শব্দ-গল্প-ঘুম

১৯১৮ সাল থেকে জ্বলছে এক উনুন, তাতে চা হচ্ছে, পাশে পিঠ পুড়ে যাচ্ছে পাউরুটির

কালিদাস রায়-এর ‘ছাত্রধারা’ পড়লে যে ক্লাসঘরটি চোখে ভাসে আমাদের, তার ফ্যাক্সিমিলি করলে যেন এসে দাঁড়ায় বইপাড়ার ‘ফেভারিট কেবিন’। একটা পুরোনো সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা কড়ি-বরগার ছাদ, ঠাণ্ডা ঘর আর শ্বেত পাথরের গোল টেবিলে কাঠের পায়া। ১০০ বছর পার করেও যে টেবিলে একই শব্দে কাপ প্লেট নেমে আসে এখনও। চেয়ারও যে কয়েকটি রয়ে গেছে তারা লড়ে যাচ্ছে রীতিমতো। আর রয়েছে পুরোনো সেই পাখা, বুড়ো বটের মতো শান্ত সে পাখা স্নেহশীলতায় কোনও প্রবীণ কবির চেয়ে কম নয় কোনও অংশে। জমায়েত বা আড্ডাকে ভিড় ধরে এগোলে, তাই বা বদলালো কই! কেবল প্রজন্ম বদলে যাচ্ছে, মুখ বদলে যাচ্ছে টেবিলে। কেবিন বদলাচ্ছে না, বদলাচ্ছে না নূতনবাবু-গৌর বাবুদের আতিথেয়তা। 

‘বর্ষে বর্ষে দলে দলে আসে বিদ্যামঠ তলে,
চলে যায় তারা কলরবে,
কৈশোরের কিশলয় পর্ণে পরিণতি হয়
যৌবনের শ্যামল গৌরবে।’

১৯১৮ সাল থেকে জ্বলছে এক উনুন, তাতে চা হচ্ছে, পাশে পিঠ পুড়ে যাচ্ছে পাউরুটির। কেউ যত্নে তুলে পোড়া পিঠের ফোসকা চেঁছে তাতে মাখনের মলম লাগিয়ে এগিয়ে দিচ্ছেন টেবিলে। আজ থেকে ১০০ বছর আগে নূতনচন্দ্র বড়ুয়া ও গৌর বড়ুয়া দুই ভাই ওপাড় থেকে এসে খুলে বসেন ৬৯ বি সূর্য সেন স্ট্রিটের এই কেবিন। চা টোস্টের দাপটে যা এক শতাব্দীর রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে ঋজু দৃঢ়তায়। ভাবতে অবাক লাগে আজ গিয়ে যে চার নম্বর টেবিলে চেয়ার টেনে বসব সে টেবিল নজরুল ইসলামের গান শুনতেন সুভাষচন্দ্র বসু। এমন সব কিংবদন্তীর  স্পর্শ পেয়েছে এ কেবিন কোনও এক সময়। শুধু তাঁরাই কেন, গত এক শতাব্দীতে যে কয়েক লক্ষ মানুষের সেবা করেছেন এঁরা তাঁদের অনেকেই হয়তো নিজের নিজের ক্ষেত্রের দিকপাল ছিলেন। 

আর? নকশাল আমলের অস্থিরতা দেখেছে ফেভারিট কেবিন, উত্তপ্ত কলকাতায় জেনে বা না জেনে আশ্রয় দিয়েছে একটা গতিকে, একটা বিপ্লবকে… সেই নকশালবাড়ির ৫০ বছর উদযাপিত হল ফেভারিট কেবিনের শতবর্ষের আগের বছরে। 

দোকানের দায়িত্ব দুই পুত্রের কাঁধে দিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলেন নতুনচন্দ্র। ১৯৮৭ সালে তাঁর অনুপস্থিতি থেকে শক্ত হাতে হাল ধরলেন দিলীপ বরুয়া ও বাদল বরুয়া। দুধ চা, লেবু চা, কড়া টোস্ট, জেলি পাঁউরুটি, কাটা কেক, পান কেকের সবই এখনও ছাত্রছাত্রীদের আওতার মধ্যে৷ সাধ্য থাকলেও ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে রাজি নন এই দু-ভাই। তাঁরা বলেছেন খদ্দেরদের দাবিতেই কোনও জাঁকজমক না এনে একই ঐতিহ্যে তাঁরা সনাতনী কায়দাই বজায় রেখেছেন এতকাল। ফেভারিট কেবিন হেরিটেজ তকমা না পেলেও তাকে কলেজস্ট্রিটের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। অস্বীকার করা যাবে না বাংলা সাহিত্য থেকেও। 

জানা যায় আরেক মজার ঘটনা। ৭০ সাল নাগাদ চিনির দাম বাড়ার কারণে চা-এর দাম ২৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৩০ পয়সা হয়। এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাগজের দপ্তরে চিঠি লেখেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁদের রোজের খদ্দের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় বসতেন কোণার দিকের এক টেবিলে। দোকান কর্তৃপক্ষ সেই চিঠির কপি আজও সযত্নে তুলে রেখেছেন ব্যক্তিগত সংগ্রহে। 

এমন ভিড় করে আসা স্মৃতির মাঝখান থেকে আমরা চা আর পান কেক খেয়ে বেরিয়ে আসি এই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে। ক্যাশ কাউন্টার থেকে খুচরো টাকার সঙ্গে ফেরত আসে একগাল হাসি। বুঝতে পারি ও হাসি এক শিক্ষকের হাসি, ছাত্রদের বড়ো হতে দেখার।  

“ব্যক্তি’ডুবে যায় ‘দলে’, মালিকা পরিল গলে
প্রতি ফুলে কে-বা মনে রাখে?’

Developed by DXDasia