানালা, মাঠ, ফুল, নীরবতা বা শোরগোল এর কোনটার কি আপনার প্রয়োজন হয়?

শিবরাম জবাব দিলেন―এর কোনটারই খুব একটা প্রয়োজন নয়, তবে শান্তির দরকার। সে তো সর্বদাই―কী লেখার সময়, কী ঘুমোনোর কালে। তাছাড়া কাগজ-কলমেরও দরকার বইকি। বিশেষ করে নীলাভ (নাকি, সবুজাভ?) কঙ্কোয়েস্ট্ কাগজ না হলে আমার চলে না―যেহেতু প্রথম বয়স থেকেই দেখে আসছি লেখা ছাপানো এক মারামারি ব্যাপার। সম্পাদককে সহজে কাবু করা যায় না। রীতিমত কঙ্কোয়েস্ট করতে হয়।

এবারে আমি প্রশ্ন করলাম―লেখার কি কোন নির্দিষ্ট আসন আছে?

―হ্যাঁ, আমার বিছানা। শুয়ে, বসে, গড়িয়ে আয়েস করে লিখতে হলে বিছানার মতন আর হয় না।

বললাম, বেশ ভাল বলেছেন। আচ্ছা, দৈনিক কি কিছু পড়াশুনো করেন? এবং পড়লে কি ধরনের বই পড়েন―গল্প, উপন্যাস কবিতা বা প্রবন্ধের বই। দেশী বই বেশি পড়েন না বিদেশী বই? দেশী বা বিদেশী কোন লেখকের বই বেশি পড়েন?

সাহিত্যিক বললেন―পড়াশোনার কোন পাট নেই আমার। সেই ছেলেবেলার থেকেই লেখাপড়ায় অনীহা। পড়ে কি হয়? লিখতে গেলে পড়া হয় না। পড়তে গেলে লেখা মাথায় ওঠে। আমি আশা করি, যাঁরা বদ্ধপরিকর লেখক হতে চান অবশ্যই তাঁরা পড়বেন। বিদ্যার্জনের বেলায় যেমন আগে লেখা (যদিও স্লেট-পেনসিলে) পরে পড়া, সত্যিকারের লেখক হতে হলে তেমনি আগে পড়া, দস্তুরমত পড়া, তার পরেই ওই কলম ধরা। কিন্তু আমার কথা আলাদা। আমি তো সত্যিকারের লেখক নই। হতেও চাইনি। এবং হতেও চাই না কোনদিন।

এবারে জিজ্ঞাসা করলাম―আচ্ছা যেদিন কোন পত্র-পত্রিকাতে আপনার কোন লেখা বেরোয় সেদিনটা কি অন্য দিন থেকে একটু আলাদা মনে হয়―অন্ততঃ মানসিক দিক থেকে? যদি হয়, তাহলে কি ধরনের অনুভূতি মনের মধ্যে কাজ করে একটু বলবেন কি?

―একটু আনন্দ হয় বইকি! আশা হয় যে এবার দক্ষিণাটা পাওয়া যাবে―যে কারণেই আমার লেখাটা। অবিশ্যি আনন্দটা পুরো হয় দক্ষিণার টাকাটা হাতে এলেই।

এর পর আমার প্রশ্ন ছিল, লেখার বাইরে সারাদিন আর কি কাজ করেন? ছবি আঁকা, গানবাজনা, বাগান করা―এর কিছু?

সোজা বললেন―সময় পেলে (এবং পয়সা থাকলে) সিনেমা দেখি। কেননা সুন্দরী মেয়ে ঐ ছায়াছবিতেই যা দেখা যায়। অবশ্যি রাস্তায় ঘুরলেও চোখে পড়ে, কিন্তু প্রথম বয়সের মত এখন আর ঘোরাঘুরিতে উৎসাহ হয় না। গানের ধারে-কাছে যাই না। বাগানে যাওয়ার বাধা নেই; কিন্তু কলকাতায় বাগান কোথায়? না, নিজে বাগান করি না।

প্রশ্ন করলাম―দৈনন্দিন জীবনে কি ধরনের লোকের সঙ্গে মেলা-মেশা করেন?

―সবার সঙ্গে। যাকে পাই তারই সঙ্গে মিশি।

―বাড়ির কোন কাজ আপনি করেন কি? যেমন ধরুন রেশন, দোকান হাট-বাজার, বা বাড়ির ছেলে-মেয়েদের পড়ানো বা ঘর সাজানো?

হেসে বললেন―বাড়িই নেই আমার তো বাড়ির কাজ। তাছাড়া ছেলেদের (যদিও পরের ছেলে) লিখিয়ে-পড়িয়ে মানুষ করার চেষ্টা করে দেখেছি যে তারা মানুষ হতে চায় না, কিছুতেই হবার নয়। তখন এই ভেবে সান্ত্বনা পেয়েছি যে ভাগ্যিস আমার নিজের ছেলেপিলে নেই, তাহলে এই সাময়িক ভোগান্তি সারা জীবন ধরে পোহাতে হত। যে সব ছেলে মানুষ হয় তারা নিজগুণেই হয়ে থাকে, আর যারা খারাপ হয়ে যায় তারা সঙ্গী আর বন্ধুদের দৌলতেই হয়ে থাকে। আর মেয়েদের মানুষ করতে হয় না। তারাই মানুষ করে। ছেলে মানুষ করাই তাদের স্বাভাবিক কাজ। যে সব ছেলে ছোটবেলার থেকেই মেয়ের সঙ্গ পায় তারা ঠিক মানুষ হয়ে যায়। অন্ততঃ পুরুষ মানুষ তো বটেই। মেয়েলী ছেলেদের মতন গায়ে-পড়া হয়ে কখনো কারো যন্ত্রণার কারণ হয় না।

এর পর আমার প্রশ্ন ছিল―প্রতিদিনই আপনার কাছে কেউ না কেউ কিছু নিতে আসেন―যেমন লেখা, বাণী, সার্টিফিকেট বা সভাপতিত্বের প্রতিশ্রুতি। অথচ আপনি এদের কাছ থেকে কি কিচ্ছু নেন না? যেমন ধরুন আপনার কোন কাহিনীর চরিত্র বা কোন চরিত্রের পরিণতি, উপাদান?

শিবরাম বললেন, এর উত্তরে বলব কোন দিনই কেউ আমার কাছে আসে না। আসবে কেন? সভা-টভায় যাই না কখনো―যেতে ভাল লাগে না। ওর জন্যে যোগ্যতা চাই। অন্ততঃ বাক্‌শক্তি আর কর্ণপটাহের―যা আমার নেই। যে-সব অবশ্যকর্তব্য কাজ, যেখানে লৌকিকতা রক্ষার দায়, না গেলে নিতান্তই অশোভন দেখায়, ইচ্ছা সত্ত্বেও সময়াভাবে এবং শারীরিক অসুস্থতার দরুণ (উচ্চ রক্তচাপের হেতু) ডাক্তারের মানার জন্যে যাওয়া হয়ে ওঠে না। বিড়ম্বিত হতে হয়।

শিবরাম চক্রবর্তী থামলেন। আমি আবার প্রশ্ন করি―মনে করুন, কাজের পথে রাস্তায় আপনি কোন প্রসেশানের জন্যে জ্যামে পড়ে আপনার গাড়িতে বসে, বা বাসে-ট্রামে বসে কেবল ঘামছেন আর ছটফট করছেন। অথচ এই প্রসেশান যারা বের করেছেন তাদের আপনি চাঁদা দেন। কিন্তু এই সময় আপনার মানসিক প্রতিক্রিয়া কেমন হয় একটু বলবেন?

―বেশ মজা লাগে। কারণ আমার কোন কাজই প্রায় থাকে না। গাড়ি তো নেই। বরং একবার টিকিট কেটে বাসে-ট্রামে অনেকক্ষণ জায়গা দখল করে বসা যায়।

―এবারে বলুন তো, রাত্রে আপনি কখন শোন?

―ঘুম পেলেই। শোবার আবার সময় আছে? রাত্রেই যে শুতে হবে তার কি মানে? সেটাই যদিও দস্তুর। তা হলেও সকালে, দুপুরে, বিকেলে ঘুমোবার বাধা কী?

―আচ্ছা, আর একটি মাত্র প্রশ্ন। দৈনন্দিন জীবনে সাক্ষাৎকারের এই পরিকল্পনা ও প্রশ্নগুলো আপনার কেমন লাগল? আর এই আমাকে কেমন লাগল?

―দারুণ! দারুণ! প্রচণ্ড ভাল!

(ঋণ – মুক্তাঙ্গন ব্লগ)

Developed by DXDasia