শুধু সংসারে নয়, গোটা সমাজেই নৃত্যশিল্পের ভবিতব্য খুব সহজ নয় : যুগান্ত-এ বুঝিয়েছিলেন অপর্ণা সেন

শেষ পর্ব

প্রায় আঠারো মাসের এক দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর দীপক আর অনসূয়া একে অপরের সঙ্গে ওড়িশার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে দেখা করে। এখানে তারা এক সময় মধুচন্দ্রিমাতে এসেছিল। সেই আসা ছিল যৌবনের উদ্বেলতা-আনন্দের আর আজকের ফিরে আসা যেন দুটি জংধরা মানুষের একে অপরকে চিনে ফেলার আশঙ্কায়। নরম, ভীতু দীপক আজ গম্ভীর, খানিক শুভ্রকেশ পুরুষ আর উচ্ছ্বল, ছন্দসী অনসূয়া এখন ধীর-স্থির, ভাবুক নারী এক। দীপক আর অনসূয়া অনেকটা পাল্টে গেলেও পুরোনো স্মৃতি তাদের পিছু ছাড়ে না। তারা বর্তমানের ঘরে আর অতীতের সমুদ্রে ক্রমাগত চলাচল করতে থাকে। কোন ভুলটা রয়ে গেল? কীসের জন্য একে অপরকে অনেকটা ভালোবাসা সত্ত্বেও একসঙ্গে থাকা হল না? অপর্ণা সেন পরিচালিত যুগান্ত (Yugant by Aparna Sen) চলচ্চিত্রে প্রশ্নগুলো উঠে আসছিল যখন, উত্তরটাও দূরে ছিল না। আসলে একজন সহজ, সরল মানুষ কিংবা গতে-বাঁধা জীবনের সঙ্গে একজন মানুষ যে মনে-প্রাণে শিল্পী, যে বাঁধনহীন হতে চায়, যে সৃজনশীল- তার সহাবস্থান খুব সহজ নয়। অনসূয়া প্রকৃত শিল্পী। তার শিল্পের চর্চা প্রাত্যহিক। এত বছর আগে একজন নৃত্যশিল্পী-চরিত্রের মধ্যে দিয়ে অপর্ণা সেন ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন শুধু সংসারে নয় আমাদের গোটা সমাজেই নৃত্যশিল্পের ভবিতব্য খুব সহজ নয়। প্রতিটি পদে কাঠিন্যের সম্মুখীন হতে হয়।

নিতি নৃত্যে
গত শতকের বিরানব্বই সন নাগাদ আমার প্রথম মঞ্চে ওঠা তাও আবার মেয়ে সেজে। যদিও নাচ যা তোলানো হয়েছিল তা নিখুঁত করেছিলাম। তখন শুধু আমি কেন পরিবারের কেউই বোঝেনি এই নাচের সঙ্গেই আমার সারাজীবনের সম্পৃক্ততা তৈরি হবে। গান শুনলেই নেচে উঠতাম। তবে শুধু আমি নই, আমার ছোটদি, বন্ধু রাকেশ-পনি-রুমকি, নূপুর, ছোটদির বন্ধু টুম্পাদি, সুতপাদি- আমরা সবাই মিলে আমাদের কোয়ার্টার্সের সিঁড়িতে ছোটো ছোটো অনুষ্ঠান করতাম। সেগুলো বেশিরভাগই নাচের অনুষ্ঠান। তখন আমাদের মধ্যে নাচ ছিল আনন্দ করবার উপলক্ষ্য। খেলাধূলা যেমন করতাম, নাচও করতাম। এবং তাতে আমাদের অভিভাবকদের সমর্থন থাকত। ওই আবহে কখনও দেখিনি ছেলে বলে কেউ নাচতে মানা করছে বা মেয়ে হলে খেলা করা যাবে না এমন কেউ বলছে। আমি মনে করি নাচের প্রতি আমার ভালোবাসা ওই অপূর্ব এক ছোটোবেলা না পেলে তৈরি হত না। আমার বড়ো দিদিরা নাচের অনুষ্ঠান হলে টিফিন বানিয়ে নিয়ে যেত। মালা আর সাজের অন্যান্য সামগ্রী কিনে আনত। অনুষ্ঠান শুরু হলে দাদা আবার কোত্থেকে এসে সাউন্ড যে চালাবে তার পাশে এসে বসেপড়ত যাতে ক্যাসেট বন্ধ হয়ে মঞ্চে চলা ভাইয়ের নাচ কোনও ভাবে ব্যাঘাতপ্রাপ্ত না হয়।

কে যে নাচে
কিন্তু স্কুলে যখন আমাদের নাচ-গানের একটা জোয়ার এল তখন দেখতাম কোনও কোনও অভিভাবক বলতেন ছেলেদের নাচা ঠিক নয়! আমাকে সরাসরি কেউ কখনও টিটকিরি করেনি কিন্তু আমারই সতীর্থ অন্য একটি ছেলেকে শুধুমাত্র নাচ করে বলে স্কুলের উঁচু ক্লাসের দাদারা ‘হোমো’, ‘লেডিস’, ‘ছক্কা’- এসব বলতো। তাতে নিশ্চয়ই সেই বন্ধুর পাশাপাশি আমারও খারাপ লাগত। একটা শিশু, আমার সেই বন্ধু কী অপূর্ব নাচত অথচ প্রশংসার পরিবর্তে তার জুটত গালমন্দ। সেই শৈশবকে কি আর সুন্দর বলা যায়? আমার সেই বন্ধু এক সময় আর নাচ করলই না অথচ আমি টিকে গেলাম। স্কুলের বাংলা ম্যাডামের কাছে স্কুলের নানা অনুষ্ঠানের জন্য নাচ তুলতে তুলতে এক সময় বাড়ির কাছের একটি নাচের স্কুলেই ভর্তি হয়ে গেলাম। তখন ক্লাস সিক্স-সেভেন।

তা তা থৈ থৈ 
নাচের স্কুলে প্রথম দিন যে নাচটা শেখানো হয়েছিল সেটা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘মম চিত্তে’-র ওপর। নাচের দিদি অল্প শিখিয়ে পাশের ঘরে গেলেন আর বাকিটা শেখালো ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট সীমাদি। সেই শুরু। তারপর ভরতনাট্যম শেখা হল, ওডিসি শেখা হল, কথক শেখা হল। নাচের ফি-বছর পরীক্ষা চলতে থাকল। থিয়োরি-প্র্যাক্টিক্যালে ডিস্টিঙ্কশন এলো। সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর নানা রকম লোকগানের ওপরও নাচ তোলানো হত আমাদের। প্রোগ্রাম করতে পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে ঘুরতাম। তখনও কেবলমাত্র একটি শাস্ত্রীয়নৃত্যকে আঁকড়ে জীবনে এগিয়ে চলার শিক্ষা আমরা পাইনি। তারপর হুড়মুড় করে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক এসে গেল। নাচের চর্চা আর হল না। গ্র্যাজুয়েশন হল। মাস্টার্স হল। শিক্ষকতার চাকরিও হল। কিন্তু নাচ আর তেমন হল না।

কী আনন্দ কী আনন্দ 
তারপর চাকরির তিন-চার বছরের মাথায় একটি ধর্মীয় সংগঠনের বার্ষিক রথযাত্রায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভার এসে পড়ল আমার ওপর। সেটা আমার নতুন জীবন। শহরের নানা কিসিমের নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে আলাপ হতে শুরু করলো। আমি নাচ করতাম না ঠিকই কিন্তু শিল্পী সংগ্রহের জন্য এত জায়গায় যেতাম, সমাজ মাধ্যমে এত নাচ দেখতাম যে নৃত্যশিল্পীরা আমার ঘরের মানুষ হয়ে গেলেন। সেই অনুষ্ঠান চলছে আজ নয়-দশ বছর। নৃত্যশিল্পের আজকের সমস্যাগুলো, শিল্পীদের পথের বাধাগুলো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত। এখনও তাই হয়। তখনই মনে হত এঁদের নিয়ে লেখা যায় না? আমার নিজের তেমন আর্থিক সঙ্গতি নেই যে একটা সংগঠন শুরু করি। তেমন নৃত্যশিক্ষা নেই যে গুরুগম্ভীর বই লিখি নাচ নিয়ে। কিন্তু এই যে সমস্ত শিল্পীদের সঙ্গে ওঠা-বসা, তাঁদের সুখ-দুঃখের রোজনামচা- এগুলো তো আমি জানি, এগুলো নিয়ে লিখলে কেমন হয়? কিন্তু লিখব কোথায়? আর সে তো অনেক লেখা। এতদিন ধরে পারব লিখতে?

নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু
এর দু-এক বছর পর বঙ্গদর্শন.কম থেকে প্রস্তাব দেন পোর্টালের কন্টেন্ট হেড সুমন সাধু। সুমন সুপরিচিত কবি। তিনি আমার থেকে বয়সে ছোটো হলেও আমি বহু বছর কলকাতা বইমেলায় তাঁকে দেখতাম লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতে। এই তিনিই যে আমাকে কলকাতা কেন্দ্রিক বিভিন্ন নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে, নৃত্যশিল্প নিয়ে লেখালেখির একটা ধারাবাহিক সুযোগ দেবেন, তা কখনও ভাবিনি। যখন শুরু করেছিলাম তখন মনে করিনি পঁয়ত্রিশের বেশি পর্ব লিখে ফেলব। আরও অনেক শিল্পীদের নিয়ে লেখা বাকি রয়ে গেল। নৃত্যশিল্পের আরও অনেক উচ্চাবচ নিয়ে আলোচনা হবে কিন্তু এবারে থামব। এইসব লেখা লিখতে গিয়ে অনেক নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, নৃত্যশিল্পের বহু গলিখুঁজির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, অনেক মুখের আনন্দ দেখেছি আবার বহু জমানো কান্না ধরে রাখতে হয়েছে মুঠো ভরে। সেগুলো সংগ্রহে থাকল ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু এই লেখার সুযোগ না হলে এসব হত না। নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে আরও লেখা নিশ্চয়ই আরও অনেকে লিখবেন।

সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে
দীপক আর অনসূয়া একবার সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটছে। অনসূয়া ছুট্টে সমুদ্রে চলে যায়। সমুদ্রের জলে নিজেকে বেশ খানিকক্ষণ ডুবিয়ে সে ফেরে একটা সাগরশঙ্খ নিয়ে। দীপকের কানের কাছে ধরে জানতে চায় সে কিছু ওই শঙ্খের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছে কী না। দীপক না বলে। আর সে যখন উল্টে একই কথা অনসূয়াকে জিজ্ঞেস করে, অনসূয়া বলে ওঠে, ‘দেখবে?’ এই বলে সে সমুদ্রের তীরে নাচের নানা ভঙ্গিতে শরীর দোলাতে থাকে। খোলা নীল আকাশ, বিরাট সমুদ্র আর তার মধ্যে সাদা পোশাকে অনসূয়ার নাচ, অপূর্ব একেকটি মুদ্রা প্রক্ষেপণ। প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে অনসূয়া। সে নাচকে এতই ভালোবাসে! সমুদ্র বোধহয় এ-কথাই তাকে বলেছিল- ‘নাচে থেকো’। শৈশবের স্মৃতিরা যখন ভিড় করে আসে, তারুণ্যের সেই সব নৃত্যানুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে আর বন্ধুদের হাসিকান্না ভরা আমার দুটো মুঠি যখন আলগা করি তখনও যেন কেউ আমার কানে এসে বলে যায়, ‘তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈথৈ…’। এইসব কথাগুলোও হয়তো কোনওদিন লেখা হবে। সে-লেখা আমার হোক আর নাই হোক। সকলকে ধন্যবাদ।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – ‘নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু’ শেষ হল।

Written by