কাপড়ের ক্যানভাসে সেলাই করে হুবহু পোর্ট্রেট, নেপথ্যে শিল্পী তুহিনা ঘোষ

সেলাই শিল্পের এই নয়া ধারাটির পোশাকি নাম ‘হুপ আর্ট’

ঙ তুলির টানে নয়, সূচ-সুতোর ফোঁড়ে ছবি আঁকছেন তিনি। কাপড়টাই ক্যানভাস, তার ওপর নানা রঙের সুতোর কাজ। হরেক রকমের নকশা তো আছেই পাশাপাশি সেলাই দিয়ে হুবহু পোর্ট্রেট তৈরি করছেন হুগলির তুহিনা ঘোষ (Tuhina Ghosh)। কখনও অরিজিৎ সিং কখনও আবার আমার আপনার পারিবারিক কোনোও ছবি দেখে হুবহু সেলাই দিয়ে তৈরি করছেন ছবি। বিশ্বাস করতে অসুবিধা হচ্ছে? কিন্তু তুহিনার কাজ চাক্ষুষ করলে এ ভ্রম কাটতে বাধ্য।

শিল্পী তুহিনা ঘোষ 

বাংলার ঘরে ঘরে সেলাই-এর বিচরণ আজকের নয়। আমাদের ছোটোবেলার স্মৃতি ঘাঁটলে মা-ঠাকুমার হাতে তৈরি, নকশা করা রুমাল, আসন নিদেনপক্ষে ছেঁড়া জিনিসের তাপ্পি দেওয়ার কথা মনে পড়েই যায়। এবার সেই চিরাচরিত সেলাই (Stich) শিল্পেই এসেছে খানিক নতুনত্বের ছোঁয়া। আধুনিক সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পুরোনো ঐতিহ্যের ঘরানায় লেগেছে খানিক অভিনবত্বের পরশ।

একরকম ঝুঁকি নিয়ে কেবল হাতের কাজের ওপর ভরসা রেখেই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। যদিও সে ভরসা যে বিফলে যায়নি তা আজ মাসিক অর্ডারের হিসেব দেখলেই বোঝা যায়। আগে যেখানে মাসে ৩ থেকে ৪টে কাজ করতেন সেখানে এখন প্রায় ১৫ টা মতো কাজ করেও সামাল দিতে পারেন না মানুষের চাহিদার সঙ্গে।

শিল্পের এই নয়া ধারাটির পোশাকি নাম ‘হুপ আর্ট’ (Hoop Art)।  হুপ (Hoop) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো চক্র। সাধারণত গোল চাকতিকে হুপ বলা হয়। আমরা সেলাই করার সময় কাপড়টা যে ফ্রেমে আটকে নিই সেটাকেও বলে হুপ। এই ফ্রেমে কাপড় আটকে তাতে সূচ-সুতো দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় নানান ধরনের নকশা। তারপর সেই ফ্রেমসহই নকশাটি ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ঘরের কোনোও দেওয়ালে। এদেশে হুপ আর্টের ব্যবহার কম। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি বেশ জনপ্রিয় শিল্প। বিশেষ করে গৃহসজ্জার রঙিন অনুসঙ্গ হিসেবে এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। এছাড়া উপহার হিসেবেও হুপ আর্টের কদর আছে।

ফুল, পাতা এবং বাহারি নকশা তো অনেকেই করেন কিন্তু সেলাই দিয়ে পোর্ট্রেট তাও আবার একেবারে ছবির মতো, বিষয়টা নেহাতই কঠিন। কিন্তু মানুষ চাইলে যে কোনকিছুই বিশেষ কঠিন থাকে না, সেকথাই প্রমাণ করে দিচ্ছেন ২৮ বছর বয়সী তুহিনা। নিত্যদিন সুতোয় বুনছেন গল্প। সোশ্যাল মিডিয়ার ভরসায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁর হাতের কাজ।

শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি, “ছোটোবেলা থেকে আঁকা অথবা সেলাই দুটোর কোনোটাতেই অভ্যেস ছিল না আমার, তাই এই ‘হুপ আর্ট’ বিষয়টা নিয়ে প্রথম থেকেই বেশ চিন্তা ছিল। একরকম আমার স্বামীর জোরাজুরিতেই এ কাজ শুরু। পোর্ট্রেটের কাজ বেশি জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে ঠিকই, তবে শুরুতে আমি বিভিন্ন ধরনের থ্রি-ডি আর্টই করতাম। আস্তে আস্তে নানা নতুন ভাবনা ভিড় করতে থাকে। নানা রকমভাবে নতুন কাজের চেষ্টা শুরু করি, সেই থেকেই আজকের যাত্রা বলতে পারেন”, বললেন তুহিনা।

শুরুতে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন তুহিনা। লোকাল ট্রেনে নিত্যদিন যাতায়াত করার সময়টুকুও অনবরত সেলাই করে যেতেন। একটা-দুটো করে ক্রমেই চাহিদা বাড়তে থাকে তাঁর হাতের কাজের। শিল্পের কদর যে মানুষ এখনও করে, সেকথা তো সকলেই জানি। অন্দরসজ্জা অথবা উপহারে যদি খানিক অন্যরকম কিছু থাকে তবে তো সহজেই পরিচিত মহলে তাক লাগিয়ে দেওয়া যায়। তাই অফিসের কাজ সামলে শিল্পচর্চার সুযোগ বেশিদিন জুটলো না তুহিনার। একরকম ঝুঁকি নিয়ে কেবল হাতের কাজের ওপর ভরসা রেখেই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। যদিও সে ভরসা যে বিফলে যায়নি তা আজ মাসিক অর্ডারের হিসেব দেখলেই বোঝা যায়। আগে যেখানে মাসে ৩ থেকে ৪টে কাজ করতেন সেখানে এখন প্রায় ১৫ টা মতো কাজ করেও সামাল দিতে পারেন না মানুষের চাহিদার সঙ্গে। তুহিনা ঘোষের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সেসব গল্পই উঠে এলো।

বর্তমানে ঘর সাজানোর জন্য রং-বেরঙের ছবি, নকশা, বাহারি বেতের জিনিস অথবা নিদেনপক্ষে একটা ধাতব ফুলদানি, দাম শুনলেই মধ্যবিত্তদের কপালে ভাঁজ পড়ে। সেখানে অভিনব ‘হুপ আর্ট’ তো বিলাসিতা! হ্যাঁ ঠিক এরকমটাই মনে হয়েছিল একদিন তুহিনার। দাম শুনে কিনতে পারেননি সেদিন। তবে হুপ আর্টের প্রতি আসক্তি ভুলতে পারেননি। নিজেই সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। তুহিনার কথায়, “আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন ভেবেছিলাম আমার মতো মধ্যবিত্তদের সাধ্যের মধ্যেই জিনিস তৈরি করবো। এমনি কাজ করতে কম-বেশি একদিন লাগে, পোর্ট্রেট তৈরি করতে আরও অনেকটা বেশি সময় লেগে যায়। তাও আমি যতটা সম্ভব কম লাভ রেখেই দাম নির্ধারণ করি।”

যেকোনো শিল্পের বিচরণ তখনই সফলতা পায় যখন সাধারণ মানুষ তাকে সাদরে গ্রহণ করে। ‘হুপ আর্ট’-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। ইন্টারনেটের বদান্যতায় মানুষ এখন একটা ফোন অথবা মেসেজেই অর্ডার করছেন পছন্দের সেলাইটি। জীবনের কোনোও বিশেষ দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে সেই দিনকেই সূচ-সুতোর ফোঁড়ে সাজিয়ে ভালোবাসার মানুষকে উপহারও দিতে পারছেন। তুহিনা জানান, “মানুষের চাহিদা এখন এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে বিয়ের সাজানো অথবা অনুষ্ঠান বাড়ি বুক করার মতো আমার কাছে নির্দিষ্ট দিন বলে ৩-৪ মাস আগে থেকেও অর্ডার আসে। এখন আমার প্রায়ই মনে হয়, একজন ‘হেল্পিং হ্যান্ড’হলে খুব ভালো হয়। মানুষের ভালোবাসা না থাকলে যে এই জার্নিটা এতোটা সহজ হতো না এ কথা বলতেই হয়।”

তবে এ পথ চলার কোনোও শেষ নেই। বরং আছে নতুন নতুন ভাবনার মিশেল। “আগামী দিনে মানুষের জীবনের গল্প শুনে তা দিয়ে ছবি আঁকার মতো সেলাই করার ভাবনা আছে। যেমন ধরুন পাহাড়ে প্রেম নিবেদনের গল্প অথবা প্রিন্সেপ ঘাটে প্রেমের গল্প ইত্যাদি সেলাই দিয়ে ছবির মতো করে ফুটিয়ে তোলা”, ভাবনার কথা জানালেন তুহিনা। তাই ঘরের ভোল ফেরাতে চাইলে দেওয়ালে চওড়া কাঠের ফ্রেমে কাচ বাঁধানো ছবি অথবা কোনোও ফুল-পাতার শোপিসের নস্ট্যালজিয়ার পাশাপাশি মানুষের পছন্দ হোক ঝকঝকে ‘হুপ আর্ট’৷ ট্রেন্ডি এবং সমকালীন৷

Developed by DXDasia