বইয়ের ফেরিওয়ালা থেকে বাংলার অনন্য প্রকাশক

বইয়ের ফেরিওয়ালা থেকে বাংলার অনন্য প্রকাশক

প্রকাশনা কি শুধুই ছাপাখানা? নাকি শিল্প?  প্রশ্ন তুললেন গাঙচিল প্রকাশনা-পরিবারের কর্ণধার অধীর বিশ্বাস। গাঙচিল সর্ব অর্থেই একটি প্রকাশনা পরিবার, যে পরিবারে অধীরের সঙ্গে স্ত্রী অণিমা দুই ছেলে অনন্য এবং অঙ্কন। আছেন লেখক লেখিকা গবেষক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিল্পী, গুণি আর সুনামী ব্যক্তি।  সর্বোপরি অভিন্ন-হৃদয় লেখক-বন্ধু শৈলেন সরকার।  এরা নিজেরা ভাবেন। অন্যদেরও ভাবান। তারই যৌথ ফসল আসে গাঙচিলে। অগুণতি নতুন মুখ, নতুন বিষয়। এগুলোই গাঙচিলের সম্পদ।

এক প্রান্তিক মানুষ। সমাজজীবনে যার পরিচয় ‘অচ্ছুৎ’। তেমন লেখাপড়া হয়নি, পারিবারিক পরিচয়ও বলতে গেলে শূন্য। কলকাতার পথেঘাটে লজেন্স বিক্রি, রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ, বইপাড়ার প্রকাশকের প্রুফ দেখা। সেই থেকে এই আজ। কিছু তো হল! অবিশ্বাস্য সব বই তৈরি হয়েছে। অধীরের বইয়ের বিষয়-উপস্থাপনা, প্রচ্ছদ ডিজাইন, প্যাকেজিং, হরফ ও হরফের মাপ শৈলী সৌকর্য নির্মাণ। আর সেই সঙ্গে প্রধান দৃষ্টি লেখকের লেখনিগুণ, বক্তব্য, গবেষণার মৌলিকতা, নিজস্বতার উপর। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আজ গাঙচিল প্রকাশনা-জগতে গুরুত্বপূর্ণ নাম।

কালো খঠখটে রোগাটে চেহারার  অধীর নিজেও লেখক। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি থেকে পেয়েছেন সুপ্রভা মজুমদার স্মৃতি পুরস্কার। পুরুস্কার তাঁর দেশভাগ স্মৃতিকথা পর্বের ‘আল্লার জমিতে পা’ গ্রন্থটির জন্য। কিন্তু অধীরের লেখার শুরুটা একেবারে অন্য ধাঁচের। শুরুর প্রসঙ্গে বলা যায় যে, সম্পূর্ণ নতুন ধারার ছোটদের লেখায় অধীর এক নিবিড় জাদুকর। যারা তাঁর সেই লেখা পড়েছেন, মানে ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’, ‘ধান মাঠে দারুণ মজা’, ‘বিল্লি লাফাও বিলাই লাফাও’, ‘পানের বরোজে বাঘ’ ইত্যাদি, তাঁরা জানেন কী ভাবে অধীরের এই সব বইয়ের পাতায় পাতায় কীট-পতঙ্গরা কথা বলে, প্রকৃতির গাছপালা, পোকা-মাকড়, পুকুরের মাছ কী ভাবে নিজেদের সুখ-দুঃখের আদান-প্রদান করে, কিংবা কী ভাবে লাল-পিঁপড়ে, কাঠ-পিঁপড়েরা নিজেদের মধ্যে সংলাপ চালায়। এই সংলাপের আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রকৃতিপাঠের এক নিবিড় আয়োজন।

আজ তাঁর লেখায় এসেছে দিক বদল। আজ আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় তাঁর যশোর জেলার মাগুরা গ্রামের স্মৃতি নিয়ে। তাই ক্রমাগত বুনে চলেন নিরন্ন বালকের, অভাবী বালকের স্বপ্ন দেখার কাহিনি। স্বপ্ন, বড় হওয়ার। বাস্তব জীবনচর্যাতেও স্বপ্ন দেখেন অধীর। অধীরের ওপার বাংলার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর নাম নবগঙ্গা। তার একটু দূরেই মধুমতী। মধুমতীর কূলে সাতদোয়ার শ্মশানে মাকে শেষ বারের মতো শায়িত করে ওদেশ থেকে এপারে আসা। ওপারে ছেলেবেলাতে দেখা ধানমাঠ, ফড়িং, প্রজাপতি, উড়ে-যাওয়া বক, সন্ধ্যার কুয়াশা, অপুষ্টিতে মরে যাওয়া ছয় বোন, না দেখা মৃত বোনেদের গল্প, স্কুলের বন্ধু, গ্রামের নদীতে হৈ হৈ স্নান, যাত্রাপালার হুঙ্কার, মুখোশ আর কীর্তন দলের পাচুকাকা আজও অধীরের মনে তাজা ও টাটকা বেঁচে রয়েছে। সেই সবই ওঁর টাটকা দেশভাগের স্মৃতি। বাবা নারায়ণচন্দ্র বিশ্বাস পেশা ক্ষৌরকর্ম।  এই পরিবারে অধীরই প্রথম সন্তান যে ইস্কুল পেরোলেন। এ সব স্মৃতি নিয়েই ১৯৬৭ সালে আয়ুব শাহি জমানার যশোর ছেড়ে কলকাতায় আসা। কিন্তু মন পড়ে থাকে। আজ অধীরের লেখার বিষয় সেই সব স্মৃতিকে প্রতিফলিত করে। ‘দেশভাগের স্মৃতি’ আজ ছয় খন্ডে প্রকাশিত।

‘পদ্মা-গঙ্গা’ নামের একটা লিটল ম্যাগাজিনও ফেরি করতেন কলেজজীবনে। সেখানেই ১৯৭৫ সালে লিখলেন ‘বর্ণমালা’। তার পর বিবিধ লেখা-লেখির ভিতর দিয়ে আনন্দবাজারে আসা। মনে পড়ে আনন্দবাজারের পার্থ বসুর কথা। আনন্দবাজারে লেখা দিয়ে তাঁর লেখাজীবন। তার পর এক দিন সেখানেই সরাসরি সম্পাদকীয় বিভাগে চারশো টাকা বেতনের ঠিকা চাকরি।

লেখকজীবনে বহুবার নিজের পাণ্ডুলিপি খারিজ হতে দেখেছেন নির্বিচারে। কিন্তু ভেঙে না পড়ে শক্ত হয়েছেন। তখন থেকেই ভেবেছেন একটা প্রকাশনা খুলবেন। এ সব ভাবতে ভাবতেই শুরু হল প্রকাশনা। স্ত্রী অণিমা কাণ্ডারী। নেপথ্যে অধীর। শুরুটা ছোটদের জন্য, প্রথম প্রকাশনার নাম ‘দোয়েল’, তার পর ‘বনটিয়া’, তার পর আজকের গাঙচিল।

গাংচিল বাংলার এক অন্য মুখ। প্রান্তিক হয়েও বিশেষ মুখ।  অধীর বিশ্বাস।  

  ছবি : চন্দন ভৌমিক            

Developed by DXDasia