নন্দলাল বসুর হাতে আঁকা পোস্টকার্ডের প্রদর্শনী কলকাতায়
“শিল্পী ও মানুষকে একত্র জড়িত করে আমি নন্দলালকে নিকটে দেখেছি। বুদ্ধি, হৃদয়, নৈপুণ্য অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টির এরকম সমাবেশ অল্পই দেখা যায়।” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পতঙ্গ থেকে হাতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের কোনও মুহূর্ত অথবা ভবিষ্যৎ কাজের খসড়া। কোথাও “একটা প্রকাণ্ড কুমির ওৎ পেতে বসে আছে”। আবার কোনও ছবিতে, এক মহিলা দরজার সামনে বসে সুপারি কাটছেন। ছেঁড়া কাগজের টুকরো হয়ে উঠছে পাখি কিংবা মানুষ। বিধিবৎ, নিয়মনিষ্ঠ শিল্পীসত্তার পাশাপাশি একান্ত ব্যক্তিগত শিল্পমননের প্রকাশ নন্দলাল বসুর পোস্টকার্ড-এর আঁকায়। ৩.৫ x ৫.৫ ইঞ্চির ছোট্ট পরিসরে দেখা মেলে নন্দলাল বসুর আঁকা একাধিক স্কেচ, বড়ো কোনও কাজের খসড়া এবং আরও অনেক কিছু। জানা যায়, নন্দলাল ফাঁকা পোস্টকার্ড কাছে রাখতেন সবসময়। কোনও দৃশ্য বা বিষয় মনঃপুত হলেই চটজলদি এঁকে নিতেন। ভ্রমণের সময়, স্থানীয় পরিবেশের কোনও উপাদান ভালো লাগলে সংরক্ষণ করে নিতেন পেন কিংবা পেনসিলের আঁচড়ে।

নন্দলাল বসু ফাঁকা পোস্টকার্ড কাছে রাখতেন সবসময়। কোনও দৃশ্য বা বিষয় মনঃপুত হলে চটজলদি এঁকে নিতেন। ভ্রমণের সময়, স্থানীয় পরিবেশের কোনও উপাদান ভালো লাগলে সংরক্ষণ করে নিতেন পেন কিংবা পেনসিলের আঁচড়ে।
শান্তিনিকেতন, বরোদা, গোপালপুর প্রভৃতি স্থানের স্মৃতি বিজড়িত হয়ে আছে ছবিগুলি। ছোটো ছোটো কাগজের টুকরোগুলিতে পাওয়া যায় – ‘হেলা-ফেলার কাজ’, জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর শিশুতোষ নাটক ‘টাক ডুমা ডুম’-এর ইলাস্ট্রেশন, পরিবার ও ছাত্রদের উদ্দেশে পাঠানো স্কেচ। ১৯৩০-এর দশক থেকে ‘৫০-এর দশক পর্যন্ত আঁকা অজস্র পোস্টকার্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নন্দলালের পরিবার, ছাত্রদের কাছে। এই ছবিগুলির মধ্যে দিয়েই যেন শিল্পীর ব্যক্তিসত্তাকে আরও একটু ভালোভাবে অনুধাবন করা যায়। আর্ট এক্সপোজার (Art Exposure)-এর উদ্যোগে তেমনই কিছু পোস্টকার্ড সংগ্রহের একটি প্রদর্শনী চলছে কলকাতার বুকে। ৪ জুলাই থেকে ২৮ অগাস্ট ২০২৬ পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী: Nandalal Bose: Postcards & more।

পেন্সিল ও পেনের স্কেচ, জলরঙে আঁকা ছবি, কোলাজের কম্পোজিশন ছাড়াও একটি ছোটো তেলরঙের চিত্র ও একটি ‘এচিং অন পেপার’ এই প্রদর্শনীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নির্ভুল এবং মার্জিত স্ট্রোকের দক্ষতা ও রেখার কোমনীয়তায় নন্দলালকে খুঁজে পাওয়া যায় অনায়াসে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলি ততোধিক দ্রুততার সঙ্গে সংরক্ষণ করেছিলেন শিল্পী। সময়ের পরিবর্তনশীলতা এবং গতিবেগ তুলির আঁচড়ে ধরা পড়েছিল স্বচ্ছন্দে। ১৯৩৫-এ আঁকা দোলনা, ১৯৪৭-এ আঁকা সমুদ্রতটের ছবিগুলি সময়ের প্রতীতিকে প্রকাশ করে অপরূপ সৌন্দর্যে। একাধিক জীবজন্তুর অবয়ব পাওয়া যাবে বিভিন্ন পোস্টকার্ডে। বিভিন্ন স্থানে বসে আঁকা সেই ছবিগুলি শিল্পীর গভীর পর্যবেক্ষণ ও শৈল্পিক দক্ষতার পরিচায়ক। এই তালিকায় দেখতে পাবেন উট, কাঠবিড়ালি, কুমির, হাতি, জলহস্তি। তবে, এই সর্বাধিক দৃষ্টি আকর্ষণ করবে একটি প্রেয়িং ম্যান্টিস। লতার ডগায় শিকারের অপেক্ষায় থাবা বাড়িয়ে রয়েছে সে। শিল্পীর পর্যবেক্ষণে ও দক্ষতায় পতঙ্গটির প্রতিটি নখ পর্যন্ত নিপুণভাবে অঙ্কিত। পাশাপাশি, কালির আঁচড়ে মানুষের অবয়ব ধরা পড়েছে একাধিক পোস্টকার্ডে।

প্রদর্শিত মোট সাতাশটি শিল্পকর্মের মধ্যে বিশেষ কয়েকটির নেপথ্য কাহিনি না জানলেই নয়। এরকম ছবির তালিকায় প্রথমেই উল্লেখ্য, ১৯৩০ সালের একটি পোস্টকার্ড। জলরঙে আঁকা ছবি। সেখানে উল্লম্বভাবে দাঁড়িয়ে আছে দুটি পাথর। গাছে ছোটো ফুল ফুটেছে, পাখিরা বসে আছে ডালে। কার্ডে নিচে ডানদিকে লেখা ‘চিত্রনিভাকে’। নন্দলাল বসুর ছাত্রী ছিলেন চিত্রনিভা চৌধুরী। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নন্দলাল বসুর ছাত্র। পরবর্তী সময়ে তিনিই কলা-ভবনের প্রথম মহিলা শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কুমিরের ছবিটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বরোদায় কীর্তি মন্দিরের ম্যুরাল আঁকার কাজ তখন প্রায় শেষের পথে। বিশ্বামিত্রী নদীর তটে বসা একটি কুমীর দেখে ছবিটি এঁকেছিলেন নন্দলাল। কুমিরটির বসে থাকার ভঙ্গি বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। নন্দলালের আঁকা জীবজন্তুর অন্যান্য ছবিগুলি বাস্তবতার মাটিতে দৃঢ়ভাবে গ্রোথিত হলেও এই ছবিটিতে কুমিরের সামনের পা দুটি বাস্তবের চেয়ে একটু বেশিই প্রকট। ডান পাশে লেখা, “একটা প্রকাণ্ড কুমির ওৎ পেতে বসে আছে”। লেখাটির উপরে ছোটো করে আঁকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘ইউনিয়ন জ্যাক’। আঁকার তারিখ ১৯৪৬ সালের ১৮ অক্টোবর। ছবির বিপরীতে লেখা চিঠিতে শিল্পী জানাচ্ছেন, বরোদা সে সময় শান্ত হলেও পূর্ববঙ্গের নোয়াখালিতে দাঙ্গার আগুন তখন দাউদাউ করে জ্বলছে। ছবিটি দেশ-কাল সম্পর্কে শিল্পীর ব্যক্তিগত ভাবনার পরিচায়ক। নদীতটে বসে থাকা কুমিরটি শিল্পীর কল্পনায় হয়ে উঠেছিল ভারতবর্ষের প্রাক স্বাধীনতা পর্বের চরম অস্থিরতার দ্যোতক।
প্রদর্শনীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নন্দলাল বসুর তিনটি ‘হেলা-ফেলার কাজ’। ১৯৫২ সাল নাগাদ ছাত্রদের কম্পোজিশন শেখাতে হঠাৎই এই আবিষ্কার। সাগরময় ঘোষকে লেখা একটি চিঠি থেকে জানা যায়, আর্ট ক্লাসে হাঁস – মুরগির ড্রয়িং দেখাতে গিয়ে নন্দলালের হাতের নাগালে পেন, পেন্সিল কিছুই ছিল না। মেঝেয় পড়ে থাকা ছেঁড়া কাগজের টুকরো দিয়ে ছাত্রদের দেখিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের নানাবিধ পশুপাখির অবয়ব। এগুলিই পরে তাঁর ছাত্ররা কাগজে আটকে ছোটো ছোটো কম্পোজিশনের রূপ দেয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কুটুম কাটাম’-এর কথা মনে করিয়ে দেয় এই ‘হেলা-ফেলার কাজ’। প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত এইধরনের তিনটি কাজের মধ্যে একটিতে দেখতে পাবো ছোট্ট ঝুঁটিওয়ালা পাখি, শিকারের দিকে এগোনো একটি নেউল এবং একজন বিশ্রামরত পথিক। পথিকের পাশে লাঠির উপরের অংশে আটকানো ছোট্ট একটি কাগজের টুকরোতে ছাপা অক্ষরে ‘আনন্দমেলা’ লেখাটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। সম্ভবত পুজোর ছুটির আগে পাঠ ভবনের ছাত্রদের ‘আনন্দমেলা’ উৎসবকে নির্দেশ করছে। প্রদর্শনীর অধিকাংশ পোস্টকার্ড নন্দলাল বসুর কন্যা গৌরী ভঞ্জের পরিবারের সংগ্রহে সুরক্ষিত ছিল। শান্তিনিকেতন ঘরানার একেবারে বিপরীত, তেল রঙের একটি ছোট্ট ডেমোন্সট্রেশন পাওয়া গিয়েছে চিত্রনিভা চৌধুরীর পারিবারিক সংগ্রহে। চিত্রনিভার ছাত্রাবস্থায় নন্দলাল বসু তাঁকে তেল রঙের প্রাথমিক নিয়মাবলি বিশদে বোঝানোর জন্য ছোটো এক খণ্ড ক্যানভাসে একটি পোর্ট্রেট এঁকে দিয়েছিলেন।
আর্ট ক্লাসে হাঁস – মুরগির ড্রয়িং দেখাতে গিয়ে নন্দলালের হাতের নাগালে পেন, পেনসিল কিছু ছিল না। মেঝেয় পড়ে থাকা ছেঁড়া কাগজের টুকরো দিয়ে ছাত্রদের দেখিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের নানাবিধ পশুপাখির অবয়ব।

নন্দলালের শিল্পীসত্তাকে জানতে এবং বুঝতে হলে তাঁর ব্যক্তিগত খেয়ালি কাজগুলি ‘হেলা-ফেলা’ করার উপায় নেই। শান্তিনিকেতন ঘরানার ‘কন্টেক্সচুয়াল মডার্নিজম’-এর অন্যতম পথিকৃৎ, ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে এই ব্যক্তির অবদান সময়ের পরিধি অতিক্রম করে গিয়েছে বহু আগেই। ‘সহজপাঠ’ থেকে ‘ভারতীয় সংবিধান’ সর্বত্রই তাঁর কীর্তি উজ্জ্বল। তাঁর শিল্পকর্মের সজীবতাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে এই প্রদর্শনীটি ভবিষ্যৎ শিল্পী ও শিল্পরসিকদের একটিবার অবশ্যই প্রত্যক্ষ করতে হবে।

আর্ট এক্সপোজার সম্পর্কে
আধুনিক ও সমসাময়িক দক্ষিণ এশিয় শিল্পী এবং শিল্পকলাকে সমাজের কাছে পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পী ও তাঁদের সৃষ্টিকে মর্যাদা দিতে এবং আধুনিক শিল্পকলার একটি গঠনমূলক পরিসর তৈরি করতে সংস্থাটি কাজ করছে ২০২৪ সাল থেকে। গ্যালারির ঠিকানা: ১৬/২ লেক ভিউ রোড, কলকাতা ৭০০০২৯।
____________
ছবি: প্রতিবেদক