আজ বিশ্ব নৃত্য দিবস
“বাবা চায় না যে আমি ঘুঙুর পরে নাচি”— এ-কথার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে গুঁড়ো গুঁড়ো অভিমান। চিত্রাঙ্গদা সিনেমায়, ঋতুপর্ণ ঘোষের ঠোঁটে জড়িয়ে যাওয়া এই ডায়লগ বলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গ পরিচিতির প্রয়োজন হয় না। নারী, পুরুষ, নারীর শরীরে পুরুষ, পুরুষের শরীরে নারী সকলের ক্ষেত্রেই এই কথাটা কমবেশি প্রযোজ্য। ‘ভালো বাড়ির মেয়েরা নাচে না’। ‘ছেলেরা নাচে না’। ‘হিজড়ের মতো নাচছে’। ‘ছোটোলোকদের মতো তো আর আমরা নাচতে পারব না রে বাবা!’ ‘আরে স্পেশাল ব্যবস্থা আছে, নাচা-গানা হবে’। অর্থাৎ, নাচ বিষয়টাকে চিরকালই অত্যন্ত লঘু, নোংরা, খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। সমাজের তথাকথিত এলিট ক্লাসের চোখে যার ইতিহাস সেই আদিপর্ব থেকেই কলঙ্কময়, অমন পিতৃতন্ত্রের শিকল একদিনে ভাঙবে কীভাবে! শিবের নটরাজরূপ সম্পর্কে আমরা কমবেশি সকলেই অবগত। সে এমন এক দামাল রূপ যা ত্রিভুবন লণ্ডভণ্ড করে নৃত্য করে। এর সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং, পুরাণ পড়লে বোঝা যায় প্রলেতারিয়েতদের অধীশ্বর শিব এবং তাঁর নাচ-গানকে কেউই ভালো চোখে দেখতেন না। তবে, শিব কি শুধুই তাণ্ডবনৃত্য করেন? মনসামঙ্গল কাব্যে, চণ্ডী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন স্বয়ং মনসার দংশনে। শিবের অনুরোধে মনসা পুনরায় চণ্ডীর প্রান ফিরিয়ে দেওয়ায়, ভূত-পিশাচ, নন্দী, ডাকিনী-যোগিনী, কার্তিক, গনেশকে নিয়ে শিবে আনন্দে নেচে উঠেছিলেন। চৈতন্য পূর্ববর্তী কবি বিজয় গুপ্ত লিখছেন,
জগৎমোহন শিবের নাচ,
সঙ্গে নাচে শিবের ভূতপিশাচ
আবার, ভরতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল-এ শিবের নাচের উল্লেখ পাওয়া যায় আরেকভাবে—
জয় জয় অন্নপূর্ণা বলিয়া
নাচেন শঙ্কর ভাবেতে ঢলিয়া
এইখানে এসে, এতদিনের গড়ে ওঠা মিথ ভেঙে যায় এক লহমায়। শিব মানেই কেবল তাণ্ডবনৃত্য নয়। আমাদের ঘরোয়া, সংসারী অলস অঙ্গের শিব আনন্দে নেচে ওঠেন তাঁর সঙ্গীসাথীদের নিয়ে। ‘expression of joy through dance’ কথাটির অন্যতম সার্থক উদাহরণ।
‘ভালো বাড়ির মেয়েরা নাচে না’। ‘ছেলেরা নাচে না’। ‘হিজড়ের মতো নাচছে’। ‘ছোটোলোকদের মতো তো আর আমরা নাচতে পারব না রে বাবা!’ ‘আরে স্পেশাল ব্যবস্থা আছে, নাচা-গানা হবে’। অর্থাৎ, নাচ বিষয়টাকে চিরকালই অত্যন্ত লঘু দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে।
কস্মিনকালে কেউ শুনেছে যে ব্রহ্মা নাচ করছেন? বা ইন্দ্র নেচে নেচে আকুলপরাণ হয়ে যাচ্ছেন? না। ইন্দ্রের সভায় মেনকা, রম্ভা, উর্বশীদের মতো অপ্সরা তথা ‘নাচনেওয়ালি’-দের রাখা হত মনোরঞ্জনের জন্য। এই নরক থেকে মুক্তি পায়নি আমাদের বঙ্গকন্যা বেহুলাও। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের ইতিহাস দেখলে বোঝা যাবে যে ওড়িশি হোক বা ভরতনাট্যম, সেসকল ছিল দেবদাসীদের নাচ যা ইংরেজ শাসনকালে গণিকাবৃত্তিতে পরিণত হয়েছিল। এদিকে কত্থক ছিল তাবায়ফ বা বাঈজিদের নাচ। এই সমস্ত নাচ দেখতে আসতেন যারা, তাঁদেরও খুব একটা ভালো চোখে দেখা হত না সমাজে। উনিশ শতকে ব্যালে নৃত্যেও এমন করুণ অবস্থা ছিল। সেই সময়ে ব্যালেরিনাদের অন্যতম বাস্তবতা ছিল গণিকাবৃত্তি। পরবর্তীতে, অসামন্য গুরু ও শিক্ষকেরা ভারতীয় হোক বা ইউরোপীয় নৃত্যের হাল ফেরান এবং সমাজের চোখে সম্মানের সঙ্গে একটি দৃষ্টান্তও রচনা করেন। এই হল সমাজের চোখে, মনে, বিচারবুদ্ধি ও মানসিকতায় নাচ নিয়ে ধ্যানধারণা। আর যারা নাচ করছেন? তাঁদের মন কোন স্রোতে বয়? এইখানে বেশকিছু ভাগ আছে।
একজন নৃত্যশিল্পী যখন নৃত্য প্রদর্শন করেন, তখন তা হয়ে ওঠে তাঁর আত্মার তৃপ্তি। কেশবিন্যাস, বেশভূষার আড়াল থেকে ফুটে ওঠে ‘সব পেয়েছি’-র গল্প। যে মেয়েটি কেবলমাত্র ‘মেয়ে’ হওয়ার মতো দুর্ভাগ্য ঠেলে মঞ্চে উঠে নাচ করছে, যে ছেলেটি পায়ে ঘুঙুর পরার অপরাধে ‘মেয়েলি’ তকমায় নিন্দিত হচ্ছে, নাচ তাদের উপহারস্বরূপ কী এমন দেয়, যার জন্য এমন করে মারের সাগর পাড়ি দেওয়া? নাচ তাদের আত্মবিশ্বাস দেয়। নিজেকে জানার, নিজেকে চেনার। এ এক অসম্ভব রকমের স্বাধীনতা, যার সোওয়াদ বড়ো মিঠা ঠেকে। চিত্রাঙ্গদার সেই অমোঘ লাইন—
এ কী দেখি!
এ কে এল মোর দেহে
পূর্ব-ইতিহাসহারা!
একজন নৃত্যশিল্পী নিজেকে নিংড়ে সবটুকু ঢেলে দেন তাঁর নাচে; তেমনই এর গভীরে গেলে দেখা যাবে যে এর আড়ালে রয়েছে কোনো গভীর মনস্তত্ব বা শৈশবের ট্রমা যা তাঁকে এমন পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে। নাচ অর্থে থেরাপিও, যা নিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে কাজ হচ্ছে।
এরপরেই রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা নিজেকে খোঁজার সমস্ত প্রয়াস নেবেন। নেচে উঠবেন এক কাতরবোধে। আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি… এই যে ‘প্রকাশের লাগি করেছে সাধনা’, এর জন্য মন লাগে। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’-তে ঋতুপর্ণর সেই সাজ মনে আছে? ঠিক অমন। লজ্জা, কুণ্ঠা, ভয় ভেঙে শরীর ও মনের কোষগুলোর হদিশ পাওয়া। কিন্তু এই খোঁজ কেবল, একরৈখিক নয়। সাদা কালোর দ্বন্দ্বে ওড়ে ধূসর পর্দা। নাটালি পোর্টম্যান অভিনীত ‘ব্ল্যাক সোওয়ান’ সিনেমাটির কথাই ধরা যাক। নিনা ওরফে নাটালি, ব্যালের মাধ্যমে প্রিন্সেস ওডেট-এর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারফেকশনের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছিল নিজেকে। সিনেমার শেষভাগে আমরা দেখি, নিজের অজান্তেই সে আঘাত করছে নিজেরই শরীরে। কিন্তু নাচের উন্মত্ততায়, নিজেকে মেলে ধরার আনন্দে তার আর কোনো হুঁশ নেই। রিয়্যালিটি আর ফ্যান্টাসির মধ্যে কনো প্রকার ভেদাভেদ করতে না পেরে একই অঙ্গে সে হোয়াইট সোয়ান থেকে রূপান্তরিত হচ্ছে ব্ল্যাক সোওয়ানে। একেবারে শেষপারের দৃশ্য ছেঁচে মৃত্যুপথযাত্রী নিনা বলছে, ‘আই ফেল্ট ইট। ইট ওয়জ পারফেক্ট’। এটা যেমন ঠিক যে, একজন নৃত্যশিল্পী নিজেকে নিংড়ে সবটুকু ঢেলে দেন তাঁর নাচে; তেমনই এর গভীরে গেলে দেখা যাবে যে এর আড়ালে রয়েছে কোনো গভীর মনস্তত্ব বা শৈশবের ট্রমা যা তাঁকে এমন পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে। নাচ অর্থে থেরাপিও, যা নিয়ে সারা বিশ্বজুড়ে কাজ হচ্ছে। অটিস্টিক শিশু, ডাউন সিন্ড্রোম থাকা শিশু বা প্রাপ্তবয়সকদের ‘ডান্স থেরাপি’ দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে তারা মানসিক আদান-প্রদান করতে পারে।
‘সেন্ট অফ আ ওম্যান’-এ গ্যাব্রিয়েল আনওয়ারের সঙ্গে আল প্যাচিনোর ওই দুর্লভ ব্যক্তিত্বভরা ট্যাঙ্গো নাচ, প্রায় সমস্ত নারীর বুকে ঝড় তুলেছিল যা আজও বহমান। আল প্যাচিনো এক অন্ধ বৃদ্ধ। তাও সে পালকের মত নেচে যাচ্ছে হাঁটুর বয়সি তন্বীটির সঙ্গে। জীবনকে খাদের কিনারে দাঁড়িয়েও আরেকটিবার চেখে দেখতে ক্ষতি কি? আমরা সবেতেই নাচ করি। আনন্দে নাচি। মূলতঃ তাই। দুঃখে নাচেন রাধা বা আনারকলি। তবে হ্যাঁ, যে লোকটি সারাবছর কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনির পরে, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন আকণ্ঠ সোমরসে ডুবে হিন্দি গানে তুমুল নাচে, তাতে নান্দনিকতার অভাব থাকলেও জীবন আছে। অভাবের দুঃখ ভুলে এক মুহূর্তের জন্য বেঁচে নেওয়া। যারা সারাবছর বিভিন্ন দেব-দেবী সেজে, সাঁওতাল সেজে গ্রামে গঞ্জে নাচ করেন, তাঁদের কাছে তা রুটিরুজি। ‘আজ ভালো লাগছে না’ কথাটার বিলাসিতা তাঁদের জীবনে নেই। তেমনই অবস্থা হিজড়া সম্প্রদায়ের। বর্ষা হোক বা শীত, ওই নাচ করেই দু’টো পয়সার মুখ দেখে তারা। মনের ইচ্ছে কতটুকুই বা খাটে সেখানে? নাচ মানুষকে বাঁচার স্বাধীনতা দেয়। অর্থ উপার্জন, সম্মান থেকে শুরু করে হাত-পা ছড়ানো নবজাতকের কারণহীন অনাবিল আনন্দ, সবই এই নাচের ভিতর দিয়ে বয়ে যায় লুকানো ফল্গুধারার মতো। যে ছেলেটি মনে-প্রাণে একজন নারী, সে তার অঙ্গসজ্জা হোক বা নাচের ভঙ্গিমা, সবেতেই আবিষ্কার করে নিজেকে। যে মেয়েটি আসলে চিত্রাঙ্গদার সজ্জা ছেড়ে হয়ে উঠতে চাইছে অর্জুন, নাচ তাকে সেই স্পেসটুকু দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না। বাংলার মাঝিমাল্লা থেকে ভূ-মধ্যসাগরীয় জলদস্যু, নাচ আছে সবখানেই। কেউ অতি আনন্দে নাচে, কেউ নাচে দুঃখ থেকে দু’দণ্ড মুখ ফেরাতে। কেউ নাচে রাজার দরবারে অকপটে প্রেমের দাবী রাখতে, কেউ নাচে নৃত্যের ধারাকে চির অব্যাহত রাখতে। অতি আনন্দে কেউ গান গায় না, ছায়াছবির সংলাপ লেখে না, ছবি আঁকে না। নাচে। এর থেকে নিস্তার নেই কারোর। সেই কারণেই ছাতার পাখির নাচ, শালিক পাখির নাচ বা ফিঙেনাচ মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।
সমাজের চোখে যা খারাপ, কলুষতায় ভরা, সেই নাচকেই সমাজ পরম যত্নে বুকে টেনে নেয় বিভিন্ন ক্ষেত্র ও স্তরে। তা জ্ঞাত না হলেই বা কী! নাচের মাধ্যমে মনে তার সপ্তকের ছিলায় সুর লাগা আসলে পদ্মরাগ মণির আলো…
____________
মতামত লেখকের নিজস্ব