ইউরোপের জর্জ, বাংলার হ্যারিসন

এভাবে আর কোনো পশ্চিমা সঙ্গীতশিল্পী কি বাঙালির সাক্ষাৎ-বন্ধু হয়ে উঠতে পেরেছেন

বলা হয়, শিল্প-সাহিত্যের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। এক দেশ থেকে আরেক দেশে তা ছড়িয়ে যেতে পারে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যা বারেবারেই হয়ে এসেছে। কখনও পাশ্চাত্যের থেকে দু-হাত ভরে আধুনিকতা গ্রহণ করেছে প্রাচ্য, আবার কখনও বা প্রাচ্যের সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছেন পাশ্চাত্যের শিল্পীরা। আর এভাবেই শিল্পের মাধ্যমে, জ্ঞানের মাধ্যমে বন্ধু হয়ে উঠেছে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির ধারা। 

সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের অন্যথা হয়নি। আজ, বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে আমার মনে পড়ছে এমন এক পশ্চিমা শিল্পীকে, যাঁদের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলার যোগসূত্র অস্বীকার করার সাধ্য নেই। তিনি ইংল্যান্ডের মানুষ। সারা বিশ্বের। বাংলারও নয় কি? আজ তাঁর কথাই বলব। বাঙালির হৃদয়ের সঙ্গে তাঁর সখ্যের কথা।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি। ইউরোপে তখন প্রবল সাড়া ফেলেছে নতুন একটা গানের দল। বিটলস্‌। জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, জর্জ হ্যারিসন, টমি মুর, নর্ম্যান চ্যাপম্যান ও আরও কয়েকজনকে নিয়ে জমজমাট ব্যান্ড। অ্যালবাম প্রকাশ হওয়ামাত্রই সুপারহিট। শুধু ইউরোপে নয়, সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে বিটলস্‌-এর খ্যাতি। এর মধ্যেই, বিটলস্‌-এ লাগল ভারতের ছোঁয়া। সৌজন্যে, জর্জ হ্যারিসন। চমকে উঠল পাশ্চাত্য। ভারতীয় রাগসঙ্গীত সম্পর্কে এর আগে স্পষ্ট ধারণা ছিল না ওখানে। ১৯৬৫-তে, বিটলস্‌-রা একটা সিনেমা তৈরি করল। নাম ‘হেল্প’। সেই সিনেমার মিউজিকেই ভারতীয় সঙ্গীতের আবহ প্রয়োগ করলেন হ্যারিসন। অবশ্য এর আগে থেকেই তিনি অল্প-অল্প কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় সঙ্গীতের প্রতি।

তবে অচিরেই জানা গেল, হ্যারিসনের এই উদ্যোগ আসলে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের গৌরচন্দ্রিকা মাত্র। সামান্য কিছুকাল পরেই, হ্যারিসনের আলাপ হয় পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে। রবিশঙ্করের পাণ্ডিত্য, সঙ্গীতজ্ঞান ও দর্শনে মুগ্ধ হলেন হ্যারিসন। তাঁকে সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে বরণ করে নিলেন তিনি। রবিশঙ্করের কাছে শুরু হল সেতার শেখা। 

জর্জ হ্যারিসন পেলেন এক নতুন দিশা। শুধু সুরই নয়, ভারতীয় দর্শনও তাঁর মনে নাড়া দিয়ে গেল। যার পরিচয় আমরা পাব পরবর্তীকালের বিটলস্‌-এর বেশ কয়েকটি গানে। শুধু সেতারই নয় – তবলা, তানপুরা, জলতরঙ্গ, সারেঙ্গি ইত্যাদিও উঁকি দিতে লাগল বিটলস্‌-এর গানে। এমনকি, দলবল নিয়ে ১৯৬৮ সালে হ্যারিসন এসে হাজির হলেন ভারতেও। উত্তরভারতের হৃষিকেশে মহর্ষি মহেশ যোগীর কাছে শিক্ষা নেন তিনি। ১৯৬৮ সালেই হ্যারিসন নিরামিষাশী হয়ে যান এবং পরমহংস যোগানন্দের কাছে ক্রিয়া যোগের দীক্ষা নেন। ১৯৬৯তে  লন্ডনের রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে ‘হরেকৃষ্ণ’ মন্ত্র জপ শুরু করেন। এরপর থেকে হ্যারিসন হরেকৃষ্ণ সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত হন যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল।

কেন এই আত্মিক পরিবর্তন? সঙ্গীতের হাত ধরে প্রাচ্যের যে ছোঁয়া হ্যারিসনের কাছে এসেছিল, তা জীবনে বরণ করে নিলেন কেন তিনি? খ্যাতিরও নিজস্ব ক্লান্তি আছে। ক্লান্তিকে শান্তিতে পরিবর্তিত করতে চেয়েই কি তিনি ভারতীয় দর্শনের সান্নিধ্য বেছে নিলেন? পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। তবু, মূল প্রশ্ন থেকেই যায়…

এরপরেই মনে পড়ে ১ আগস্ট, ১৯৭১-এর কথা। রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। স্থান – নিউইয়র্কের ম্যাসিডন স্কোয়ার। তখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার জন্য লড়ছে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থ। এছাড়াও, শরনার্থীদের কথাও মাথায় ছিল আয়োজকদের। হ্যারিসনের সঙ্গে এই কনসার্টে যোগ দিয়েছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলি আকবর খান, ওস্তাদ আল্লারাখা খান, বব ডিলান, বিলি প্রিস্টন, রিঙ্গো স্টার সহ আরও অনেকে। সেই কনসার্ট থেকে উঠে এল প্রায় ২,৪৩,৪১৮.৫১ মার্কিন ডলার অর্থ। ইউনিসেফের মাধ্যমে পাঠানো হল বাংলাদেশে। বাঙালির বন্ধু হয়ে উঠলেন হ্যারিসন। যে-আত্মিক টান বজায় ছিল মৃত্যু পর্যন্ত।

এ-প্রসঙ্গে আরেকটা কথা না-জানালেই নয়। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মারা যান হ্যারিসন। লিউড ফরএভার সিমেট্রিতে তাঁকে দাহ করা হয়। এরপর তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী, দেহভস্ম কাশীর কাছে গঙ্গা ও যমুনা নদীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এবং আত্মীয়রা হিন্দুরীতিতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।

খানিকটা জেনে, অনেকটাই না-জেনে এবং বেশ কিছুটা শুনে আমার প্রবল বিস্ময় জাগে। এভাবে আর কোনো পশ্চিমা সঙ্গীতশিল্পী বাঙালির সাক্ষাৎ-বন্ধু হয়ে উঠতে পেরেছেন কি? হ্যাঁ, পল রবসনের কথা মনে পড়বেই। তিনি একসময় বামপন্থী বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়েছিলেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সূত্রে। খুব সূক্ষ্ম হলেও, মনে পড়বে বব ডিলান, হ্যারি বেলাফন্টে, উডি গাথরি, লিওনার্ড কোহেন, জন ডেনভারদের কথা। কিন্তু এ-সবই পরোক্ষ। এবং একটা নির্দিষ্ট গোত্রের মানুষের মধ্যেই ছিল আলোড়ন। বাঙালির জন্য, বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইয়ে সাহায্য করার জন্য সূদূর দেশ থেকে যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলেন হ্যারিসন, তা কি কখনও ভোলা যায়!

আমিও কি ভুলতে পারছি সেই দিনগুলোর কথা, যখন পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা বাইশ বছরের এক যুবক ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছে ভারতীয় দর্শন ও সঙ্গীতের দিকে! এবং তার বাকি জীবন কম-বেশি আবর্তিত হচ্ছে সেই ঘোরেই! জর্জ হ্যারিসন আমার কাছে তাই যেন ঢাকায় এক মেসে আড্ডায়-আড্ডায় রাত কাটানো বন্ধু, এক্ষুনি শেষ ওভারে জয় ছিনিয়ে নেবে মাশরাফির দল আর হ্যারিসন আনন্দে গেয়ে উঠবেন – ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ!’

সেদিনের কনসার্টের গান যদি আমার কাছে অন্য আনন্দের কারণ হয়ে আসে, সে-জন্যেও কি হ্যারিসনই দায়ী নন?

Developed by DXDasia