বড়ো সিনেমা ছোটো হল, সিরিজ থেকে রিল এল, এরপর?

পৃথিবীটা নাকি ছোটো হতে হতে…

১। ১৮৯৬ সালে মানুষ প্রথম দেখল কালো ঘরে সাদা পর্দার ওপরে কিলবিল করছে সাদা কালো ছায়া। তা দেখে রোমাঞ্চ জাগলো তাদের মনে। কেউ পালালো ভয়ে, কেউ মজে উঠলো তার ব্যবসায়। কিন্তু সেই শুরু। কেউ ভাবেনি এরকম এক মাধ্যমের বিবর্তনটা ঠিক কেমন হবে। সেই সময় মানুষ জানতো না, এই নতুন মাধ্যম নিয়ে আর কী কী করা যেতে পারে। কিন্তু বিস্ময়ের খামতি ছিল না। যারা মজা পেল তারা শুরু করলো বিবিধ ধরনের এক্সপেরিমেন্ট। (সিনেমা থেকে রিল)

ফরাসি দুই ভাই (লুমিয়ার ভ্রাতৃদ্বয়) বানিয়ে ফেললেন এক অদ্ভুত মাধ্যম, যার নাম ‘ফিল্ম’। সিনেমা কথাটা এসেছে অনেক পরে। ফিল্ম ও ফিল্মের রিল থেকেই এসেছে আজকের খুব চেনা শব্দ “রিল”। লুমিয়ার ভাইদের আবিষ্কার একটা নতুন শিল্পমাধ্যমকে নিয়ে এলো মানুষের সামনে। ইমেজ মেকিং বিষয়টা তার আগেই বাজারে চলে এসেছিল। বিবিধ ধরনের প্রিন্ট-এর মাধ্যমে ছবি তোলা হতো। ডেগারোটাইপ প্রিন্ট বা ফেরোটাইপ প্রিন্ট। ধাতব প্লেটের ওপরে কিছু অম্ল ও মদের ব্যবহারে সেই প্লেটকে আলোককণার উপযোগী করে তুলে একটি বেশ ঢাউশ বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে তাকে আলোর সামনে উন্মোচিত করা। তাহলেই তাতে ফুটে উঠছে সেই বাক্সের সামনে রাখা বস্তুর অবয়ব। এই বিজ্ঞানকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গিয়ে লুমিয়ার ভাইয়েরা আবিষ্কার করে ফেললেন ফিল্ম। এক অদ্ভুত যাদুকল। সেই যাদুকলই আজকের এই বৃহৎ চলমান মিডিয়ার পথিকৃৎ। সেই ইতিহাসের বহমানতা, কোথায় গিয়ে রূপান্তরিত হলো? (সিনেমা থেকে রিল)

প্রাথমিক ভাবে লুমিয়ার ভাইয়েরা ‘রিল’ই বানাচ্ছিলো এবং সেটাই দেখিয়ে বেড়াচ্ছিলো। দৈনন্দিন ঘটনাবলি। মানুষ অবাক হয়ে সেই রিল দেখতো পর্দায়। আচ্ছন্ন হয়ে পড়তো। কিন্তু বেশি দিন তারা রিল দেখে নিজেদেরকে শান্ত রাখতে পারেনি। কারণ মানুষের মন থেমে থাকার নয়।

২।
প্রাথমিক ভাবে লুমিয়ার ভাইয়েরা “রিল”ই বানাচ্ছিলো এবং সেটাই দেখিয়ে বেড়াচ্ছিলো। দৈনন্দিন ঘটনাবলি। মানুষ অবাক হয়ে সেই রিল দেখতো পর্দায়। আচ্ছন্ন হয়ে পড়তো। কিন্তু বেশি দিন তারা রিল দেখে নিজেদেরকে শান্ত রাখতে পারেনি। কারন মানুষের মন থেমে থাকার নয়। মানুষ সব সময়ই ব্যতিক্রম ভেবে এসেছে। ইউভাল নোয়া হারাহারি যেমন বলেছেন, তেমন করে বলি। গাছের মগ ডাল থেকে গুহার অন্ধকার এবং সেখান থেকে কৃষি, এই সম্পূর্ণ চলনটার পিছনে একটাই কারণ। ব্যতিক্রমকে খোঁজা। সেই ব্যতিক্রম খুঁজতে নেমে আমরা পেলাম প্রথম ফিকশন ফিল্ম। গোটা একটা সিনেমা। যিনি বানিয়েছিলেন তিনি ছিলেন আসলে একজন যাদুকর। যাদুকরের নাম জর্জ মিলিয়ে। তিনি বানালেন যাদুর ছবি এবং সেই কল্যানে প্রথম জাম্প কাট আবিষ্কার করলেন। গোদার তখনো জন্মাননি, চার্লি চ্যাপলিনও না।

প্রাথমিক সিনেমা বিষয়টাকে ছোটো পরিসরেই ভাবতে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে একটা লম্বা সময়ের জন্য মানুষকে ধরে রাখার তাগিদ তৈরি হলো বাজারে। প্রাথমিক এই মাধ্যমের সর্বভৌমত্ব থাকতো মূলত পরিচালকের হাতে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অধিকার চলে গেল প্রযোজকের হাতে। বোবা ফিল্মের যুগ কাটিয়ে পৃথিবী ঢুকে পড়লো সবাক চিত্রের যুগে এবং তখন মাধ্যমটা পেল একটা নতুন নাম, ‘ফিচার ফিল্ম’ বা ‘মুভি’। গল্প বলা শুরু হলো ফিল্মের মাধ্যমে। তৈরি হলো বড়ো বড়ো বিলাস বহুল হল বা প্রেক্ষাগৃহ। যেখানে থিয়াটারে আগে মানুষ অপেরা দেখতেন, সেখানে দেখা শুরু হলো বড়ো সিনেমা। মানুষ টিকেট কেটে দেখতে শুরু করলো। প্রয়োজন আনুযায়ী তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো বিশ্বের নানা কোনায়। প্রত্যেকটা মহাদেশে। এবং সব জায়গার মানুষেরা নিজের নিজের মত করে মাধ্যমটাকে নিজেদের দেশের মানুষের নিরিখে ভেঙে গড়ে দেখতে ও দেখাতে শুরু করলো।

আমেরিকায় মূলত তা ছিলো বিনোদনের মাধ্যম। মনে রাখতে হবে মার্কিন সিনেমায় যারা একটা বিরাট রদবদল ঘটালেন তারা জার্মান এক্সপ্রেশনিজম আমলের মানুষ। ফ্রিৎস ল্যাং, এম ডাব্লিউ মুর্নাও প্রমুখ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিতে যখন ভীষণভাবে আর্থিক অনটন চলছে, এবং বাইরে থেকে ফিল্ম ঢোকা বন্ধ, তখন স্বদেশবাসীকে বিনোদন দেওয়ার খাতিরে এক অদ্ভুত বিরল ফর্মের সৃষ্টি হলো। চড়া মেক আপ, ব্যাঁকাচোরা সেট ডিজাইন আর আলো-আঁধারি, এই ছিল সম্বল। টাকা ছিল না ঠিকই কিন্তু ভাবনাও ছিল উর্বর। বিবিধ রকমের হরর ফিল্মের পথ চলা শুরু হল এই এক্সপ্রেশনিস্ট মুভমেন্টের হাত ধরে। মানুষ যে ফিল্মের প্রোজেকশন দেখে অবাক হচ্ছিল উত্তেজিত হচ্ছিল, সে প্রথমবার ভীতির স্বাধ আস্বাদন করলো। অন্যদিকে এর বেশ কিছু যুগ পরে, সোভিয়েত দেশে হলো আরেক রকমের আবিষ্কার। “ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ”। আরেক রকমের ম্যাজিক। কিন্তু এখানে কোনও বাহ্যিক ম্যাজিক নয়, বরং মাধ্যমকে নিংড়ে তৈরি হওয়া একটা রাজনৈতিক চিৎকার। যা থেকে যাবে মানুষের দৃশ্য নির্মানের অবচেতনে।

বলা ভালো আমরা এখন যা কিছু দেখি, ছোটো ছবি থেকে শুরু করে রিল, সবই চেয়ে বা না চেয়ে সেই মন্তাজ নির্মানের পদ্ধতিকেই উদযাপন করার একটা প্রক্রিয়া। কিন্তু মন্তাজের গ্রামার যে মানুষ খুব খুঁজে জেনেছে, বুঝেছে বা পড়েছে তা নয়, তবে নিজেদের মত করে একটা মানে করে নিয়েছে, হয়তো এটাই ছিলো আপাত উদ্দ্যেশ্যটা। তবে এই চলনের ইতিহাসে লুকিয়ে আছে একটা অদ্ভুত ইউটপিয়া, যা এখন খুব একটা ইউটপিয়া আর নেই, বরং এক কঠোর বাস্তবে পরিণত হয়েছে, যা ঘটে গেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে ঘটে চলবে। এই লেখার উদ্দ্যেশ্য হলো, সেই এখনো না ঘটা ভবিষ্যতটাকে ধরা। আগে ভবিষ্যৎ বলতে আমরা নিজেদের সময় থেকে ষাট বা সত্তর বা

একশো বছর পরের সময়ের কল্পনা করতাম। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে, বিশেষ করে কোভিড অতিমারির পরের পৃথিবীতে প্রযুক্তির যে বিকাশ হয়েছে তা ইতিহাসে বিরল। সেই কারনেই ভাবতে হবে কেমন হবে আজ থেকে আর কুড়ি বছর পরের পৃথিবীতে দেখার অভ্যাস?

৩।
মানুষ যখন থেকে পর্দায় গল্প দেখতে শুরু করছিল, পড়ার অভ্যাস সেই তখন থেকেই ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকলো। পরবর্তীকালে এলো টেলিভিশন। এই টেলিভিশন ব্যাপারটা আবার ঘরে ঘরে জায়গা করে নিয়েছিল রেডিওকে কোণঠাসা করে। টেলিভিশন এমন এক মাধ্যম, যাতে শুধু শব্দ নয় ছবিও দেখা যায়। ফিল্ম ও রেডিও, দুটো আলাদা মাধ্যম হলেও, সেই দুই মাধ্যমকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছিল ‘বোকা বাক্স’ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে  ঘরের ভিতর ঢুকে পড়লো বাজার। যে বাজার এতদিন ছিল খবরের কাগজে আর রেডিওর জিঙ্গলে। টেলিভিশনের জন্য তৈরি হতে শুরু করলো বিজ্ঞাপনের ছবি। এটাও একটা অন্য ডিসিপ্লিন। ছোট্ট ছবি। বিভিন্ন সামগ্রী বেচার জন্য ছবি, বিভিন্ন পণ্যের প্রতি চাহিদা তৈরির জন্য ছবি। যা ধারাবাহিকের মাঝে মাঝে চলতে থাকলো। মজার জায়গাটা হলো একটা সময়ের পরে বোঝা গেল না যে, ধারাবাহিকের জন্য বিজ্ঞাপনের ছবি নাকি বিজ্ঞাপনের ছবি যাতে মানুষ দেখে তার জন্য ধারাবাহিক। এই ধারাবাহিকের সঙ্গে এসে পড়লো অন্য ধরনের বিনোদন। “রিয়ালিটি শো”। শুরু হলো গানের আসর। বিখ্যাত গায়কেরা গান গাইছেন, তাঁদের স্বাক্ষাৎকার চলছে। ৯০ দশক শেষ হবার আগেই বাজারে একটা বড়ো রদবদল হলো। হলো বাজারের উদারীকরণ। সেই সূত্র ধরে ঢুকে পড়লো বহু বেসরকারি চ্যানেল। শুধু বিনোদনের চ্যানেল নয়, খবরের চ্যানেল। ২৪ ঘণ্টার খবর। বলে রাখা ভালো এই সমস্ত মাধ্যমের আবিষ্কার ও বিকাশ হয়েছে খবর পৌঁছে দেওয়ার তাগিদে। কিন্তু বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খবর হয়ে উঠলো হলো গৌন ও বিনোদনমূলক, বিজ্ঞাপন হয়ে উঠলো মুখ্য। বিজ্ঞাপনের ছবি ঢুকে পড়তে থাকে টেলিভিশনের আনাচে কানাচে। মানুষ দেখতে থাকল, কিনতে থাকল।

আগামী দিনের যে ছবি মাথায় ভাসে তা হল, ভার্চুয়াল রিয়ালিটির চশমা এঁটে ঘরের কোণে বসে থাকা ক্রেতা। যার কোনও সার নেই, ভাবনার ক্ষমতা নেই, নতুনকে নির্মাণের তাগিদ নেই, সবুজকে অনুভব করার অঙ্গীকার নেই। সে শুধুমাত্র এক আপাত মৃত দর্শক।

৪।
অন্যদিকে, আরেকটা বিষয় ছিল, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। দৈনন্দিনের কথোপকথন। বিষয়টা আগে ছিলো অচলমান, কিন্তু সময়ের তাগিদে তা সচল হয়ে উঠলো। আবার দুটো ভিন্ন মাধ্যম। মানুষের তাগিদ বোধ হলো, দুটোকে এক জায়গায় আনার। প্রয়োজন হয়তো ছিলো না, কিন্তু হলো, খানিকটা হয়তো বাজারের তাগিদে এবং খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একটা পরিবর্তন ঘটলো। টেলিভিশনের চ্যানেলের জায়গায় এলো ইউটিউব এবং টেলিভিশনের জায়গায় এলো স্মার্ট ফোন। মাঝে বাঙালি মোবাইল ফোনকে ‘মুঠো ফোন’ বলতো। এখন সেই নাম কদ্দুর প্রযোজ্য বলা মুশকিল। এই পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু সংযোজন ঘটলো। তার একটি হলো ফেসবুক, একটি হলো ইন্সটাগ্রাম এবং অন্যটি হলো হোয়াটসঅ্যাপ। ২০০৮ থেকে ২০১০-এর মধ্যে এই মাধ্যমগুলির উৎপত্তি। টেলিভিশনের কল্পনা আরো ছোটো হতে থালো। মানুষকে আরেকটু বেশি ঘরকুনো করে তোলা গেল। এখানে যেটা সব থেকে বড়ো যে বদলটা এলো, তা হলো, কন্টেন্ট মেকিং-এর প্রোডাকশনে। আগে যে প্রোডাকশনের জন্য একটা ঢাউস ক্যামেরা লাগত, টেপ লাগতো, বড়ো নন লিনিয়র সম্পাদনার সরঞ্জাম লাগত, সেই সব উধাও হয়ে যেতে শুরু করলো। ডিজিটাল দুনিয়া সব কিছুকেই ছোটো, খাটো ও সহজলভ্য করে দিলো। ভিডিও কন্টেন্ট তো এখন ChatGPT বানিয়ে দিচ্ছে। ঘরের কোণে বসে এখন খবর পড়া যায়, গান গাওয়া যায়, মনের প্রাণের কথা বলা যায়, বিশ্বের নানা বিষয় মানুষকে অবগত করা যায় বিভিন্ন বিষয়ে। সবটাই এখন কোণ-ভিত্তিক। এখন মানুষের পছন্দ ‘কর্নার’। বাজার হয়তো তাই চেয়েছে, কারণ তাতে সামাজিক শাসনব্যবস্থার ওপরে কিছু নিয়ন্ত্রণ আনা যায়।

আগামীতে যা আসবে, তা হলো আরো বেশি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেবার একটা প্রক্রিয়া। কিন্তু কেমন হবে সেটা? পুরো বিষয়টাই একটা আপাত বিচ্ছিন্ন যাপন হয়ে থেকে যাবে? এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাই বোধ করি সব থেকে বেশি ভাবতে বাধ্য করছে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে। যে মাধ্যম একসময় মজা বা বিনোদন-অভিজ্ঞতার আধার ছিল, সেই মাধ্যমে এখন কতটা মজা রয়েছে আর কতটা ট্রমা, তা বলা মুশকিল। এখন স্মার্ট ফোনে তথ্যের পাহাড় ভেঙে পড়ে চোখের সামনে। লেখিকা অরুন্ধতী রায়, তাঁর বক্তৃতায় বার বার বলেন, এত এত তথ্য নিয়ে আমরা কি করবো? প্রয়োজন ছাড়া এত তথ্য ক্ষতিকর। 

তবে আগামি দিনের যে ছবি মাথায় ভাসে তা হল, ভার্চুয়াল রিয়ালিটির চশমা এঁটে ঘরের কোণে বসে থাকা ক্রেতা। যার কোনও সার নেই, ভাবনার ক্ষমতা নেই, নতুনকে নির্মাণের তাগিদ নেই, সবুজকে অনুভব করার অঙ্গীকার নেই। সে শুধুমাত্র এক আপাত মৃত দর্শক।

__________

মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia