নির্মলেন্দু চৌধুরী : লোকগানকে গণনাট্য সংঘ থেকে জাপান, ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন

সুরের মর্মে যাঁরা মাটিকে স্পর্শ করতে পারেন, তাঁরা ঠিক চিনে নেবেন নির্মলেন্দু চৌধুরীকে

পোল্যান্ডের ওয়ারশে বিশ্ব যুব উৎসবে ডাক এলো। সেই প্রথম বিদেশযাত্রা। বিদেশের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন দেশের মাটির সুর…

মুসলমানে বলে গো আল্লা

হিন্দু বলে হরি

আন্তর্জাতিক লোকসংগীত প্রতিযোগিতায় পেলেন প্রথম স্থানের স্বীকৃতি সেইসঙ্গে একটি স্বর্ণপদক। সফরসঙ্গী বলরাজ সাহানি সেই রাত্তিরেই ঘোষণা করলেন “পার্টি হবে”। সেই রাত সাক্ষী ছিল নিরন্তর আড্ডা-গানের। এমনকি পরদিন পোল্যান্ডের শহরে ঘুরতে বেরিয়ে উদ্যোক্তাদের অনুরোধে বাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উদাত্ত গলায় আরও একবার গেয়েছিলেন ‘মুসলমানে বলে গো আল্লা…’।

‘নির্মল আমাদের বাংলার গর্ব। ও গোল্ড মেডেল পেয়েছে। তুই আমার গাড়িটা নিয়ে যা। এয়ারপোর্ট থেকে ওকে রিসিভ করে নিয়ে আয়!’ নির্মলেন্দু চৌধুরী (Nirmalendu Chowdhury) যেদিন কলকাতায় ফিরেছিলেন উত্তমকুমার ভাই তরুণকুমারকে ডেকে এমনটাই নির্দেশ দিয়েছিলেন।

নির্মলেন্দু চৌধুরী-কে খুঁজলে ইন্টারনেট যে যে লোকগানের হদিশ সে আপনাকে দেবে, দেখবেন বেশিরভাগই খুব জনপ্রিয় লোকগীতি। রিয়েলিটি শো বা কলেজ সোশ্যালের ‘ঝিনচ্যাক-ফোক’ ব্যাপার নেই তাতে। অনেক পুরোনো। প্রশ্ন হল, এ প্রজন্ম শুনবে কেন আর মনে রাখবেই বা কেন নির্মলেন্দু চৌধুরীকে?

একবার এক সাক্ষাৎকারে ‘দোহার’-এর কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ‘ভুল’ ভাবে গাওয়া লোকগানের জনপ্রিয়তা বিষয়ে বলছিলেন, “নির্মলেন্দু চৌধুরীও দু-একটা লোকগানে নিজের মতো কথা বসিয়ে নিয়েছিলেন, সেটা তাঁর রুচি। তা বলে তাঁর গানের আবেদন হারিয়ে যায়নি। লোকে শুনলেই যে সেটা মহৎ শিল্প হল তা নয়। ঋত্বিক ঘটকের ছবি অনেকেই দেখেননি, তার মানে সেটা মহৎ শিল্প হল না?”

বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা মিলিয়ে অসংখ্য ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ধামাইল, ঝুমুর, সারি, টুসু, ছাদ পেটানোর গান, গাজির গান, গণনাট্যের গান গেয়েছেন তিনি

কথা তো বটেই, অনেক গানে ভিন্নধর্মী সুরের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তবে, একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো গায়কীতে নিজস্বতা রাখতেন। নির্মলেন্দু হয়তো একটা কথা শুরুতেই ধরতে পেরেছিলেন, লোকসংগীত মানুষের আবেগের গান। দরদ দিয়ে গাইতে হয়। লোকসংগীতের উৎপত্তিস্থল লোকসংস্কৃতি। ‘লোক’ অর্থে সমষ্টি, ব্যক্তি নয়। তাই যা কিছু লোকনির্ভর, তাই লোকসংস্কৃতি। সেই হিসেবে যে কোনও দেশের লোকসংস্কৃতি ধরে রাখে লোকসমাজের নানামুখী উৎকর্ষকে। সেই উৎকর্ষ বিশেষ ভাবে ধরা পড়ে তার শিল্পে, সাহিত্যে, সংগীতে। যেকোনও প্রজন্মের গানপিপাসু, যাঁরা সুরের মর্ম বোঝেন – যে মর্ম মাটিকে স্পর্শ করে, তাঁরা ঠিক চিনে নেবেন নির্মলেন্দু চৌধুরীকে। সুর খেলানোর কায়দা, আগলহীন, আড়ষ্টতাহীন স্বরপ্রক্ষেপ, ঢোল, খোল, খমক, মাদল, ধামসা, সারিন্দা, ডুবকি, খঞ্জনি বাজিয়ে গানের সঙ্গে যে ভাবে ধ্বনির বাতাবরণ তৈরি হয় সেটাই লোকগানের ইউএসপি। এ গানের মাদকতাটাই আসল। যে মাদকতা ভরপুর ছিল নির্মলেন্দুর গানে।

‘সোহাগ চাঁদ বদনি ধনি’, ‘সাগর কূলের নাইয়া রে’, ‘ভালো কইরা বাজান গো দোতরা’, ‘লোকে বলে, বলে রে’, ‘নাচ করে সুন্দরী গো’, ‘ও আমার দরদী আগে জানলে’, ‘পাখি কখন উড়ে যায়’, ‘সুন্দইরা নাওয়ের মাঝি’, ‘দয়া নি করিবা আল্লারে’, ‘তোমার মতো দয়াল বন্ধু’, ‘লাঙল যার, জমি তার’, ‘তোমার রক্তে রাঙ্গা নিশান’ – বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা মিলিয়ে অসংখ্য ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ধামাইল, ঝুমুর, সারি, টুসু, ছাদ পেটানোর গান, গাজির গান, গণনাট্যের গান গেয়েছেন তিনি।

দেশ-বিদেশে ঘুরলেও তিনি কখনও ভুলে যাননি শ্রীহট্টের নদী ঘেরা গ্রামের কথা। মা স্নেহলতার মুখে মঙ্গলকাব্য, পদ্মপুরাণ শুনে শুনে গানের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। পরে শিখলেন সিলেটের প্রাণেশ দাস আর সুধীর চক্রবর্তীর কাছে। গান খুঁজে বেড়াতেন ফকির, সাঁই কীর্তনীয়াদের গলায়। বাউল মন নিয়ে ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথকে, রবীন্দ্রসংগীত। শ্রীহট্টের স্কুলের চৌকাঠ পার হলে, পড়াশোনার জন্য নির্মলেন্দু চলে যান সিলেটে। সেই বয়সেই স্বাধীনতা সংগ্রাম জড়িয়ে পড়লেন। তার পর গণ সংগ্রামে। ক্রমে পার্টির সভ্যপদে। হয়ে উঠেছিলেন পার্টির এক জন দক্ষ সংগঠকও। তাঁর জীবনজুড়ে গণ-সংগ্রাম ও সুরের হাওয়া লাগল সেই উত্তাল বিয়াল্লিশের ঝোড়ো সময় থেকেই। সিলেট জুড়ে তখন জাপানি বোমার আতঙ্ক। এই সময়ই এআরপি-র পোশাকে নির্মলেন্দুর সঙ্গে আলাপ হল খালেদ চৌধুরীর। তার পর পরই তাঁর জীবনে এলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। হেমাঙ্গ নির্মলেন্দুকে ডাকতেন ‘নবনী’ আর নির্মলেন্দু় হেমাঙ্গকে ‘লালুদা’ নামে। জাপান সিঙ্গাপুরের দখল নিল। বোমা পড়ল শিলচরের উপকণ্ঠে। পার্টি ঠিক করল, প্রতিরোধ আন্দোলন আরও জোরদার করতে হবে।

বাংলার প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হয়ে উঠেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী, রমেশ শীল, সলিল চৌধুরী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তুলসি লাহিড়ী, শম্ভু মিত্র, অরুণ মিত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য, নিবারণ পন্ডিত প্রমুখ। নির্মলেন্দুর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতেন খালেদ চৌধুরী। স্তালিনের ছবি এঁকে খালেদ জড়িয়ে পড়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্মের সঙ্গে। আইপিটিএ নামকরণ তখনও হয়নি, খালেদ যুক্ত হয়েছিলেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি কালচারাল স্কোয়াড’-এ। আঁকার সঙ্গে মঞ্চে টুকটাক গানও গাইতেন। তখন তাঁর সহশিল্পীরা ছিলেন হেমাঙ্গ, নির্মলেন্দুরা।

১৯৪৪ সাল। শ্রদ্ধানন্দ পার্কে বসেছিল ফ্যাসিবাদ বিরোধী অনুষ্ঠান। হেমাঙ্গ বিশ্বাস গান গাওয়ার জন্য নিয়ে আসেন শ্রীহট্টের ছেলে নির্মলেন্দুকে। প্রথম তাঁর গান শুনেছিল মহানগর। গান গেয়ে তিনি আসর মাতিয়েছিলেন সে দিন। শিক্ষিত সমাজে ব্রাত্য লোকসংগীতকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন লোকসংগীত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী। পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় থাকা শুরু স্বাধীনতার পর। উত্তর কলকাতার মহেন্দ্র গোস্বামী লেনে এক কামরার ছোট্ট বাসস্থানে মাথা গোঁজার ঠিকানা। দেশ স্বাধীন হলেও, দেশভাগের ক্ষত ছিল তাঁর বুকে। যে ক্ষত ঝরে পড়ত তাঁর গায়কীতে–আবেগে। আজীবন সিলেটের টান ছিল তাঁর কথায়, সিলেটের অসংখ্য লোকগান রেকর্ড করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছিলেন।

ছোট্ট উৎপলেন্দু (উৎপলেন্দু চৌধুরী) তখন অসুস্থ। হেমাঙ্গের অনুরোধে বম্বেতে গণনাট্য সংঘের সারা ভারত সম্মেলনে (১৯৫৩ সালে) যেতে হয় নির্মলেন্দুকে। ‘দলিল’ নাটক নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ঋত্বিকও। বম্বেতে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সলিল চৌধুরী তৈরি করলেন ‘বম্বে ইয়ুথ কয়্যার’। পাশে থাকলেন নির্মলেন্দু ও অন্যান্যরা। বম্বেতে গিয়েই আলাপ শোভা সেন-উৎপল দত্তের সঙ্গে। অভিনয় করলেন উত্‌পল দত্তের ‘অঙ্গার’ নাটকে, সঙ্গে গান। কয়লাখনির মজদুর জীবনের গান। এছাড়াও ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নাটকে অভিনয় করেন।

রাজেন তরফদার পরিচালিত ‘গঙ্গা’ ছবির পর তাঁর জনপ্রিয়তা দ্বিগুন হয়। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন সলিল চৌধুরী। নির্মল গাইলেন, প্রচলিত কথা ও সুরে ‘আরে ও সুন্দইরা নাওয়ের মাঝি’ আর সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে ‘গঙ্গা গঙ্গার তরঙ্গে’। এর পর একে একে জনপ্রিয় হতে থাকে, ‘প্রেম জানে না রসিক কালাচাঁদ’, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায় তরুণ মজুমদারের ‘নিমন্ত্রণ’ ছবির ‘আমি বন্ধুর প্রেমাগুণে পোড়া’, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় ‘পদ্মা হাসে, পদ্মা কাঁদে’, ‘ডাকাতিয়া বাঁশিরে’— আরও কত-শত গান! সে সময়, সব গীতিকারই মুখিয়ে থাকতেন তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য। 

যতদিন প্রাণ ছিল, গান ছেড়ে থাকেননি। তাঁর গানের খাতা, সাধের দোতরা রাখা আছে সল্টলেকের ফ্ল্যাট বাড়িতে, পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূ যেখানে সংসার পাতেন, যেখানে কখনও আসেননি নিমর্লেন্দু। ঘর বাঁধতে চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। ইচ্ছেপূরণের আগেই ১৯৮১ সালে পার্ক সার্কাসের ১২৬, লিন্টন স্ট্রিটের ভাড়া ঘরে প্রয়াত হন নির্মলেন্দু চৌধুরী।

তথ্যসূত্রঃ 
কালি ও কলম
সুনয়নী, সুনয়নী – আনন্দবাজার পত্রিকা

উত্তরা চৌধুরী

Developed by DXDasia