শতবর্ষ পেরনো বাংলার প্রথম পার্সি ধর্মশালা, আজও সেই স্বাদে তৃপ্ত বাঙালি

কলকাতার ৯ নম্বর বো স্ট্রিট, চাঁদনি চক মেট্রো থেকে নেমে হেঁটে মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটলেই পড়বে এই ধর্মশালা

নম্বর বো স্ট্রিট। চাঁদনি চক মেট্রো থেকে নেমে হেঁটে মাত্র কয়েক মিনিট। খড়খড়ি দেওয়া জানলা, নকশা করা লম্বা রোদেলা বারান্দা, সে এক সেকেলে তিনতলা বাড়ি। গেটের উপর শ্বেত পাথরের ফলকে বড়ো বড়ো করে লেখা, “মানেকজি রুস্তমজি ধরমশালা ফর পার্সি ট্রাভেলারস”। ঊনবিংশ শতকের কলকাতায় প্রায় এক লক্ষ পার্সির বাস ছিল। যাদের অনেকেই ছিলেন শিল্পপতি-ব্যবসায়ী। আজও কাশিপুরের কাছে গেলেই দেখতে পাবেন রুস্তমজি পার্সি রোড। বেলেঘাটায় রয়েছে টাওয়ার অফ সাইলেন্স। কিন্তু খাবারের মেট্রোপলিস কলকাতা শহরে পার্সি খাবারের (Persian Food) খোঁজ পেতে বাঙালিকে ঢুঁ মারতে হয় এই ঠিকানাতেই। লাখের হিসেব কমে আজ শহরে মেরে-কেটে ৪০০ জন পার্সির বাস। যাঁদের অধিকাংশই একা থাকা বয়স্ক।

ইতিহাসের পাতায় কলকাতার বয়স প্রায় ৩০০ ছুঁইছুঁই। বাঙালির রেনেসাঁর শহর এই কলকাতা। তবে শুধু বাঙালি বললে ভুল হবে, এ কলকাতার (Kolkata) মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আরেকটা কলকাতা। যার পরতে পরতে রয়েছে মিলনের গল্প। যে গল্পে বারবার এসে পড়েছে ভিনদেশিরা।

শুধু কলকাতা নয়, একই সঙ্গে আরও দুই জায়গায় তৈরি হয় পার্সি ধর্মশালা। তবে মুম্বই অথবা চিনের থেকে কলকাতার ধর্মশালাই নাম করেছিল বেশি। বাঙালির স্বাদযশই ছিল তার আসল কারণ।

জিভের স্বাদে বাঙালির চাহিদার শেষ ছিল না কোনোদিনই। সেই স্বাদে নিখাদ হেরিটেজ পার্সি খানার চল হলে যে ব্যাপারটা জমে যাবে এটা বুঝতে পেরেছিলেন গুজরাটের পার্সি দম্পত্তি মেহের হানসোটিয়া এবং দারা হানসোটিয়া। গুজরাটে থাকাকালীন দারা একটি সরকারি চাকরি করতেন। আর মেহের ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। বছর আটেক আগে কলকাতায় এসে এই ধরমশালার রান্নাবান্নার দায়িত্ব নেন হানসোটিয়া দম্পতি। সেই থেকেই ধর্মশালার রান্নাঘর সামলাচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব এই পার্সি দম্পতি। ধর্মশালাটি শুধু পার্সিদের জন্য হলেও ওঁদের রান্নাঘরের দরজা খুলে দিয়েছিলেন সকলের জন্যই।

নভরোজ উৎসবের সময় আকুরা বা ধনসাক খেতে তো ভিড় জমেই। অন্যদিনেও অন্তত ৫-৬ জন ছুটে আসেন পার্সি খাবারের টানে। কী কী খাবার পাওয়া যায়? সে কথায় মেহেরজি বললেন, “সাল্লি চিকেন, মসুর মা গোস্ত, তারেলা পাপেটা মা মুরগি, চিকেন পোলাও ডাল, লাগান নু কাস্টার্ড এসবের খোঁজ করতেই বেশি লোক আসত এখানে।”

সময়টা ১৯০৯ সাল। কলকাতা, মুম্বই এবং চিনে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুরা মিলে ৯, বো স্ট্রিটে তৈরি করে ফেলেন মানকেজির নামাঙ্কিত বাংলার প্রথম পার্সি ধর্মশালা। এর আগেই এজরা স্ট্রিটের আদি অগ্নি মন্দিরে বসে তিন পার্সি ব্যবসায়ী মানেকজি রুস্তমজি, নওরোজি পেন্টনজি এবং কাওয়াসজি পেন্টনজি তৈরি করেন শহরের প্রথম পার্সি ট্রাস্ট। আজও এই ট্রাস্ট শহরের পার্সি বয়স্কদের দেখভাল করে।

শুনলে অবাক হবেন, শুধু কলকাতা নয়, একই সঙ্গে আরও দুই জায়গায় তৈরি হয় পার্সি ধর্মশালা (Persi Dharamshala)। তবে মুম্বই অথবা চিনের থেকে কলকাতার ধর্মশালাই নাম করেছিল বেশি। বাঙালির স্বাদযশই ছিল তার আসল কারণ।

প্রাথমিকভাবে এই ধরমশালাটি তৈরি করা হয় শহরে বেড়াতে বা কাজে আসা পার্সিদের থাকার জন্য। শুরুর সময়, ঘর প্রতি ভাড়া ছিল আট আনা। তিন বেলা খাবারের খরচ ছিল দু’টাকা। ১৯৩৬ সালে সেই বাড়িটি ভেঙেই তৈরি হয়েছিল আজকের দোতলা ধর্মশালা ভবন। তখন ঘর ভাড়া বেড়ে হয় ১২ আনা। তিন বেলা খাবারের খরচও বেড়ে হয় সাড়ে তিন টাকা।

হানসোটিয়া দম্পতির রান্নার স্বাদই ছিল এই ধর্মশালার আসল এসেন্স। শুধু রান্না নয়, তার সঙ্গে উপরি পাওনা ছিল এই দম্পত্তির হাসিমুখ। পাতে পার্সি খাবার আর সঙ্গে জমাজমাট আড্ডা, সব মিলিয়ে রোজই এক অন্যরকম আমেজ তৈরি হত ৯ নম্বর বো স্ট্রিটের সেকেলে বাড়িটায়। হানসোটিয়া দম্পত্তির সঙ্গে কথা বলে পার্সিদের কাছে কলকাতার গুরুত্ব কতটা ছিল তার আভাস মেলে। “বাঙালিদের ভালো পার্সি খাবার খাওয়াতে পেরে আমাদের সবসময়ই খুব ভালো লাগত। বাঙালিদের মুখে প্রশংসা শুনে বরাবরই মনে হত আমাদের কলকাতার জার্নি সার্থক।”

জানা যায়, গত ৩ জানুয়ারি এ শহরের মায়া কাটিয়ে ফিরে গেছেন মেহের এবং দারা। তাঁরা জানান, “আপাতত ধর্মশালার রান্নাঘরে থাকছি না আমরা।”

ধর্মশালা হয় তো থাকছে আগের মতোই, কেবল থাকছেন না মেহের এবং দারা। ওঁদের ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই প্রাণহীন পার্সি হেঁশেল। স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যরসিক বাঙালির স্বাদে টান পড়তে পারে এই ঘটনায়। কলকাতার মেহেরজির কুইজিনই যে মাতিয়ে রাখত, সে কথা অবশ্য স্বীকার করছেন অনেকেই।

চাঁদনির বাসিন্দা তূর্য গোস্বামী বলেন, “পার্সি খাবারের স্বাদ কিন্তু বেড়ে যেত মেহের আর দারাজির টানেই। তাই ওঁরা না থাকলে ধর্মশালার ভিড় কমবে, খাবারের স্বাদেও হেরফের হবে।”

বাঙালির স্বাদের ঘরে আজ পাকাপাকিভাবে বসত করে পার্সি খাবার। আকুরি থেকে সাল্লি চিকেন অথবা লাগান নু কাস্টার্ড সবেতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে কলকাতা। শতবর্ষ পেরনো এই ধর্মশালার আবেগে আজ হয়তো ছেদ পড়েছে ঠিকই কিন্তু খাদ্যপ্রেমী বাঙালি কোনোদিনই ভুলবে না চিরাচরিত পার্সি স্বাদ। আর ভুলবে না মেহের আর দারাজিকেও। ওঁরাও কি ভুলতে পারবেন শহর কলকাতাকে? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে মেহেরজির বলা কথাই, “কলকাতা আমাদের দু-হাত ভরে গ্রহণ করেছে সবসময়। তাই আমরা আবারও নতুন করে ফিরতে চাই এই শহরে।”

ছবি সৌজন্যে – ধর্মশালার ফেসবুক পেজ

Post Tags
Developed by DXDasia