ইন্দো-কলোনিয়াল স্থাপত্যের এক অনন্য শিল্প
উত্তর কলকাতা শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়, আবহমান ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। এখানকার অলিগলি পাকস্থলি জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গল্প। কলকাতা কে, কবে, কীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে- তা নিয়ে বিস্তর মতবাদ বিদ্যমান। যদিও, শহরের কলোনিয়াল রূপের সূচনা যে চার্নক তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরেই- এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ চলে না। সেকালে ঔপনিবেশিকতা সমাজের প্রতিটি বাঁকে ধরা দেয়। তৎকালীন বাবুয়ানি, চলন, সাজ পোশাক, আহারাদি নিয়ে কথা উঠলেও কিছু স্তর যেন ব্রাত্যই থেকে যায়। তেমনই একটি দিক হল উত্তর কলকাতার বাড়ির দরজা। দরজা- সদর- দৈনন্দিন চলা ফেরায় অবিচ্ছেদ্য হলেও, কিছুটা যেন অব্যক্ত থেকে গেছে।
কোথাও সূক্ষ্ম কারুকাজ, তো কোথাও আবার বাহারি নকশা- সেকালের ঐতিহ্যের এক অন্যতম বাহক এই কাষ্ঠ-কপাট। তবে শুধু ধনী বলে নয়, তৎকালীন মধ্যবিত্তের সদরেও ধরা দেয় নব্য স্থাপত্য। মূলত পূর্ব ধারা ও ইউরোপীয় শৈলীর মিশ্রণের ফসল এই ‘ইন্দো-কলোনিয়াল আর্কিটেকচার’।
অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে নব্য ধনীদের অনেকেই কলকাতাভিমুখী। ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ শাসন তাদের প্রভাবিত করেছে। সাহেবদের দেখাদেখি তারা বাড়ি নির্মাণে ব্যস্ত। সেকালে শোভাবাজার, জোড়াসাঁকো, পাথুরিয়াঘাটা জুড়ে গড়ে উঠছে একের পর এক বনেদি বাড়ি। প্রাসাদোপম সেই সব ভবনের প্রথমেই যা চোখে আসে, তা হল- দরজা। কোথাও সূক্ষ্ম কারুকাজ, তো কোথাও আবার বাহারি নকশা- সেকালের ঐতিহ্যের এক অন্যতম বাহক এই কাষ্ঠ-কপাট। তবে শুধু ধনী বলে নয়, তৎকালীন মধ্যবিত্তের সদরেও ধরা দেয় নব্য স্থাপত্য। মূলত পূর্ব ধারা ও ইউরোপীয় শৈলীর মিশ্রণের ফসল এই ‘ইন্দো-কলোনিয়াল আর্কিটেকচার’।
গঠনের প্রসঙ্গে আসতে গেলে শুরুতেই আসে উপাদান। প্রধানত শাল, সেগুন ও মেহগনি কাঠ দিয়ে এগুনি বানানো হত। ফলত দীর্ঘ ঝড়-জল পেরিয়ে তা আজও অটুট। কোথাও কোথাও পাল্লা হত উঁচু ও চওড়া। অনেক সময় এতটাই বড়ো যে, পুরোটা খোলার প্রয়োজন পড়তো না। মূল দরজার ভেতরেই ‘খিড়কি দরজা’ দিয়ে সকলে যাতায়াত করতেন।
যেকোনো দরজার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল তার কড়া বা Door-knocker। উত্তর কলকাতার বাড়িগুলিতে নানা ধরনের কড়া দেখা যায়। সিংহ-মুখ বা Lion-head knocker ছিল বনেদিয়ানার প্রতীক। ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবে অনেকেই সিংহের মুখাবয়ব বিশিষ্ট কড়া লাগাতেন। এটি ছিল গৃহ-মালিকের ক্ষমতা ও আভিজাত্যের প্রকাশ। অন্যদিকে সাধারণ মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে দেখা মেলে ভারী লোহা অথবা পিতলের গোল রিং।
প্রতিটি কড়ার নিজস্ব ভাষা ছিল। প্রাক আধুনিক যুগে এটিই তখন মাধ্যম। কড়া নাড়ার জোর ও ছন্দে, ভেতরের মানুষ বুঝতেন বাইরে কে দাঁড়িয়ে। সাধারণত মৃদু আঘাত ভদ্র সম্ভ্রান্ত অতিথির পরিচয়। অন্যদিকে জরুরি পরিষেবা যথা ডাকবাহক, ভিস্তিদের ক্ষেত্রে শব্দ হত ঘন ঘন। এভাবেই সামাজিকতার অঙ্গ হয়ে ওঠে দরজা।
সুরক্ষার পাশাপাশি নান্দনিকতার দিকেও সমান জোর দেন কারিগররা। সে যুগে কপাটের গায়ে লতাপাতা, ফুল-সহ বিবিধ মোটিফ খোদাই করা হয়। বহু ক্ষেত্রে উপরের আর্চেও তা দৃশ্যমান। তবে অনেক সময় দরজা হত ছিমছাম। সামান্য জ্যামিতিক কিছু আঁক ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। অজানা গলির বাঁকে এমন অসংখ্য নির্দশন আজও দেখা যায়। আপাতত দশটি ছবির কথায় আমরা আসব।
প্রতিটি কড়ার নিজস্ব ভাষা ছিল। প্রাক আধুনিক যুগে এটিই তখন মাধ্যম। কড়া নাড়ার জোর ও ছন্দে, ভেতরের মানুষ বুঝতেন বাইরে কে দাঁড়িয়ে। সাধারণত মৃদু আঘাত ভদ্র সম্ভ্রান্ত অতিথির পরিচয়।

১। জীর্ণ কপাট। বয়সের সঙ্গে রং মজে গেছে। উপরের আর্চ ইন্ডো-ইসলামিক ধাঁচের। তাতে মোটিফ-সহ বাড়ির ঠিকানা খোদিত। দরজার ডান দিকের উপরিভাগে ঘোড়ার নাল গাঁথা রয়েছে। আজও ভাগ্য ফেরাতে অনেকেই তা লাগাতেন।

২। বর্তমানে গ্রিল বসেছে। দুপাশে থাম; তাতে baroque-এর সূক্ষ্ম কাজ বিদ্যমান। মূলত ফুল, লতা ও কিছু মুখাবয়ব স্টাকোর গায়ে খোদিত।

৩। ছিমছাম দরজা। সবুজ রং। আর্চে কাস্ট আয়রনের ফুলকারি নকশা।

৪। কপাটের গায়ে চৌকো ও আয়তাকার ব্লক। আর্চে গ্রিলের কাজ। উপরে লতানো ঢেউ। দুপাশে দুটি থামের গায়েও কারুকাজ দেখা যায়।

৫। তিনটি ব্লকের গায়ে তিন রকমের ছবি। প্রথমে সিংহ, দ্বিতীয়তে ফুল, সবশেষে গৃহ মালিকের নামের আদ্যক্ষর রয়েছে। আর্চে কোনও এককালে রঙিন কাচ ছিল।

৬। একাধিক থাম ও খিলান যুক্ত দরজাটি অপূর্ব। আর্চে ফুল, লতার নকশা। অনেকটা মুকুটের মতো দেখতে। ছবিতে বনেদিয়ানার ছাপ লক্ষ্যনীয়।

৭। কপাটের উপরিভাগ সুবিস্তৃত। তবে জীর্ণ। পাশের বাড়িটি ভেঙে পড়ছে। পাল্লার একদিকের নকশা ঘষে গেছে।

৮। সাধারণ দরজা। বিশেষ কিছু নেই। সম্ভবত কোনও মধ্যবিত্ত ঘরের অংশ।

৯। সন্ধে নেমেছে। দরজার ভাঁজে ভাঁজে আলো আঁধারি। মূল গাত্রে তেমন কিছু না থাকলেও, খিলানটি দেখার মতো। স্টাকোর দারুণ কাজ।

১০। আর্চে পাতার নকশা। কপাটের গায়ে আঙুর-লতা দৃশ্যমান। সেকালে দরজার গায়ে চিঠিবাক্স ঝুলতো। মানুষ চিঠি লিখত একে অপরকে। নববর্ষ, বিজয়া উপলক্ষের সেই প্রথা আজকে মেসেজিং-এর যুগে অতীত।
ক্রমশ বদলে চলেছে কলকাতা। পুরোনো বাড়িঘর ভেঙে তৈরি হচ্ছে প্রাণহীন সব বহুতল। ক্রমবর্ধমান এই ফ্ল্যাট আগ্রাসনের বশে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে একদা হেরিটেজ বাড়িগুলি। ফলে দরজারাও আজ চরম সংকটের মুখে। নিয়মিত বার্নিশের অভাবে ধুঁকছে তারা। মরচে ধরেছে কড়াতেও। অনেক সময় বাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে এই সেগুন কাঠের পাল্লা ও পিতলের কড়াগুলি সস্তায় কিনে নেন অ্যান্টিক ডিলাররা। অন্যদিকে আগামী প্রজন্মও উদাসীন। শহরপ্রেমী কিছু মানুষ বাদে তেমন খেয়াল রাখে না কেউ। অথচ কত ইতিহাসেরই না সাক্ষী এরা। উত্তর কলকাতার এই সদরের টোকা আজও জাগিয়ে তোলে ঘুমন্ত অতীতকে। অতএব, ঐতিহ্যের স্বার্থে এই লোকশিল্প রক্ষা আমাদের কর্তব্য।
__________
ছবি: লেখক